এক দিনের জন্য রংপুর যেন এক অন্যরকম পরিচ্ছন্ন শহরে পরিণত হয়েছিল। শহরের ফুটপাথগুলো ছিল দোকানমুক্ত, আর সড়কগুলো ছিল সম্পূর্ণ আবর্জনামুক্ত। চারপাশের সব পোস্টার ও ব্যানার সরিয়ে ফেলা হয়েছিল। শুধু তাই নয়, সড়ক বিভাজকগুলোতে রোপণ করা হয়েছিল অসংখ্য রঙিন ফুলের গাছ। বছরের পর বছর ধরে যে সড়কগুলো ভাঙা অবস্থায় পড়ে ছিল, তা রাতারাতি মেরামত করা হলো। যে রাস্তা দিয়ে রিকশায় চলাচল করলে শরীরে ব্যথা হতো, সেই সড়কটিও রাতারাতি পিচঢালা হয়ে গেল। সড়কের পাশের অনেক দেয়াল নতুন করে রং করা হয়েছে। কদিন আগের রংপুরকে দেখে মনে হচ্ছিল, এটি যেন এক নতুন শহর; পুরনো রংপুরকে আর চেনাই যাচ্ছিল না।
গত ২০ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শারদোৎসবে সর্বজনীন দুর্গাপূজা পরিদর্শনে রংপুরে এসেছিলেন। তাঁর এই বিশেষ আগমনের কথা মাথায় রেখেই রংপুরকে এমন পরিচ্ছন্ন ও সাজানো শহরে পরিণত করা হয়েছিল। কিন্তু প্রশ্ন জাগে, এই পরিচ্ছন্নতা কি কেবল এক দিনের জন্যই ছিল?
রংপুর সিটি করপোরেশনসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো প্রমাণ করে দিয়েছে যে, রংপুর শহরকে পরিচ্ছন্ন করা সম্ভব এবং তাদের সেই সক্ষমতা রয়েছে। তাহলে এই পরিচ্ছন্নতা কি নগরবাসীর জন্য স্থায়ীভাবে ধরে রাখা যাবে না?
শহরের অনেক নাগরিকের মতে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যদি প্রতি সপ্তাহে কিংবা ঘন ঘন রংপুরে আসতেন, তবে হয়তো রংপুরকে সবসময় পরিষ্কার শহর হিসেবে পাওয়া যেত। তবে প্রধানমন্ত্রী ঘন ঘন এলেই শহর পরিষ্কার হবে, এমনটা ভাবার কোনো কারণ নেই। আবার তিনি না গেলে শহর পরিষ্কার থাকবে না—এই ধারণাও সম্পূর্ণ অমূলক। এর প্রমাণ বাংলাদেশেই রয়েছে। একদিকে ঢাকা যেমন অবর্ণনীয় নোংরা শহর, অন্যদিকে রাজশাহী তেমনি একটি পরিচ্ছন্ন শহর।
আমি যতবার ঢাকায় যাই, ততবারই আমার মনে হয়, রাষ্ট্রপরিচালক, নীতিনির্ধারক, বিত্তশালী ও সুশীল হিসেবে পরিচিত সব ব্যক্তিত্ব যেন এই শহরেই থাকেন। তা সত্ত্বেও ঢাকা কীভাবে সীমাহীন নোংরা শহরে পরিণত হয়? গত আগস্ট মাসে ঢাকা গিয়ে এই উপলব্ধি আমার মনে আরও বহুগুণ হয়ে দেখা দিয়েছে।
সামান্য বৃষ্টিতেই অনেক সড়কের এমন দশা হয়েছিল যে সেখানে পা রাখা যাচ্ছিল না। মিরপুর-কাজীপাড়া থেকে আগারগাঁও যাওয়ার পথে আমি লক্ষ্য করেছি, মেট্রোরেলের নিচে যেসব ফুলের গাছ লাগানো হয়েছে, সেগুলোর প্রকৃত পরিচর্যা করা হচ্ছে না। বিশেষ করে বাগানবিলাস ও চন্দ্রপ্রভা ফুলের গাছগুলোর বাড়তি যত্নের প্রয়োজন ছিল।
রংপুর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মাহফুজ-উন-নবী চৌধুরী তাঁর ব্যক্তিগত সক্ষমতা ও প্রচেষ্টায় নগরীর উন্নয়নের জন্য ১ হাজার ৮০০ কোটি টাকা সরকারি বরাদ্দ আনতে পেরেছেন। এর আগে রংপুর সিটি করপোরেশন উন্নয়ন খাতে প্রায় কোনো বরাদ্দই পায়নি বললেই চলে। মাহফুজ–উন–নবী চৌধুরীর নেতৃত্বে রংপুর শহরকে প্রতিদিন পরিচ্ছন্ন রাখা সম্ভব বলে আমি মনে করি।
শহরের তালতলা পার হয়ে পশ্চিম দিকে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের দিকে যাওয়ার পথে একটি সড়ক রয়েছে। সেই সড়কে কয়েক ধরনের রাধাচূড়া আর চন্দ্রপ্রভার করুণ দশা দেখে মন খারাপ হয়ে যায়। কোথাও কোথাও গাছগুলো আগাছায় ছেয়ে আছে, আবার কোথাও আগাছা পরিষ্কার করতে গিয়ে গাছের মাথা কেটে ফেলা হয়েছে। কিছু কিছু জায়গায় গাছই রাখা হয়নি।
গাবতলী থেকে নিউমার্কেটের দিকে যাওয়া সড়কের বিভাজকে যেসব গাছ রোপণ করা হয়েছে, তা ঢাকা শহরের সৌন্দর্যবিষয়ক দেউলিয়াপনারই বহিঃপ্রকাশ। গাছ রোপণের ক্ষেত্রে কোনো পরিকল্পনা নেই এবং পরিচর্যারও কোনো চেষ্টা দেখা যায় না।
সড়ক বিভাজকের কোনো কোনো অংশে গাছই নেই। আবার কোথাও দেখা যায় কাঁঠালগাছ, কোথাও বটগাছ, আবার কোথাও তেঁতুলগাছ। দেবদারু উইপিং, দেবদারু, নিম ও ইপিল ইপিলগাছ পরিচর্যার অভাবে আঁকাবাঁকা হয়ে বড় হয়ে উঠেছে। কোথাও বাগানবিলাস গাছগুলো শুকিয়ে মরছে। সড়ক বিভাজকের কোথাও কাঠ গাছ বড় হয়ে উঠছে, আর তার পাশেই আছে সৌন্দর্যবর্ধক ছোট ছোট গাছ, যেগুলো এখন মলিন হয়ে গেছে।
যে দেশের রাজধানী গোটা বিশ্বে নোংরা কিংবা বসবাসের অনুপযোগী শহরের তালিকায় শীর্ষ স্থান দখল করে নেয়, সেই দেশেরই একটি বিভাগীয় শহর অপরূপ সৌন্দর্য নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সেই শহরের নাম রাজশাহী। এই শহরের একেকটি সড়কের একেক রকম সৌন্দর্য ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। গত অক্টোবর মাসের প্রথম সপ্তাহে আমি রাজশাহী গিয়েছিলাম। কাজলা থেকে সাহেববাজার, তালাইমারীর মোড় এবং এরপর মেডিকেল কলেজের দিকে যাওয়া সড়কবাতির সৌন্দর্য ছিল বৈচিত্র্যময়।
তালাইমারী থেকে সোনাদীঘির মোড় যাওয়ার পথে সড়ক বিভাজক এবং পদ্মা নদী থেকে শহর রক্ষা বাঁধের সৌন্দর্য ছবির মতো মনে হয়। শহর রক্ষা বাঁধের যে ঢাল শহরের দিকে নেমে এসেছে, সেখানে এবং সড়ক বিভাজকে যেসব ফুল ও গাছ চোখে পড়ল, তাতে চোখ ও মন জুড়িয়ে যায়।
বাঁধের ঢালে এবং সড়ক বিভাজকে তিন ধরনের করবী ফুটেছে থোকায় থোকায়। সবুজের ভেতর থেকে উঁকি দিচ্ছে অসংখ্য শ্বেতকাঞ্চন। রঙ্গন ফুল তার বাহারি রূপ মেলে ধরেছে। সারি সারি চন্দ্রপ্রভা দেখলে যে কারও চোখেমুখে উচ্ছ্বাস ফুটে উঠবে। কোথাও কোথাও ফুটে আছে কাঠগোলাপ। কয়েক রঙের রাধাচূড়া শহরের সৌন্দর্য অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে। এছাড়া কয়েক ধরনের জবা ও শিউলি ফুল এবং মহুয়ার গাছ চোখে পড়েছে। রাজশাহী এখন ছাতিমের শহরে পরিণত হয়েছে।
রাজশাহী শহর গত কয়েক বছর ধরে দেশের সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন শহর হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। বাংলাদেশে যে একটি শহরকে পরিচ্ছন্ন রাখা সম্ভব, তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হলো রাজশাহী।
রংপুর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মাহফুজ-উন-নবী চৌধুরী নিজের সক্ষমতা দিয়ে নগরীর উন্নয়নে ১ হাজার ৮০০ কোটি টাকা সরকারি বরাদ্দ আনতে সক্ষম হয়েছেন। এর আগে রংপুর সিটি করপোরেশন উন্নয়ন খাতে কোনো বরাদ্দ পায়নি বললেই চলে। মাহফুজ–উন–নবী চৌধুরীর নেতৃত্বে রংপুর শহরকে প্রতিদিনের জন্য পরিচ্ছন্ন রাখা সম্ভব বলে মনে করি।
তবে এর জন্য নাগরিকদেরও এগিয়ে আসতে হবে। সরকারি, বেসরকারি ও ব্যক্তিগত সব ধরনের যৌথ প্রচেষ্টায় নিজ নিজ নগরীর পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করা সম্ভব হলে পুরো দেশটাই বদলে যাবে।
— তুহিন ওয়াদুদ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক।