অস্ট্রেলিয়ার পর এবার ইংল্যান্ডের বিপক্ষেও দুর্দান্ত নৈপুণ্য দেখালেন পাকিস্তানের উদীয়মান অলরাউন্ডার আরাফাত মিনহাস। গতকাল ইংল্যান্ডের বিপক্ষে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নিজের প্রথম হাফ সেঞ্চুরি করার পাশাপাশি বল হাতে তুলে নিলেন ৬ উইকেট, যা তাঁর ক্যারিয়ারের সেরা পারফরম্যান্স হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।
মাত্র ২১ বছর বয়সেই বিশ্ব ক্রিকেটে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছেন এই প্রতিভাবান অলরাউন্ডার। তবে তাঁর এই পরিচিতির পেছনে রয়েছে গতকালের অবিশ্বাস্য লড়াই।
ব্যাটিংয়ে নেমে বাঁহাতি এই ব্যাটসম্যান ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ৫৮ বলে ৫৯ রান সংগ্রহ করেন। দলের চরম সংকটের মুহূর্তে তাঁর এই ইনিংসটি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যখন আরাফাত ব্যাটিংয়ে আসেন, তখন পাকিস্তানের সংগ্রহ ছিল ৫ উইকেটে ১৩৩ রান। সেখান থেকে দলকে ৩০২ রানের বিশাল সংগ্রহে পৌঁছে দেওয়ার পেছনে তাঁর বড় ভূমিকা ছিল। হাসান নেওয়াজের সঙ্গে ষষ্ঠ উইকেটে তিনি করেন ৭৮ রান এবং সপ্তম উইকেটে ফাহিম আশরাফকে সঙ্গী করে আরও ৭২ রান যোগ করেন।
শুধুমাত্র ব্যাট নয়, বল হাতেও পাকিস্তানকে পরাজয়ের হাত থেকে রক্ষা করেছেন এই বাঁহাতি স্পিনার। ৩০২ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে ১৮.২ ওভারে ১ উইকেট হারিয়ে ১২০ রান তুলে ফেলেছিল ইংল্যান্ড। ঠিক সেই মুহূর্তেই ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেন আরাফাত।
প্রথমে তিনি ৫৭ রান করা ওপেনার টম ব্যান্টনকে আউট করেন। এরপর ইংলিশ অধিনায়ক হ্যারি ব্রুককে যেভাবে প্যাভিলিয়নে ফেরত পাঠান, তা যেকোনো বাঁহাতি স্পিনারের জন্য স্বপ্নের মতো। ব্রুক আরাফাতের ফুল লেংথের বলে সামনের পায়ে খেলার পরিবর্তে পেছনে গিয়ে খেলার চেষ্টা করেন। বলটি অফ স্টাম্পের লাইন ধরে পিচ করে ঘুরে বেরিয়ে যায় এবং সরাসরি স্টাম্পে আঘাত করে।
টানা দুই ওভারে দুই উইকেট নিয়ে পাকিস্তানকে ম্যাচে ফেরানোর পর তিনি একে একে আউট করেন জর্ডান কক্স, উইল জ্যাকস, জেমি ওভারটন ও আদিল রশিদকে। সব মিলিয়ে ৪০ রানে ৬ উইকেট শিকার করেন আরাফাত।
৫০ ওভারের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে একই ম্যাচে হাফ সেঞ্চুরি এবং পাঁচ বা তার বেশি উইকেট নেওয়ার বিরল কীর্তিতে পাকিস্তানের ইতিহাসে বিশেষ জায়গা করে নিয়েছেন তিনি। সর্বশেষ ২০১৩ সালে এই অনন্য রেকর্ড গড়েছিলেন কিংবদন্তি শহীদ আফ্রিদি। পাকিস্তানি ক্রিকেটারদের মধ্যে ওয়ানডেতে আফ্রিদি তিনবার এবং আবদুল রাজ্জাক একবার এমন কৃতিত্ব দেখিয়েছেন। এখন এই অভিজাত তালিকায় তৃতীয় নাম হিসেবে যুক্ত হলেন মাত্র ৫টি ওয়ানডে খেলা ২১ বছর বয়সী আরাফাত।
আরাফাতের ওয়ানডে অভিষেক হয়েছিল গত মে মাসে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে। সেই ম্যাচে ১০ ওভারে মাত্র ৩২ রানে ৫ উইকেট নিয়ে ম্যাচসেরা হয়েছিলেন তিনি। ওয়ানডে অভিষেকে ৫ উইকেট নেওয়া প্রথম পাকিস্তানি বোলার এই বাঁহাতি স্পিনার। সেই ম্যাচে তিনি জশ ইংলিস, মারনাস লাবুশেন, ক্যামেরন গ্রিন, ম্যাথু শর্ট ও নাথান এলিসকে আউট করেছিলেন।
২০০৫ সালের ২ জানুয়ারি মুলতানে জন্ম আরাফাত মিনহাসের। তবে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তাঁর যাত্রা শুরু হয়েছিল টি-টোয়েন্টি দিয়ে। ২০২৩ সালের ৪ অক্টোবর চীনের হাংজুতে অনুষ্ঠিত এশিয়ান গেমসে হংকংয়ের বিপক্ষে পাকিস্তানের হয়ে প্রথম আন্তর্জাতিক ম্যাচটি খেলেন তিনি।
২০২৪ সাল থেকে নিয়মিত পাকিস্তান সুপার লিগে (পিএসএল) খেলছেন আরাফাত। বর্তমানে তিনি মুলতান সুলতান দলের সদস্য, এর আগে করাচি কিংসের হয়ে খেলেছেন। তাঁর ছোট ভাই সামির মিনহাসও পাকিস্তান ক্রিকেটে বেশ আলোচিত নাম।
সামির মিনহাস গত ডিসেম্বরে অনূর্ধ্ব-১৯ এশিয়া কাপে আলোড়ন সৃষ্টি করেন। ফাইনালে ভারতের বিপক্ষে ওপেনার হিসেবে তিনি ১৭১ রানের এক মহাকাব্যিক ইনিংস খেলেন। ১১৩ বলের সেই ইনিংসে ছিল ৯টি ছক্কা ও ১৭টি চার। যুব ওয়ানডেতে এটিই পাকিস্তানের কোনো ব্যাটসম্যানের সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত সংগ্রহ, যা আগে শাহজাইব খানের ১৫৯ রানের রেকর্ড ছিল। পুরো টুর্নামেন্টে ৪৭১ রান করে সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহকের মর্যাদা পান সামির। পরবর্তীতে পিএসএলে প্রথমবার মাঠে নেমে তিনি ৩৪৯ রান করেন, যদিও এখনো জাতীয় দলের হয়ে খেলার সুযোগ পাননি তিনি।
আরাফাত ও সামিরের বাবা কাশিফ মিনহাস নিজেও একসময় ক্রিকেটার হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন এবং মুলতানে টেপ বল ক্রিকেটে তাঁর যথেষ্ট খ্যাতি ছিল। সন্তানদের আগ্রহ দেখে তিনি তাঁদের স্থানীয় ক্রিসেন্ট ক্রিকেট ক্লাবে ভর্তি করিয়ে দেন।
গত এশিয়া কাপ ফাইনালে সেঞ্চুরির পর সামির তাঁর বাবার কথা উল্লেখ করে বলেন, “বাবা ফাস্ট বোলার ছিলেন। একই অ্যাকশনে অফ কাটার ও লেগ কাটার দিতে পারতেন বলে তাঁকে খেলা ছিল খুব কঠিন। তিনি আমাদের ক্রিকেট বলে খেলতে উৎসাহিত করেন এবং সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানোর সব সুযোগ করে দেন।”
কাশিফ মিনহাস বর্তমানে একজন পেশাদার ক্রীড়া আলোকচিত্রী হিসেবে কর্মরত। ছেলেদের অসাধারণ পারফরম্যান্স এখন মাঠের পাশেই বসে দেখেন এই গর্বিত বাবা।