১৮ অক্টোবর সকাল সাড়ে ৯টার দিকে আরিচা ফেরিঘাট থেকে ‘বাঘমামা’ লঞ্চটি যাত্রা শুরু করে। আমাদের গন্তব্য ছিল পাবনার নাজিরহাট। পদ্মা নদীর প্রবল স্রোত ঠেলে আমাদের এগিয়ে যেতে হচ্ছিল। পলি ও বালুর উপস্থিতির কারণে নদীর পানি ছিল বেশ ঘোলাটে। যদিও বর্ষার শেষ সময়, তবুও পদ্মার স্রোতের তীব্রতা ছিল চোখে পড়ার মতো। নদীর বুকে বিভিন্ন স্থানে চর জাগতে শুরু করেছে।

এর আগের দিন, ১৭ অক্টোবর বিকেলে আমরা বোটে আরোহণ করি। নদীর শুশুক নিয়ে আমাদের বিশেষ গবেষণা প্রকল্পের দ্বিতীয় বছরের কার্যক্রম এই মাসের শুরুতেই শুরু হয়েছে। আমাদের শুশুক জরিপ দলটি ১১ অক্টোবর খুলনার রূপসা নদী থেকে যাত্রা করে ১৭ অক্টোবর আরিচার পদ্মায় এসে পৌঁছায়। পদ্মা ও যমুনার মিলনস্থল শিবালয়ের নেহালপুর গ্রামের পাশে আমাদের বোটটি নোঙর করা ছিল এবং সেখানেই আমরা রাত কাটাই।

ভোরবেলায় আরিচা ফেরিঘাটে মাছের আড়ত বসে। ১৮ অক্টোবর সেই আড়তে নানা জাতের মাছের সমারোহ দেখা যায়। যার বেশির ভাগই ছিল পদ্মা নদীর মাছ। বড় আকারের চিতল ও পাঙাস থেকে শুরু করে ছোট আকারের সুস্বাদু পিয়ালি কিংবা পাবদা মাছের দেখা মেলে। এমনকি বিশাল আকারের একটি বাগাড় মাছও উঠে এসেছে। আমাদের পরিচালিত জরিপে মোট ৩৬ প্রজাতির মাছ পাওয়া গেছে, যার প্রতিটিই পদ্মার মাছ। আড়তের মালিকদের উচ্চস্বরে মাছের দর হাঁকতে শোনা যাচ্ছিল।

জরিপ চলাকালীন হঠাৎ একটি মাছের খাঁড়ির পাশে আমার চোখ আটকে যায়। দক্ষিণ আমেরিকার সাকার ফিশ আরিচার মাছের আড়তে দেখে আমি চমকে উঠি। অবাক করা বিষয় যে, এই বিদেশি মাছ এখন পদ্মা নদীতেও চলে এসেছে।

সরকারি নিয়ম অনুযায়ী, অক্টোবরের প্রায় পুরো সময়জুড়ে (৮ অক্টোবর থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত) ইলিশ আহরণ নিষিদ্ধ। ইলিশ মাছ ডিম ছাড়ার সুযোগ দেওয়ার জন্য সরকার এই নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। ফলে আরিচা আড়তে একটি ইলিশও দেখা যায়নি। এমনকি আড়তের ছোট বরফকলটিও বন্ধ ছিল, যা দেখে ভালো লেগেছিল। কয়েকজন দোকানি জানান, প্রশাসন বেশ নজরদারি করছে, তাই এই মাসে আড়তে আর ইলিশ উঠবে না। এটি একটি আশাজাগানিয়া দিক, যা ইঙ্গিত দেয় যে ইলিশ এবার রুপালি হওয়ার সুযোগ পাবে।

তবে রাতের আঁধারে পদ্মার চেহারায় এক বড় পরিবর্তন আসে। সন্ধ্যা নামতেই স্রোতস্বিনী পদ্মার জলে জেলেদের ভিড় বাড়তে থাকে। ইলিশ ধরার ফাঁস জালে ভরে ওঠে নদীর বুক। মাঝেমধ্যে স্পিডবোটে টহল দল আসলে জেলেরা দ্রুত সরে পড়েন, কিন্তু টহল দল চলে যাওয়ার পর তারা আবারও ফিরে আসেন ফেলে রাখা জালের পাশে। এভাবে সারা রাত ধরে চলে ইলিশ শিকার। ফজরের আজানের পর জেলেরা একে একে মাছ নিয়ে শিবালয়ের নেহালপুর ও তেউতা গ্রামের আশপাশের নদীর পাড়ে আসতে শুরু করেন। পাড়ের বিভিন্ন পয়েন্টে তারা ইলিশ বিক্রি করে দেন।

আমাদের বোট যখন রাজবাড়ীর পাশ দিয়ে পদ্মায় এগিয়ে চলছিল, তখন দৌলতদিয়া ফেরিঘাট থেকে প্রায় ছয় কিলোমিটার পশ্চিমে দক্ষিণ পাড়ে চরভরাট গ্রামটি চোখে পড়ে। সেখানে একটি ছোট খেয়াঘাট এবং পাশেই মাছের বাজার। জেলেরা কেউ কেউ পাড়ে নোঙর করা নৌকায় বসে আছেন, আবার কেউ কেউ নদীর পাড়ে সদ্য তোলা জাল মেরামত করছেন। তাদের অধিকাংশ জালই ছিল ইলিশ ধরার জাল। বড় ফাঁসের পাশাপাশি দু-একটি সুতার জালের দেখা মেলে। পদ্মায় জেলেরা মূলত ইঞ্জিনচালিত ছোট নৌকায় ইলিশ শিকার করেন।

সেখানে দেখা গেল, ধরা পড়া মাছের বেশির ভাগই ছিল পাঁচ-ছয় ইঞ্চি লম্বা বাচ্চা ইলিশ। দু-একটি মাছের ওজন ছিল ৭০০ থেকে ৮০০ গ্রামের মতো। বড় ইলিশগুলোর পেটে ডিম ছিল। এই ইলিশগুলোর গড় দাম প্রতি কেজি ৬০০ থেকে ৮০০ টাকার মধ্যে ছিল।

দুপুর ১২টার দিকে আমরা চরভরাট ঘাটে নামি। ভরদুপুরের তীব্র রোদের কারণে জেলেদের উপস্থিতি ভোরের তুলনায় কম ছিল। দু-একটি নৌকা ঘাটে ভিড়ছিল এবং ব্যাপারীরা কলাপাতায় ঢাকা ঝুড়িতে টুকটাক দরদাম করে জেলেদের কাছ থেকে মাছ কিনে জমা করছিলেন। সেখানেও দেখা গেল বেশির ভাগই পাঁচ-ছয় ইঞ্চির বাচ্চা ইলিশ এবং দু-একটি ৭০০ থেকে ৮০০ গ্রাম ওজনের বড় ইলিশ, যাদের পেটে ডিম ছিল। এই মাছগুলো প্রতি কেজি ৬০০ থেকে ৮০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছিল।

ইলিশ ধরার জন্য জেলেরা যে জাল ব্যবহার করছেন, তার সবই ছিল ‘কারেন্ট’ জাল। তিন ভিন্ন আকারের ফাঁসের কারেন্ট জাল একটির ওপর আরেকটি রেখে জেলেরা সেগুলো বেঁধে নিয়েছেন। সবচেয়ে ছোট জালটি এক ইঞ্চি, এরপর দেড় ইঞ্চি এবং বড়টি দুই ইঞ্চি ফাঁসের। এই তিন স্তরের জালের কারণে মা ইলিশ কিংবা পোনা ইলিশ—কেউই বেঁচে ফিরতে পারছে না। জানা যায়, এই কারেন্ট জাল আমাদের দেশে নিষিদ্ধ।

চরভরাট গ্রামের তরুণ জেলে হোসেন মিয়া খালি গায়ে গলায় গামছা দিয়ে আমার পাশে পাশে হাঁটছিলেন। গত রাতে ইলিশ কেমন পড়েছে জিজ্ঞেস করতেই হোসেন মিয়ার চোখেমুখে নেতিবাচক অভিব্যক্তি ফুটে ওঠে। তিনি বলেন, “ক্যাল রাইতে মাত্র আড়াই কেজি ছোট ইলিশ পাইচিলাম।” পদ্মায় ইলিশ কম কেন তা জানতে চাইলে তিনি বলেন, “ছার, জানি না, মনে হয় ভাটি থাইক্কা কোনো ইলিশ এদিকে আইতে পারে না। ওই দিকে জাল আরও বেশি।”

এই বাস্তবতার সামনে প্রশ্ন জাগে— “মাছের রাজা ইলিশ কেমন করে বড় হয়ে রুপালি হবে, সেই সময় ও সুযোগ কি আমরা নিশ্চিত করতে পারছি?”

— এম এ আজিজ, অধ্যাপক প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়