মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলায় বোরকা পরিহিত বেশ কিছু ব্যক্তির আকস্মিক হামলা এবং পরবর্তীতে দুই পক্ষের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে তাইজুল সরদার (২৪) নামের এক তরুণ নিহত হয়েছেন। এই হামলার শুরুতেই এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে দিতে বেশ কয়েকটি ককটেল বিস্ফোরণ ঘটানো হয় বলে জানা গেছে।
আজ বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে নয়টার দিকে কালকিনি উপজেলার আলীনগর ইউনিয়নের কালীগঞ্জ বাজারে এই ভয়াবহ ঘটনাটি ঘটে। এই হামলা ও সংঘর্ষের ঘটনায় আরও অন্তত পাঁচজন গুরুতর আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে দুজনের শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় তাঁদের দ্রুত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছে।
নিহত তাইজুল ইসলাম মাদারীপুর সদর উপজেলার কুলপদ্বী এলাকার প্রয়াত রুস্তম আলী সরদারের সন্তান। জানা গেছে, তিনি সদর উপজেলার আলোচিত মোয়াজ্জেম ও বোরহান হত্যা মামলার একজন আসামি ছিলেন। ওই মামলার আইনি জটিলতা ও পরিস্থিতির কারণে তিনি কালকিনির নিজ মামার বাড়িতে অবস্থান করছিলেন।
আহতদের মধ্যে রয়েছেন কালকিনির আলীনগর ইউনিয়নের কালীনগর এলাকার মোতালেব চৌকিদারের দুই ছেলে জহির চৌকিদার (৩৫) ও মহাসিন চৌকিদার (৪২)। এছাড়া মাদারীপুর সদর উপজেলার কুলপদ্বী এলাকার বারেক সরদারের ছেলে আলামিন সরদার (৩৫) গুরুতর আহত হয়েছেন। জহির ও মহাসিনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেলে পাঠানো হয়েছে এবং আলামিন বর্তমানে মাদারীপুর ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেলা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
পুলিশ এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের দেওয়া তথ্যানুসারে, সকালে কালীগঞ্জ বাজারের হানিফের চায়ের দোকানে বসে চা পান করছিলেন আলীনগর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সাবেক চেয়ারম্যান হাফিজুর রহমান ওরফে মিলন সরদার এবং তাঁর অনুসারী জহির ও মহাসিন চৌকিদার। ঠিক সেই মুহূর্তে সদর উপজেলার কুলপদ্বী এলাকার তাইজুল সরদার, আলামিন সরদারসহ আরও কয়েকজন বোরকা পরে সেখানে উপস্থিত হন। তাঁরা হঠাৎ করেই কয়েকটি ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়ে হাফিজুর রহমান ও তাঁর অনুসারীদের ওপর অতর্কিত হামলা চালান। হাফিজুর রহমানকে বাঁচাতে তাঁর অনুসারীরা প্রতিরোধ গড়ে তুললে জহির ও মহাসিন গুরুতর আহত হন। একপর্যায়ে উভয় পক্ষের লোকজনের মধ্যে প্রচণ্ড সংঘর্ষ শুরু হয় এবং সেই সময় তাইজুলকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে গুরুতর জখম করা হয়।
পরে আহতদের উদ্ধার করে দ্রুত কালকিনি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে চিকিৎসকরা উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁদের ঢাকায় পাঠানোর পরামর্শ দেন। তবে হাসপাতালে নেওয়ার পথে তাইজুলের অবস্থার দ্রুত অবনতি হলে তাঁকে মাদারীপুর ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেলা হাসপাতালে নেওয়া হয়, যেখানে জরুরি বিভাগের চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। জহির ও মহাসিনকে ঢাকায় এবং আলামিন সরদারকে মাদারীপুর সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, আলীনগর ইউপির সাবেক চেয়ারম্যান হাফিজুর রহমান ও তাঁর অনুসারীদের সঙ্গে বর্তমান চেয়ারম্যান সাহীদ পারভেজ ও তাঁর অনুসারীদের মধ্যে দীর্ঘদিনের বিরোধ বিদ্যমান। এর আগেও দুই পক্ষের মধ্যে বিভিন্ন সময়ে হামলা ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে, যার প্রেক্ষিতে একাধিক মামলা দায়ের করা হয়েছে।
ঘটনার বিষয়ে আলীনগর ইউপির সাবেক চেয়ারম্যান হাফিজুর রহমান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘রোজকার দিনের মতো আজ চায়ের দোকানে আমরা ৮ থেকে ১০ জন চা খাচ্ছিলাম। হঠাৎ সাত থেকে আটজন লোক বোরকা পরে দোকানের সামনে আসে। তারা ব্যাগ থেকে ককটেল বের করার পর হামলা করে। আমার সামনে যারা বসা ছিল, তারা তাৎক্ষণিকভাবে আমাকে বাঁচাতে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। পরে স্থানীয় লোকজন তাদের ধাওয়া দেয়।’
হাফিজুর রহমান আরও অভিযোগ করেন যে, সম্প্রতি এই হামলাকারীরা তাঁর বাড়িতে আগুন দিয়েছিল এবং আগেও বহুবার তাঁর ক্ষতি করার চেষ্টা করেছে। তিনি দাবি করেন, হামলাকারীরা কার লোক তা সবাই জানেন। বর্তমান চেয়ারম্যান সাহীদ পারভেজ অত্যন্ত প্রভাবশালী ব্যক্তি এবং পুলিশ কখনো তাঁর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয় না, বরং উল্টো তাঁকে ও তাঁর লোকজনকে হয়রানি করা হয়।
তবে এই অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন আলীনগর ইউপির বর্তমান চেয়ারম্যান সাহীদ পারভেজ। তিনি দাবি করেন, হাফিজুর রহমানের অভিযোগটি সম্পূর্ণ রাজনৈতিক এবং হামলাকারীরা তাঁর লোক—এই কথা কেউ বিশ্বাস করবে না। সাহীদ পারভেজ মুক্তকণ্ঠকে বলেন, নিহত ব্যক্তি ও হামলাকারীরা একসময় হাফিজুরের হয়ে কাজ করতেন। তাঁদের মধ্যে বনিবনা না হওয়ায় এক পক্ষ অন্য পক্ষের ওপর হামলা করে। নিহত তাইজুলও তাঁর (হাফিজুর) অনুসারী ছিলেন। তাঁর আরও অভিযোগ, হাফিজুর নিজেই ঘটনাস্থলে দাঁড়িয়ে থেকে সংঘর্ষের নেতৃত্ব দিয়েছেন।
মাদারীপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ ও অনুসন্ধান) জাহাঙ্গীর আলম মুক্তকণ্ঠকে জানান, মূলত আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে প্রকাশ্যে এই হত্যাকাণ্ডটি ঘটেছে। পুলিশ এ বিষয়ে অনেক প্রত্যক্ষদর্শীর সঙ্গে কথা বলেছে। তাঁর ভাষ্যমতে, নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের লক্ষ্য করেই এই হামলা চালানো হয়েছিল এবং মূলত জহির ও মহাসিনকেই লক্ষ্য করা হয়েছিল। নিহত তাইজুল নিজেও হামলাকারীদের একজন ছিলেন এবং তাঁর বিরুদ্ধে দুটি হত্যা মামলাসহ একাধিক মামলা রয়েছে। পুলিশ এই ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের জন্য তদন্ত শুরু করেছে।