শীতকালীন সময়ে অনেকের মনেই এই প্রশ্নটি উদয় হয় যে, বাইরের আবহাওয়া ঠান্ডা থাকায় ফ্রিজের তাপমাত্রা কি কমিয়ে দেওয়া উচিত? অনেকের ধারণা, শীতকালে ফ্রিজে খুব বেশি ঠান্ডার প্রয়োজন হয় না, তাই তারা তাপমাত্রা বাড়িয়ে দেন। আবার কেউ কেউ মনে করেন তাপমাত্রা আরও কমিয়ে দেওয়া প্রয়োজন। তবে খাবার নিরাপদ ও সতেজ রাখতে শীতকালেও ফ্রিজের তাপমাত্রা সঠিক রাখা অত্যন্ত জরুরি।

ফ্রিজের তাপমাত্রা সঠিক না থাকলে মাছ, মাংস, দুধ এবং রান্না করা খাবারসহ বিভিন্ন পচনশীল সামগ্রী দ্রুত নষ্ট হয়ে যেতে পারে। এমনকি এই ধরনের পরিস্থিতিতে খাবারে ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া জন্মানোর ঝুঁকি থাকে। তাই শীতকালে ফ্রিজ ও ফ্রিজারের তাপমাত্রা কত রাখা উচিত এবং বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের জন্য কোন বিষয়গুলোতে নজর দেওয়া প্রয়োজন, তা বিস্তারিত জেনে নেওয়া ভালো।

শীতকালে ফ্রিজের তাপমাত্রা কত রাখবেন?

ঋতু যাই হোক না কেন, খাবার নিরাপদ রাখতে ফ্রিজের ভেতরের তাপমাত্রা সাধারণত ১ থেকে ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে রাখা শ্রেয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, আদর্শ তাপমাত্রা হতে পারে প্রায় ২ থেকে ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, “ফ্রিজের আদর্শ তাপমাত্রা ১.৭ থেকে ৩.৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে রাখা উচিত।” অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন (এফডিএ) ফ্রিজের তাপমাত্রা ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার নিচে রাখার পরামর্শ দেয়।

তাই শীতকালে বাইরের তাপমাত্রা কম হলেও ফ্রিজের তাপমাত্রা নিরাপদ সীমার মধ্যে রাখা উচিত। শুধুমাত্র আবহাওয়া ঠান্ডা বলে ফ্রিজের শীতলতা কমিয়ে দেওয়া সঠিক সিদ্ধান্ত নয়। কারণ ঘরের তাপমাত্রা, ফ্রিজের ব্যবহার এবং কতবার দরজা খোলা-বন্ধ করা হচ্ছে, তার ওপর ফ্রিজের ভেতরের তাপমাত্রা নির্ভর করে।

ফ্রিজারের তাপমাত্রা কত রাখবেন?

ফ্রিজারের মূল কাজ হলো মাছ, মাংসসহ বিভিন্ন খাদ্যদ্রব্য দীর্ঘ সময় হিমায়িত অবস্থায় রাখা। এজন্য ফ্রিজারের তাপমাত্রা সাধারণত মাইনাস ১৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার নিচেই রাখা উচিত।

শীতকালে ফ্রিজারের তাপমাত্রা অকারণে বাড়ানো ঠিক নয়। এতে খাবার যথেষ্ট ঠান্ডায় না থাকতে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদী সংরক্ষণের ক্ষেত্রে সমস্যা দেখা দিতে পারে। তবে প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত ঠান্ডা রাখলে বিদ্যুতের খরচ বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

শীতকালে কি ফ্রিজের তাপমাত্রা কমিয়ে দেওয়া উচিত?

এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন। ফ্রিজের তাপমাত্রা কমানো বলতে কেউ কেউ বেশি ঠান্ডা করা বোঝেন, আবার কেউ শীতলতা কমিয়ে দেওয়া বোঝেন। আপনার ফ্রিজের নিয়ন্ত্রণব্যবস্থায় কোন শব্দটি দিয়ে কী বোঝানো হয়েছে, তা আগে নিশ্চিত হয়ে নিন।

সাধারণভাবে শীতকাল এলেই ফ্রিজের তাপমাত্রা পরিবর্তন করার প্রয়োজন পড়ে না। ভেতরের তাপমাত্রা যদি সঠিক থাকে, তবে আগের সেটিংয়েই রাখা যেতে পারে। তবে ফ্রিজের ভেতরে বরফ জমে গেলে, খাবার অতিরিক্ত শক্ত হয়ে গেলে বা পর্যাপ্ত ঠান্ডা না মনে হলে তাপমাত্রা পরীক্ষা করে প্রয়োজন অনুযায়ী সেটিং পরিবর্তন করা যেতে পারে।

মনে রাখা প্রয়োজন, ফ্রিজের গায়ে থাকা তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের সংখ্যা সব সময় প্রকৃত তাপমাত্রা নির্দেশ করে না। অনেক ফ্রিজে ১ থেকে ৫ বা ১ থেকে ৭ পর্যন্ত সংখ্যা থাকে। এসব ক্ষেত্রে কোন সংখ্যায় কত ডিগ্রি তাপমাত্রা পাওয়া যাবে, তা ফ্রিজের মডেলভেদে ভিন্ন হতে পারে।

ফ্রিজের তাপমাত্রা ঠিক আছে কি না বুঝবেন যেভাবে

শুধুমাত্র খাবার ঠান্ডা মনে হলেই তাপমাত্রা সঠিক আছে বলে নিশ্চিত হওয়া যায় না। তাপমাত্রা যাচাই করতে নিচের বিষয়গুলো খেয়াল রাখতে পারেন-

থার্মোমিটার ব্যবহার করুন: ফ্রিজের প্রকৃত তাপমাত্রা জানতে আলাদা রেফ্রিজারেটর থার্মোমিটার ব্যবহার করতে পারেন। এতে তাপমাত্রা নিরাপদ সীমায় আছে কি না তা সহজেই বোঝা যায়।

ফ্রিজের নির্দেশিকা দেখুন: আপনার ফ্রিজের মডেল অনুযায়ী সঠিক সেটিং জানতে প্রস্তুতকারকের দেওয়া নির্দেশিকা বা ইউজার ম্যানুয়াল অনুসরণ করুন।

খাবারের অবস্থা খেয়াল করুন: দুধ, মাছ, মাংস বা রান্না করা খাবার যদি অস্বাভাবিক দ্রুত নষ্ট হতে শুরু করে, তবে দ্রুত ফ্রিজের তাপমাত্রা এবং শীতলীকরণব্যবস্থা পরীক্ষা করুন।

দরজার রাবার পরীক্ষা করুন: ফ্রিজের দরজার রাবার ঢিলা বা ক্ষতিগ্রস্ত হলে ঠান্ডা বাতাস বেরিয়ে যেতে পারে, ফলে ভেতরের তাপমাত্রা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।

শীতকালে ফ্রিজ ভালো রাখার ৫টি সহজ উপায়

১. বারবার দরজা খুলবেন না: ফ্রিজের দরজা যত বেশি খোলা হবে, তত বেশি ঠান্ডা বাতাস বেরিয়ে যাবে। তাই প্রয়োজনীয় খাবার বের করে দ্রুত দরজা বন্ধ করুন।

২. গরম খাবার সরাসরি রাখবেন না: চুলা থেকে নামানো গরম খাবার কিছুটা ঠান্ডা করে ঢেকে ফ্রিজে রাখুন। তবে খাবার দীর্ঘ সময় ঘরের তাপমাত্রায় ফেলে রাখবেন না; পচনশীল খাবার নিরাপদ সময়ের মধ্যে সংরক্ষণ করা জরুরি।

৩. ফ্রিজ অতিরিক্ত ভরবেন না: প্রয়োজনীয় খাবার রাখুন, তবে এমনভাবে ভরবেন না যাতে ঠান্ডা বাতাস চলাচলে বাধা সৃষ্টি হয়। বাতাস চলাচলের জায়গা থাকলে ফ্রিজের সব অংশে সমানভাবে ঠান্ডা ছড়িয়ে পড়ে।

৪. নিয়মিত পরিষ্কার করুন: ফ্রিজের ভেতরে জমে থাকা ময়লা, খাবারের ছিটা এবং দুর্গন্ধের উৎস নিয়মিত পরিষ্কার করুন। দরজার রাবার ও পেছনের অংশও প্রয়োজন অনুযায়ী পরিষ্কার রাখা উচিত।

৫. বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের জন্য সঠিক সেটিং রাখুন: অপ্রয়োজনে ফ্রিজকে অতিরিক্ত ঠান্ডা করে রাখবেন না। আবার বিদ্যুৎ বাঁচাতে তাপমাত্রা নিরাপদ সীমার ওপরে তুলবেন না। সঠিক তাপমাত্রা বজায় রাখাই খাবার নিরাপদ রাখা এবং বিদ্যুতের অপচয় কমানোর সর্বোত্তম উপায়।

পরিশেষে, শীতকালে ফ্রিজের তাপমাত্রা ঠিক রাখতে আবহাওয়ার চেয়ে খাবারের নিরাপত্তাকে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। ফ্রিজের তাপমাত্রা ১ থেকে ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে এবং ফ্রিজারের তাপমাত্রা মাইনাস ১৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার নিচে রাখার চেষ্টা করুন। নিয়মিত তাপমাত্রা পরীক্ষা এবং সঠিক সংরক্ষণ পদ্ধতি মেনে চললে খাবার দীর্ঘ সময় ভালো থাকবে এবং নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি কমবে।