হ্যারি ব্রুকের ক্যারিয়ারের সেরা ও রেকর্ডভাঙ্গা দ্বিশতক সত্ত্বেও ইংল্যান্ডের পক্ষে জয় ধরে রাখা সম্ভব হয়নি। পাভান রত্নায়েকের সেঞ্চুরি এবং আভিষ্কা ফার্নান্দো ও দাসুন শানাকার বিধ্বংসী ব্যাটিংয়ের পর শেষ ওভারের নাটকীয় ছক্কায় ইংল্যান্ডের বিপক্ষে দুই উইকেটের রোমাঞ্চকর জয় তুলে নিয়েছে শ্রীলঙ্কা। ৪৩০ রানের বিশাল লক্ষ্য তাড়া করে ওয়ানডে ক্রিকেটের ইতিহাসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সফল রান তাড়ার অনন্য রেকর্ড গড়ল লঙ্কানরা।

বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) পাকিস্তানের রাওয়ালপিন্ডি ক্রিকেট স্টেডিয়ামে আয়োজিত ত্রিদেশীয় ওয়ানডে সিরিজের তৃতীয় ম্যাচে টস হেরে প্রথমে ব্যাটিং করতে নেমে নির্ধারিত ৫০ ওভারে ৪ উইকেটে ৪২৯ রান সংগ্রহ করে ইংল্যান্ড। জবাবে ৪৯ ওভার ৫ বলে ৮ উইকেটে ৪৩০ রান তুলে এনে জয় নিশ্চিত করে শ্রীলঙ্কা। দুই দলের মোট সংগ্রহের পরিমাণ ৮৫৯ রান, যা ওয়ানডে ইতিহাসের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ দলীয় রান।

উল্লেখ্য, ২০০৬ সালে জোহানেসবার্গে অস্ট্রেলিয়ার দেওয়া ৪৩৫ রানের লক্ষ্য তাড়া করে ৪৩৮ রান তুলেছিল দক্ষিণ আফ্রিকা। সেই ম্যাচটিই এখনো ওয়ানডে ইতিহাসের সর্বোচ্চ সফল রান তাড়ার রেকর্ড হিসেবে টিকে আছে। এবার সেই তালিকার দ্বিতীয় স্থানে উঠে আসার পাশাপাশি নিজেদের আগের সব রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে শ্রীলঙ্কা।

তবে বিশাল লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে শুরুটা মোটেও সুখকর ছিল না লঙ্কানদের। দলীয় ২৩ রানেই কামিন্দু মেন্ডিসকে বোল্ড করেন জশ টাং। ঠিক তার পরের ওভারেই কোনো বল না খেলেই রানআউট হয়ে মাঠ ছাড়েন অধিনায়ক কুশল মেন্ডিস। মাত্র ২৪ রানে ২ উইকেট হারিয়ে চরম চাপে পড়ে যায় শ্রীলঙ্কা।

সেই কঠিন পরিস্থিতি থেকে তৃতীয় উইকেটে ১৬৬ রানের বিশাল জুটি গড়ে দলকে ম্যাচে ফিরিয়ে আনেন আভিষ্কা ফার্নান্দো ও পাভান রত্নায়েকে। দুর্দান্ত ব্যাটিংয়ের মাধ্যমে সেঞ্চুরির খুব কাছাকাছি পৌঁছেছিলেন ফার্নান্দো। তবে ৮৩ বলে ১১টি চার ও ২ ছক্কায় ৯৭ রান করে জেমি ওভারটনের বলে আউট হতে হয় তাঁকে।

ফার্নান্দোর সেঞ্চুরির আক্ষেপ মিটিয়ে দেন রত্নায়েকে। ৮৭ বলে তিন অঙ্কের ঘরে পৌঁছানোর পর আরও আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠেন তিনি। দাসুন শানাকাকে নিয়ে চতুর্থ উইকেটে আরও ১৩৩ রান যোগ করেন তিনি। শেষ পর্যন্ত ১০৬ বলে ১৫টি চার ও ৩ ছক্কায় ১৩০ রান করে স্যাম কারানের বলে আউট হন রত্নায়েকে। তখন ৪০ ওভার ২ বলে শ্রীলঙ্কার সংগ্রহ ছিল ৪ উইকেটে ৩২৩ রান।

রত্নায়েকের বিদায়ের পর ইংল্যান্ডের বোলারদের ওপর আরও প্রবল আক্রমণ চালান শানাকা। মাত্র ৫০ বলে ৬টি চার ও ৮টি ছক্কায় ৯৭ রান করেন তিনি। তবে তিনিও সেঞ্চুরি থেকে মাত্র তিন রান দূরে থাকতেই লিয়াম ডসনের বলে আউট হন। ৪৪ ওভার শেষে শ্রীলঙ্কার সংগ্রহ দাঁড়ায় ৫ উইকেটে ৩৬৩ রান।

ম্যাচের শেষ ছয় ওভারে প্রয়োজন ছিল ৬৭ রান। এই কঠিন সময়ে দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন জানিথ লিয়ানাগে। ইংলিশ বোলারদের ওপর পাল্টা আক্রমণ চালিয়ে মাত্র ২১ বলে হাফ সেঞ্চুরি পূর্ণ করেন তিনি। তবে অপর প্রান্তে উইকেট পড়তে থাকায় ম্যাচটি শেষ ওভার পর্যন্ত গড়ায়।

শেষ ছয় বলে শ্রীলঙ্কার প্রয়োজন ছিল ৮ রান, হাতে ছিল ৪ উইকেট। প্রথম বলে সিঙ্গেল নেন লিয়ানাগে। এরপর টানা দুই বলে দুনিথ ওয়েল্লালাগে ও এশান মালিঙ্গাকে বোল্ড করে ম্যাচে উত্তেজনা ফিরিয়ে আনেন জশ টাং। চতুর্থ বলে এক রান নিয়ে লিয়ানাগেকে স্ট্রাইক দেন আসিথা ফার্নান্দো।

শেষ দুই বলে প্রয়োজন ছিল ৬ রান। পঞ্চম বলে টাংকে লং অফের ওপর দিয়ে একটি বিশাল ছক্কা মেরে জয় নিশ্চিত করেন লিয়ানাগে। মাত্র ২৭ বলে ৬১ রান করে অপরাজিত থাকেন তিনি। ফলে এক বল হাতে রেখেই ইতিহাস গড়ে জয় পায় শ্রীলঙ্কা।

ইংল্যান্ডের বোলারদের মধ্যে সবচেয়ে ব্যয়বহুল ছিলেন স্যাম কারান। ৯ ওভারে ১০৩ রান দিয়ে ২ উইকেট নেন তিনি, যা ওয়ানডেতে ইংল্যান্ডের কোনো বোলারের করা সবচেয়ে খরুচে বোলিং হিসেবে রেকর্ড গড়ল।

এর আগে ইংল্যান্ডের ইনিংসের শুরুটা ছিল কিছুটা ধীরগতির। উদ্বোধনী জুটিতে টম ব্যান্টন ও বেন ডাকেট যোগ করেন ৭৪ রান। ব্যান্টন ৫১ বলে ৫০ এবং ডাকেট ৩৯ বলে ২৯ রান করেন। দুজনকেই আউট করেন দুনিথ ওয়েল্লালাগে।

এরপর জো রুটের সঙ্গে তৃতীয় উইকেটে ১৫৯ রানের জুটি গড়েন অধিনায়ক হ্যারি ব্রুক। রুট ৬৬ বলে ৬৯ রান করে আউট হলেও থামেননি ব্রুক। মাত্র ৭৫ বলে সেঞ্চুরি পূর্ণ করার পর আরও বিধ্বংসী হয়ে ওঠেন তিনি। শেষ পর্যন্ত ১১৪ বলে দ্বিশতক পূর্ণ করে ওয়ানডে ইতিহাসে দ্রুততম দ্বিশতকের রেকর্ড গড়েন ইংলিশ অধিনায়ক।

আগের রেকর্ডটি ছিল ভারতের শুভমান গিলের, যিনি ১১৭ বলে দ্বিশতক করেছিলেন। ব্রুকই প্রথম ইংলিশ ব্যাটসম্যান, যিনি ওয়ানডেতে দ্বিশতক পেলেন। এর মাধ্যমে তিনি বেন স্টোকসের ১৮২ রানের ইংল্যান্ডের সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত ইনিংসের রেকর্ডটিও ভেঙে দেন।

শেষ পর্যন্ত ১১৬ বলে ২১টি চার ও ১০টি ছক্কায় ২০২ রান করে ইংল্যান্ডের ইনিংসের শেষ বলে আউট হন ব্রুক। শেষ দিকে উইল জ্যাকসকে নিয়ে চতুর্থ উইকেটে ১৮৫ রানের ঝোড়ো জুটি গড়েন তিনি। ৩০ বলে ৮টি চার ও ৩টি ছক্কায় ৬৬ রান করে অপরাজিত থাকেন জ্যাকস।

তবে এত রেকর্ড আর রানের পাহাড় গড়লেও জয় আসেনি ইংল্যান্ডের। ব্রুকের ঐতিহাসিক দ্বিশতক ছাপিয়ে এখন আলোচনায় শ্রীলঙ্কার অবিশ্বাস্য রান তাড়া। পাকিস্তানের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে ৩৭ রানে হারের পর এই জয়ে ত্রিদেশীয় সিরিজে ঘুরে দাঁড়াল লঙ্কানরা। অন্যদিকে পাকিস্তানের কাছে ৮৭ রানে হারের পর টানা দ্বিতীয় ম্যাচেও পরাজিত হয়ে হতাশ ইংল্যান্ড।