সকালবেলা অফিস, স্কুল কিংবা বাইরে যাওয়ার তাড়াহুড়োতে অনেকেরই নিয়মিত কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে কাপড় ইস্ত্রি করা। এই প্রক্রিয়াটি খুব অল্প সময়ের জন্য হয়, সাধারণত মাত্র ১০ মিনিট। তবে এই সামান্য সময়ের ব্যবহার মাস শেষে বিদ্যুৎ বিলে কতটা প্রভাব ফেলে, তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে কৌতূহল থাকে।
মূলত ইস্ত্রির বিদ্যুৎ খরচ নির্ভর করে যন্ত্রটির ক্ষমতা বা ওয়াটের ওপর। সাধারণত বাজারে পাওয়া যাওয়া কাপড়ের ইস্ত্রির ক্ষমতা ৮০০ থেকে ১,৫০০ ওয়াটের মধ্যে হয়ে থাকে।
তাহলে প্রতিদিন ১০ মিনিট করে ইস্ত্রি চালালে মাসে মোট কত ইউনিট বিদ্যুৎ খরচ হবে? চলুন একটি সহজ গাণিতিক হিসাব দেখে নেওয়া যাক।
১,০০০ ওয়াটের ইস্ত্রির ক্ষেত্রে হিসাব:
ধরা যাক, আপনার ব্যবহৃত ইস্ত্রির ক্ষমতা ১,০০০ ওয়াট বা ১ কিলোওয়াট।
প্রতিদিন ১০ মিনিট ব্যবহার করলে, ১০ মিনিট = ১০ ÷ ৬০ ঘণ্টা, যা প্রায় ০.১৬৭ ঘণ্টা।
সেই হিসেবে ৩০ দিনে মোট ব্যবহার হবে, ০.১৬৭ × ৩০ = প্রায় ৫ ঘণ্টা।
বিদ্যুৎ ব্যবহারের হিসাবটি হবে: ১ কিলোওয়াট × ৫ ঘণ্টা = ৫ কিলোওয়াট ঘণ্টা বা ৫ ইউনিট।
অর্থাৎ, ১,০০০ ওয়াটের একটি ইস্ত্রি প্রতিদিন ১০ মিনিট করে ৩০ দিন চালালে তাত্ত্বিক সর্বোচ্চ হিসাবে প্রায় ৫ ইউনিট বিদ্যুৎ খরচ হতে পারে।
১,৫০০ ওয়াটের ইস্ত্রির ক্ষেত্রে হিসাব:
এবার ধরা যাক ইস্ত্রির ক্ষমতা ১,৫০০ ওয়াট বা ১.৫ কিলোওয়াট।
মাসে মোট ব্যবহার সময় আগের মতোই ৫ ঘণ্টা হলে, সেক্ষেত্রে হিসাবটি হবে: ১.৫ কিলোওয়াট × ৫ ঘণ্টা = ৭.৫ কিলোওয়াট ঘণ্টা।
অর্থাৎ, ১,৫০০ ওয়াটের ইস্ত্রি প্রতিদিন ১০ মিনিট ব্যবহার করলে মাসে সর্বোচ্চ প্রায় ৭.৫ ইউনিট বিদ্যুৎ খরচ হতে পারে।
উল্লেখ্য যে, উপরের এই হিসাবটি করা হয়েছে এই ধরে নিয়ে যে, ইস্ত্রিটি পুরো সময় তার সর্বোচ্চ ক্ষমতায় বিদ্যুৎ ব্যবহার করছে।
বাস্তবে খরচ কিছুটা কম হতে পারে
তবে এই গাণিতিক হিসাবটিকে ইস্ত্রির প্রকৃত বিদ্যুৎ খরচের চূড়ান্ত মাপকাঠি হিসেবে ধরা ঠিক হবে না। কারণ আধুনিক অনেক ইস্ত্রিতেই থার্মোস্ট্যাট থাকে। ইস্ত্রি যখন একটি নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় পৌঁছায়, তখন এর হিটিং এলিমেন্ট কিছু সময়ের জন্য বন্ধ হয়ে যায় এবং তাপমাত্রা কমে গেলে পুনরায় চালু হয়। ফলে ইস্ত্রি পুরো ১০ মিনিট একটানা একই হারে বিদ্যুৎ টানে না। এই কারিগরি কারণে মিটারে প্রদর্শিত প্রকৃত খরচ তাত্ত্বিক হিসাবের চেয়ে কম হতে পারে।
বিদ্যুৎ বিলে কত টাকা যোগ হতে পারে?
বাংলাদেশে আবাসিক বিদ্যুতের ইউনিটের দাম ব্যবহারের ধাপ বা স্ল্যাব অনুযায়ী ভিন্ন হয়। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড ২০২৬ সালের জুন থেকে কার্যকর হতে যাওয়া নতুন ট্যারিফের তথ্য প্রকাশ করেছে।
২০২৬ সালের জুনে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন ৫০ ইউনিট পর্যন্ত লাইফলাইন গ্রাহকদের জন্য প্রতি ইউনিট ৪.৬৩ টাকা এবং ৭৫ ইউনিট পর্যন্ত প্রথম ধাপের জন্য ৫.২৬ টাকা বহাল রেখেছে।
উদাহরণস্বরূপ, ১,০০০ ওয়াটের ইস্ত্রির মাসিক ৫ ইউনিট খরচ যদি প্রতি ইউনিট ৫.২৬ টাকা হারে হিসাব করা হয়, তবে শুধু এনার্জি চার্জ হবে প্রায় ২৬ টাকা ৩০ পয়সা। তবে মনে রাখতে হবে, বিদ্যুৎ বিলের মোট অঙ্ক শুধু এই হিসাবের ওপর নির্ভর করে না। মাসিক মোট ব্যবহার, প্রযোজ্য স্ল্যাব, ডিমান্ড চার্জ এবং অন্যান্য চার্জের কারণে চূড়ান্ত বিলের পরিমাণ ভিন্ন হতে পারে।
ইস্ত্রি ব্যবহারের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের উপায়
প্রতিদিন অল্প সময় ইস্ত্রি করলেও কিছু অভ্যাসের মাধ্যমে বিদ্যুৎ খরচ কমানো সম্ভব:
একসঙ্গে কয়েকটি কাপড় ইস্ত্রি করুন: প্রতিদিন একটি বা দুটি কাপড়ের জন্য বারবার ইস্ত্রি গরম করার বদলে একসাথে কয়েকটি কাপড় ইস্ত্রি করলে সময় ও বিদ্যুৎ উভয়ই সাশ্রয় হয়।
কাপড় অনুযায়ী তাপমাত্রা নির্ধারণ: সব ধরনের কাপড়ের জন্য সর্বোচ্চ তাপমাত্রার প্রয়োজন হয় না। কাপড়ের ধরন অনুযায়ী তাপমাত্রা সেট করে রাখা উচিত।
অপ্রয়োজনে চালু রাখবেন না: কাপড় সাজানোর সময় বা অন্য কাজে ব্যস্ত থাকলে ইস্ত্রি চালু রাখা অনুচিত।
কাজ শেষে প্লাগ খুলে রাখা: ইস্ত্রি ব্যবহার শেষ হলে শুধু সুইচ বন্ধ করলেই হবে না, প্লাগ খুলে রাখার অভ্যাস করা ভালো।
সঠিক ক্ষমতা দেখে কেনা: নতুন ইস্ত্রি কেনার সময় শুধু বেশি ওয়াট মানেই ভালো—এমন ধারণা ভুল। নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী উপযুক্ত ক্ষমতার যন্ত্র বেছে নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ হবে।
পরিশেষে বলা যায়, প্রতিদিন ১০ মিনিট কাপড় ইস্ত্রি করা খুব বড় বিদ্যুৎ খরচের কারণ নয়। ১,০০০ ওয়াটের ইস্ত্রির ক্ষেত্রে ৩০ দিনে তাত্ত্বিক সর্বোচ্চ খরচ প্রায় ৫ ইউনিট এবং ১,৫০০ ওয়াটের ক্ষেত্রে তা প্রায় ৭.৫ ইউনিট। তবে থার্মোস্ট্যাটের কারণে বাস্তবে এই পরিমাণ কিছুটা কম হতে পারে। আপনার ইস্ত্রির প্রকৃত ক্ষমতা এবং মাসিক ব্যবহারের সময় জানলে আপনি নিজেই নিজের জন্য নির্দিষ্ট হিসাব করতে পারবেন।
সূত্র: বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (নতুন ট্যারিফ রেট), বাংলাদেশ বিদ্যুৎ বিভাগ (বিদ্যুতের খুচরা মূল্যহার), বিবিসি নিউজ সার্ভিস (৭৫ ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যুৎ ট্যারিফ সংক্রান্ত প্রতিবেদন)।