ফেসবুক ও ইউটিউবে একটি ভিডিও ক্লিপ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে, যেখানে দেখা যাচ্ছে পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি পাঞ্জাবি-পায়জামা ও মাথায় টুপি পরিহিত অবস্থায় মসজিদের মিম্বারে বসে ইমাম ও মুসল্লিদের উদ্দেশে কথা বলছেন। ভিডিওটির ক্যাপশনে দাবি করা হয়েছে যে, “ইমাম সাহেবকে নিচে বসিয়ে রেখে, মসজিদের মিম্বরে বসে, দুর্গাদেবীর প্রশংসা করছেন বিএনপি সরকারের পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি।”
তবে প্রকৃত ঘটনা যাচাই করে দেখা গেছে, এই ভিডিওটি সম্পূর্ণ বিভ্রান্তিকর। প্রকৃতপক্ষে, শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে লক্ষ্মীপুরের চৌপল্লী বারাহী মন্দিরের পূজামণ্ডপ পরিদর্শন এবং সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময়ের অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছিলেন পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি। সেখানে দেওয়া তাঁর বক্তব্যের একটি অংশকে কৌশলে মসজিদের মিম্বারে বসে কথা বলার অন্য একটি ভিডিওর সাথে যুক্ত করে এই বিতর্কিত ভিডিওটি তৈরি করা হয়েছে।
এই প্রতিবেদনটি লেখা পর্যন্ত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়েছে। শুধুমাত্র ফেসবুকেই ৯০টির বেশি পেজ ও প্রোফাইল থেকে এটি প্রচার করা হয়েছে।
ভিডিওটি গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে বেশ কিছু অসংগতি ধরা পড়ে। সাধারণত কোনো মন্ত্রী মসজিদে বক্তব্য দিলে সেখানে পরিবেশ অত্যন্ত শান্ত থাকে, কিন্তু এই ভিডিওতে আশপাশে নানা ধরনের বিশৃঙ্খলা ও অস্বাভাবিক শব্দ শোনা যাচ্ছে। এছাড়া ভিডিওতে শোনা বক্তব্যের শব্দের সাথে মন্ত্রীর ঠোঁটের নড়াচড়া বা অভিব্যক্তির কোনো মিল নেই। শব্দ উচ্চারণের সময় ঠোঁটের আকৃতি যেভাবে পরিবর্তিত হওয়া উচিত, এখানে তা দেখা যাচ্ছে না। এমনকি তাঁর শারীরিক অঙ্গভঙ্গির সাথেও অডিওর কোনো সামঞ্জস্য নেই।
তদন্তে দেখা গেছে, গত মাসের শেষ দিকে ফেসবুকে প্রকাশিত একটি ভিডিওতে পানিসম্পদমন্ত্রীকে মসজিদের মিম্বারে বসে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও জলাবদ্ধতা নিয়ে কথা বলতে দেখা যায়। বর্তমান আলোচিত ভিডিওর দৃশ্যের সাথে ওই ভিডিওর মিল থাকলেও অডিওটি সম্পূর্ণ আলাদা। ২৫ সেপ্টেম্বর ফেসবুকে প্রকাশিত ওই ভিডিওর ক্যাপশনে লেখা ছিল, “আজ শুক্রবার দক্ষিণ মান্দারী হাসপাতাল জামে মসজিদে মাননীয় পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি পবিত্র জুমার নামাজ আদায় করেন, পরে এক লাখ টাকা অনুদান দেন।”
এরপর আলোচিত ভিডিওর অডিওর মূল উৎস খুঁজতে গিয়ে দেখা যায়, ১৯ অক্টোবর একটি অনলাইন সংবাদমাধ্যমের ফেসবুক পেজে একটি ভিডিও প্রকাশ করা হয়। সেটির ক্যাপশনে লেখা ছিল, “অন্যায়ের বিরুদ্ধে দেবীদুর্গা চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেছিল: শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি”। একই দিনে মন্ত্রীর নিজস্ব ফেসবুক পেজেও লক্ষ্মীপুরের চৌপল্লী বারাহী মন্দির পূজামণ্ডপ পরিদর্শন ও সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময়ের ছবি প্রকাশ করা হয়। ক্যাপশনে লেখা ছিল, “শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে লক্ষ্মীপুরের চৌপল্লী বারাহী মন্দির পূজামণ্ডপ পরিদর্শন এবং সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ।”
মন্ত্রীর ফেসবুক পেজে বিভিন্ন এলাকায় পূজামণ্ডপ পরিদর্শনের আরও ছবি পাওয়া গেছে। ভিডিওটি পর্যালোচনা করে স্পষ্ট হয় যে, পূজামণ্ডপ পরিদর্শনকালে মন্ত্রী দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি, সনাতন ধর্মাবলম্বী ও নেতা-কর্মীদের সঙ্গে চেয়ার-টেবিলে বসে হাতে মাইক্রোফোন নিয়ে কথা বলছিলেন। সেখানে তিনি বলেন, “একটা সমাজে যখন অন্যায় অপকর্ম, অসুর এ সমস্ত অপকর্মের নেতৃত্ব দিচ্ছিল, তখন এটাকে দমন করা জন্য আপনাদের দুর্গাদেবী এই চ্যালেঞ্জটা গ্রহণ করেন। এবং সেখানেই শুভ শক্তির বিজয় সাধিত হয়েছে।”
স্পষ্টত, পূজামণ্ডপে দেওয়া এই বক্তব্যটিই পরবর্তীতে মসজিদের মিম্বারে বসে কথা বলার ভিডিওর সাথে জুড়ে দেওয়া হয়েছে। সুতরাং, মসজিদের মিম্বারে বসে দেবীদুর্গার প্রশংসা করেছেন বলে যে ভিডিও প্রচার করা হচ্ছে, তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও বিভ্রান্তিকর।