মাগুরা কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালে কাউন্টারে দায়িত্ব পালন করার সময় মো. শাকের হোসেন (৩৭) নামে পৌর যুবদলের এক যুগ্ম আহ্বায়কের রহস্যজনক মৃত্যু হয়েছে। ঘটনার শুরুতে মৃত্যুর কারণ নিয়ে নানা বিভ্রান্তি থাকলেও, পরবর্তীতে ময়নাতদন্তের পর চিকিৎসকরা নিহতের মাথার খুলির ভেতর থেকে একটি গুলি (বুলেট) উদ্ধার করেন। চিকিৎসকদের প্রাথমিক ধারণা, গুলির আঘাতেই তার মৃত্যু হয়েছে।
বুধবার (২১ অক্টোবর) ভোর পাঁচটার দিকে মাগুরা কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালের ‘রয়েল এক্সপ্রেস’ পরিবহন কাউন্টারে এই নৃশংস ঘটনাটি ঘটে। নিহত শাকের হোসেন মাগুরা পৌরসভার পারনান্দুয়ালী গ্রামের মো. কুতুবউদ্দিনের ছেলে। জানা গেছে, বিগত ১৭ বছরে বিভিন্ন সময়ে তার বিরুদ্ধে ১০টি রাজনৈতিক মামলা দায়ের করা হয়েছিল।
স্থানীয় সূত্র ও পুলিশ জানিয়েছে, শাকের হোসেন মাগুরা কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালে ‘রয়েল এক্সপ্রেস’-এর কাউন্টার মাস্টার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। প্রতিদিনের মতো বুধবার ভোরেও তিনি তার দায়িত্ব পালন করছিলেন। ভোর পাঁচটার দিকে একটি মোটরসাইকেলে করে দুজন দুর্বৃত্ত কাউন্টারের সামনে এসে থামে। মোটরসাইকেলের ইঞ্জিন স্টার্ট রাখা অবস্থায় বাইরে থাকা একজন বিকট শব্দ করে সবার দৃষ্টি অন্যদিকে ঘোরানোর চেষ্টা করে, আর সেই সুযোগে অন্যজন দ্রুত কাউন্টারে প্রবেশ করে। ভেতরে ঢুকে ওই দুর্বৃত্ত খুব কাছ থেকে শাকেরকে লক্ষ্য করে গুলি চালিয়ে দ্রুত এলাকা ত্যাগ করে। গুলির আকস্মিকতায় শাকের হোসেন তার চেয়ারেই লুটিয়ে পড়েন।
ঘটনার পর স্থানীয়রা তাকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় উদ্ধার করে মাগুরা ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট সদর হাসপাতালে নিয়ে যান। তবে সেখানে জরুরি বিভাগের কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
প্রাথমিকভাবে কাউন্টারের টেবিলে সামান্য রক্তের দাগ দেখে উপস্থিত সবার ধারণা হয়েছিল, তিনি হয়তো হৃদরোগে আক্রান্ত হয়েছেন অথবা স্ট্রোক করে মারা গেছেন। তবে হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসক তার মাথার পেছনে গুলির চিহ্ন শনাক্ত করেন।
মাগুরা ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট সদর হাসপাতালের ইমার্জেন্সি মেডিকেল অফিসার (ইএমও) ড. মাইনুল হাসান জানান, সকালে রোগীটিকে হাসপাতালে আনার পর প্রথম দর্শনে মনে হয়েছিল তিনি স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়েছেন। তবে পরবর্তীতে নিবিড় পর্যবেক্ষণে তার মাথার পেছনে একটি সরু ছিদ্র দেখা যায়।
পরবর্তীতে সদর হাসপাতালে মরদেহের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়। ময়নাতদন্তের দায়িত্বে থাকা চিকিৎসক ড. কৃষ্ণা (ইএমও) নিশ্চিত করে বলেন, “ময়নাতদন্তের সময় নিহত শাকেরের মাথার ভেতর থেকে একটি গুলি উদ্ধার করা হয়েছে। এর মাধ্যমে তিনি গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হয়েছেন বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে।”
যুবদল নেতা শাকেরের এই হত্যাকাণ্ডের খবর ছড়িয়ে পড়লে পরিবহন শ্রমিক ও স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। ঘাতকদের দ্রুত চিহ্নিত করে গ্রেপ্তারের দাবিতে বিক্ষুব্ধ শ্রমিক ও বাস মালিক সমিতির সদস্যরা মাগুরা-ঢাকা মহাসড়ক অবরোধ করেন। এর ফলে কিছু সময়ের জন্য যান চলাচল বন্ধ হয়ে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। পরবর্তীতে স্থানীয় সংসদ সদস্য ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে জড়িতদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা অবরোধ প্রত্যাহার করে নেন।
মাগুরা জেলা পুলিশ সুপার মোল্লা আজাদ হোসেন জানান, ঘটনাটি জানার পরপরই পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। তিনি আরও বলেন, “আমাদের তদন্তকারী ও বিশেষজ্ঞ টিম ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছে। হত্যাকাণ্ডের মূল রহস্য উদ্ঘাটন এবং অপরাধীদের শনাক্তে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সর্বাত্মক তৎপর রয়েছে। তদন্ত সাপেক্ষে বিস্তারিত জানানো হবে।”
বর্তমানে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে মাগুরা কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল ও পার্শ্ববর্তী পারনান্দুয়ালী এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে ওই এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে এবং নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।