বর্তমানে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে তীব্র গ্যাসের সংকট বিরাজ করছে। গ্রামের মানুষের জন্য মাটির চুলায় রান্নার বিকল্প থাকলেও শহরের নাগরিক জীবনে তা প্রায় অসম্ভব। এই বাস্তবতায় রান্নার জন্য গ্যাসের চুলার সবচেয়ে কার্যকর বিকল্প হিসেবে উঠে এসেছে ইন্ডাকশন এবং ইনফ্রারেড বৈদ্যুতিক চুলা।

সম্প্রতি ঢাকার নিউমার্কেটে এক সন্ধ্যায় দেখা গেল, বৈদ্যুতিক চুলার দোকানগুলোতে ক্রেতাদের উপচে পড়া ভিড়। অফিস শেষ করে বছিলা থেকে নিউমার্কেটে চুলা কিনতে এসেছেন শাহ্ নেওয়াজ। দরদাম করে একটি দেশি ব্র্যান্ডের ইন্ডাকশন চুলা কিনে তিনি বলেন, “বাসায় কখন গ্যাস আসবে, তার ঠিকঠিকানা নেই। তাই গ্যাস থাকা না-থাকার দুশ্চিন্তা থেকে বাঁচতে আজ কিনে নিলাম এই ইন্ডাকশন চুলা।”

নিউমার্কেটের বিশ্বাস বিল্ডিংয়ের নিচতলায় অবস্থিত এম কে এন্টারপ্রাইজের বিক্রয় ব্যবস্থাপক আসাদুজ্জামান মামুন জানান, গ্যাসের তীব্র সংকটের কারণে এই চুলার চাহিদা অভাবনীয়ভাবে বেড়েছে। তিনি বলেন, “গ্যাস-সংকটের কারণে চুলার চাহিদা এমন বেড়েছে যে আগে যেখানে দিনে ২-৩টি চুলা বিক্রি হতো, এখন ১০-১৫টি বিক্রি হচ্ছে।” এই পরিসংখ্যান থেকে ধারণা করা যায়, পুরো বাজারের অন্যান্য দোকানে মিলিয়ে প্রতিদিন কত বিপুল পরিমাণ বৈদ্যুতিক চুলা বিক্রি হচ্ছে।

প্রযুক্তিগত দিক থেকে এই চুলার বিশেষত্ব হলো, এতে কোনো আগুনের শিখা ছাড়াই তড়িৎ-চুম্বকের এক বিশেষ ক্রিয়াকৌশলে রান্না সম্পন্ন হয়। ফার্মগেটের বেস্ট বাই শোরুমের উপপরিচালক রবিউল ইসলাম জানান, এসব চুলার সবটুকু অংশ সমানভাবে তাপ ছড়ায় না। রান্নার পাতিল বা পাত্রের যতটুকু অংশ চুলার উপরিভাগ স্পর্শ করে, ঠিক ততটুকু অংশেই তাপ পৌঁছাবে। ফলে ভুল করে অন্য অংশে হাত লেগে গেলেও ভয়ের কিছু নেই। এছাড়া তিনি জানান, ভুল করে সুইচ অন করে ফেললেও চুলার ওপর কোনো রান্নার পাত্র না থাকলে তা তাপ ছড়ায় না। পাত্র বসানোর পরই কেবল তাপ উৎপন্ন হয় এবং রান্না শেষ করে পাত্রটি সরিয়ে নিলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে চুলা বন্ধ হয়ে যায়। পাশাপাশি টাচস্ক্রিন কন্ট্রোলের মাধ্যমে ভোল্টেজ কমানো-বাড়ানোর সুবিধা এবং সময় নির্ধারণের জন্য এতে রয়েছে টাইম কন্ট্রোলার।

ইন্ডাকশন চুলার ক্ষেত্রে একটি বিষয় লক্ষণীয় যে, এতে সরাসরি তাপ উৎপন্ন হয়ে পাত্রের গায়ে লাগে না, বরং চুম্বক রশ্মির মাধ্যমে তাপ টেনে নেয় পাত্র। এই কারণে সব ধরনের পাত্র এখানে ব্যবহার করা যায় না। শুধুমাত্র যেসব পাত্র চুম্বক দ্বারা আকর্ষিত হয়, যেমন স্টিল ও লোহার পাত্রই এখানে ব্যবহার উপযোগী। সর্বোচ্চ সুবিধা পেতে ইন্ডাকশনের জন্য বিশেষভাবে তৈরি পাত্র বেছে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। বাজারে ইন্ডাকশন চুলার জন্য উপযোগী সসপ্যান, কড়াই, ফ্রাইপ্যান ও রুটি বানানোর তাওয়ারের একটি বিশেষ সেট পাওয়া যায়, যার দাম সাড়ে ৩ হাজার থেকে সাড়ে ৪ হাজার টাকার মধ্যে।

বাজারের বিভিন্ন ব্র্যান্ডের ইন্ডাকশন চুলার দামের কথা বললে দেখা যায়, ভিশন ব্র্যান্ডের চুলা ৩ হাজার ৭৫০ থেকে ৪ হাজার ৫৯০ টাকা, ভিগো ব্র্যান্ডের ৩ হাজার ৭৫০ থেকে ৪ হাজার ৪৫০ টাকা এবং ওয়ালটনের দাম ৪ হাজার ৩৯০ থেকে ৫ হাজার ৭৯০ টাকার মধ্যে। এছাড়া কিয়ামের ইন্ডাকশন চুলা ৩ হাজার ৬৯০ থেকে ৭ হাজার ১০০ টাকা এবং মিয়াকো ব্র্যান্ডের চুলা ৫ হাজার ৪৮৪ থেকে ১০ হাজার ৪১৭ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে।

অন্যদিকে, ইনফ্রারেড চুলার ক্ষেত্রে ভিগো ব্র্যান্ডের দাম ৪ হাজার ৫৯০ টাকা পর্যন্ত এবং ভিশন ব্র্যান্ডের দাম ৩ হাজার ৪০০ থেকে ৪ হাজার ৯৫০ টাকার মধ্যে। ওয়ালটনের ইনফ্রারেড চুলার দাম ৩ হাজার ৮৯০ থেকে ৫ হাজার ৫৯০ টাকা। এছাড়া ওয়ালটনের ডাবল বার্নারের ইনফ্রারেড চুলা ৮ হাজার ৪৯০ টাকায় এবং ভিশন ব্র্যান্ডের অনুরূপ চুলা ৯ হাজার টাকায় পাওয়া যাচ্ছে। কিয়াম ব্র্যান্ডের দাম ৪ হাজার থেকে ৭ হাজার টাকা এবং মিয়াকোর দাম ৪ হাজার থেকে ৫ হাজার ৩০০ টাকার মধ্যে।

এম কে এন্টারপ্রাইজের বিক্রয় ব্যবস্থাপক আসাদুজ্জামান মামুন আরও জানান, বাজারে প্রেস্টিজ, ডিজনি, হকিংস এবং নোভা-র মতো বিভিন্ন ব্র্যান্ডের বৈদ্যুতিক চুলা ৩ হাজার ৫০০ থেকে ৭ হাজার ৫০০ টাকার মধ্যে পাওয়া যাচ্ছে। অধিকাংশ ব্র্যান্ডই এই পণ্যগুলোর সাথে ছয় মাস থেকে এক বছরের ওয়ারেন্টি সুবিধা প্রদান করছে।

বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের ক্ষেত্রে এই চুলার মূল ভিত্তি হলো এর তাপীয় দক্ষতা। সহজভাবে বললে, চুলা যে পরিমাণ বিদ্যুৎ গ্রহণ করে তার কতটুকু সরাসরি পাত্র গরম করতে ব্যবহৃত হয় এবং কতটুকু অপচয় হয়, তার ওপরই সাশ্রয় নির্ভর করে। সাধারণ গ্যাসের চুলার ক্ষেত্রে তাপের প্রায় ৪০-৬০ শতাংশ চারপাশের বাতাসে ছড়িয়ে নষ্ট হয়। বিপরীতে, ইন্ডাকশন চুলা তড়িৎ-চৌম্বকীয় ক্ষেত্রের মাধ্যমে সরাসরি পাতিলের তলা গরম করে, ফলে বিদ্যুতের ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশ তাপ সরাসরি রান্নায় ব্যবহৃত হয়। এর ফলে রান্নার সময় অর্ধেকেরও নিচে নেমে আসে। উদাহরণস্বরূপ, সাধারণ গ্যাসের চুলায় ১ লিটার পানি ফুটতে ৭-৮ মিনিট লাগলেও ইন্ডাকশন চুলায় তা হয় আড়াই থেকে তিন মিনিট। রান্নার সময় কম লাগার অর্থ হলো বিদ্যুৎ খরচও কম হবে। ইনফ্রারেড চুলার ক্ষেত্রে ৭০-৭৫ শতাংশ তাপ সরাসরি পাত্রে যায় এবং ১ লিটার পানি ফুটতে ৪-৫ মিনিট সময় লাগে। সেই সঙ্গে পাত্র সরিয়ে নিলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়ার ‘অটো-কাট অফ’ এবং তাপমাত্রা অনুযায়ী ওয়াট কমানোর ‘ইনভার্টার প্রযুক্তি’র কারণে বিদ্যুৎ খরচ আরও ১৫-২০ শতাংশ কমানো সম্ভব হয়।