প্রতিশোধের তালিকা শেষ হয়েছে, লড়াই শেষ হয়নি। সহযোদ্ধা, স্ত্রী ও কন্যাকে হারানো জেমস রিস এবার খুঁজছেন বেঁচে থাকার নতুন উদ্দেশ্য। কিন্তু সবকিছু থেকে দূরে সরে গেলেও বিপদ তাঁর পিছু ছাড়ে না। নতুন এক ষড়যন্ত্র তাঁকে আবার ফিরিয়ে আনে অভিযানে। এবার সেই ষড়যন্ত্রের সঙ্গে জড়িয়ে আছে তাঁর নিজের পরিবারের অতীতও।

দীর্ঘ চার বছরের বেশি সময় পর ‘দ্য টার্মিনাল লিস্ট’-এর দ্বিতীয় মৌসুমে জেমস রিসের চরিত্রে পুনরায় ফিরছেন জনপ্রিয় অভিনেতা ক্রিস প্র্যাট। মার্কিন নৌবাহিনীর বিশেষ বাহিনী নেভি সিলের এই কমান্ডারের ব্যক্তিগত প্রতিশোধের লড়াই দর্শক প্রথম মৌসুমে প্রত্যক্ষ করেছিলেন। তবে এবার তাঁর সামনে অপেক্ষা করছে আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের এক জটিল জাল।

ডেভিড ডিজিলিওর সৃষ্ট এই অ্যাকশন–থ্রিলার সিরিজটির নতুন মৌসুম আগামী বুধবার, ২১ অক্টোবর, প্রাইম ভিডিওতে মুক্তি পেতে যাচ্ছে। সিরিজের আটটি পর্বই একসঙ্গে প্রকাশ করা হবে বলে জানানো হয়েছে। পুরো নির্মাণের সার্বিক তত্ত্বাবধানে রয়েছেন খোদ ডিজিলিও।

প্রথম মৌসুমে কী ঘটেছিল

২০২২ সালের জুলাই মাসে মুক্তি পেয়েছিল ‘দ্য টার্মিনাল লিস্ট’-এর প্রথম মৌসুম। মার্কিন লেখক এবং সাবেক নেভি সিল সদস্য জ্যাক কারের লেখা একই নামের উপন্যাসের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয় এই সিরিজটি।

গল্পের শুরু হয় একটি গোপন সামরিক অভিযান দিয়ে, যেখানে জেমস রিসের দল অতর্কিত হামলার শিকার হয়। সহযোদ্ধাদের হারিয়ে ফিরে আসার পরও সেই ভয়াবহ অভিযানের স্মৃতি তাঁকে তাড়া করে বেড়াতে থাকে। সেখানে ঠিক কী ঘটেছিল এবং কারা এর জন্য দায়ী—এই সব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে শুরু করেন তিনি।

সত্যের সন্ধানে নামার পর রিস উপলব্ধি করেন যে, বিপদ কেবল যুদ্ধক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নেই। তাঁর নিজের জীবন এবং পরিবারের নিরাপত্তাও চরম হুমকির মুখে। পরবর্তীতে স্ত্রী ও কন্যার নির্মম হত্যাকাণ্ডের ঘটনা তাঁকে বাধ্য করে প্রতিশোধের এক রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ে নামতে। তিনি একে একে ষড়যন্ত্রে জড়িত ব্যক্তিদের খুঁজে বের করতে থাকেন।

প্রথম মৌসুমের উত্তেজনার মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল রিসের এই অনুসন্ধান। কাকে বিশ্বাস করা যায়, তাঁর বিরুদ্ধে কারা কাজ করছে এবং কেন—এই সব রহস্যের মধ্য দিয়েই এগিয়েছিল প্রতিশোধের গল্পটি।

এবার গল্পের শুরু কোথায়

দ্বিতীয় মৌসুমটি নির্মিত হয়েছে জ্যাক কারের ‘ট্রু বিলিভার’ উপন্যাস অবলম্বনে। জেমস রিসকে কেন্দ্র করে লেখা উপন্যাস সিরিজের এটি দ্বিতীয় বই। প্রকাশক সাইমন অ্যান্ড শুস্টারের দেওয়া কাহিনি সংক্ষেপ অনুযায়ী, পরিবার ও সহযোদ্ধাদের হত্যার প্রতিশোধ নেওয়ার পর রিস আশ্রয় নেন আফ্রিকার দেশ মোজাম্বিকে। পরিচিত জীবন থেকে দূরে থাকা এই মানুষটির সামনে তখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায় নতুন করে বেঁচে থাকার উদ্দেশ্য।

তবে পশ্চিমা বিশ্বে একের পর এক সন্ত্রাসী হামলা ঘটতে শুরু করলে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ তাঁকে পুনরায় অভিযানে ফেরাতে চায়। রিসের বিশেষ অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা তখন তাদের জন্য অপরিহার্য হয়ে পড়ে। সেখান থেকেই শুরু হয় এক নতুন লড়াই। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসও নতুন মৌসুমের পরিচিতিতে রিসের মোজাম্বিক অভিযানের কথা উল্লেখ করেছে।

মস্কো থেকে ল্যাংলি

প্রাইম ভিডিওর প্রকাশিত কাহিনি সংক্ষেপ অনুযায়ী, এবারের ষড়যন্ত্রের সূত্র ছড়িয়ে থাকবে মস্কো থেকে সিআইএর সদর দপ্তর ল্যাংলি পর্যন্ত। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে রিসের পারিবারিক ইতিহাসের এক রহস্যময় দিক।

ফলে নতুন এই অভিযান কেবল বাইরের শত্রুকে খুঁজে বের করার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না; বরং পরিবারের অতীতের মুখোমুখিও হতে হবে তাঁকে। গল্পের প্রেক্ষাপট ভারত মহাসাগর থেকে আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য হয়ে ইউরোপ পর্যন্ত বিস্তৃত হবে।

প্রথম মৌসুমের মনস্তাত্ত্বিক প্রতিশোধের গল্প এভাবেই এবার আন্তর্জাতিক গুপ্তচরবৃত্তির বিশাল জগতে রূপ নিচ্ছে। সামরিক অভিযান, গোয়েন্দা তৎপরতা ও ষড়যন্ত্রের গল্প যাঁদের পছন্দ, তাঁদের জন্য নতুন মৌসুমে থাকছে প্রচুর আকর্ষণীয় উপাদান।

কারা থাকছেন নতুন মৌসুমে

জেমস রিস চরিত্রে ক্রিস প্র্যাটের পাশাপাশি সাংবাদিক কেটি বুরানেক চরিত্রে ফিরছেন কনস্ট্যান্স উ। এছাড়া অভিনয় করছেন টম হপার, দার সেলিম ও লুক হেমসওয়ার্থ।

অভিনয়শিল্পীদের তালিকায় নতুন করে যুক্ত হয়েছেন গ্যাব্রিয়েল লুনা, ওলগা কুরিলেঙ্কো, কোস্টা রোনিন ও আর্নল্ড ভসলোসহ আরও অনেকে। গ্যাব্রিয়েল লুনাকে দেখা যাবে ফ্রেডি স্ট্রেইন চরিত্রে।

সিরিজটিতে অভিনয়ের পাশাপাশি নির্বাহী প্রযোজকের দায়িত্বও পালন করছেন ক্রিস প্র্যাট। অন্য নির্বাহী প্রযোজকদের মধ্যে রয়েছেন ডেভিড ডিজিলিও, জ্যাক কার ও অঁতোয়ান ফুকুয়া। প্রযোজনায় যুক্ত আছে অ্যামাজন এমজিএম স্টুডিওস, এমআরসি ও সিভিক সেন্টার মিডিয়া।

সামরিক অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়েছেন নির্মাতারা

সামরিক অভিযানের দৃশ্যগুলোকে বাস্তবসম্মত ও বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে নির্মাতারা বাস্তব অভিজ্ঞতার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। মূল উপন্যাসের লেখক জ্যাক কার নিজেই নেভি সিলের সাবেক সদস্য। এছাড়া নির্মাণ প্রক্রিয়ায় যুক্ত ছিলেন সাবেক নেভি সিল সদস্য জ্যারেড শ এবং সাবেক আর্মি রেঞ্জার ম্যাক্স অ্যাডামস।

তাঁদের পাশাপাশি সামরিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন আরও অনেক বিশেষজ্ঞ চিত্রনাট্য, অভিনয়, শুটিংয়ের কারিগরি পরামর্শ ও পরিচালনায় কাজ করেছেন। এর উদ্দেশ্য ছিল কেবল অভিযানের দৃশ্য ফুটিয়ে তোলা নয়, বরং বিশেষ বাহিনীর সদস্যদের মানসিকতা, পারস্পরিক সম্পর্ক এবং কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিষয়গুলো বিশ্বাসযোগ্যভাবে উপস্থাপন করা।

প্রাইম ভিডিওর মূল প্রতিষ্ঠান অ্যামাজনের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক নিবন্ধে প্র্যাট জানিয়েছেন, বিশেষ অভিযানে নিয়োজিত সদস্যদের কাজ ও আত্মত্যাগকে সম্মান জানানো ছিল তাঁদের অন্যতম উদ্দেশ্য। অ্যাকশন আর রোমাঞ্চের পাশাপাশি আড়ালে থেকে কাজ করে যাওয়া সেই মানুষদের অভিজ্ঞতাও তুলে ধরতে চেয়েছেন তাঁরা।

মাঝখানে এসেছে ‘ডার্ক উলফ’

মূল সিরিজের দুই মৌসুমের মধ্যবর্তী সময়ে মুক্তি পায় ‘দ্য টার্মিনাল লিস্ট: ডার্ক উলফ’। এটি একই গল্পজগতের একটি প্রিকুয়েল, অর্থাৎ মূল সিরিজের আগের সময়ের ঘটনা নিয়ে তৈরি। বেন এডওয়ার্ডস চরিত্রকে কেন্দ্র করে তাঁর সামরিক ও গোয়েন্দা জীবনের পটভূমি সেখানে তুলে ধরা হয়েছে। চরিত্রটিতে অভিনয় করেছেন টেলর কিটশ। নতুন মৌসুমের আগে প্রথম মৌসুমের পাশাপাশি এই সিরিজটিও দেখা যাবে প্রাইম ভিডিওতে।

তবে এবার মনোযোগ আবারও ফিরে যাচ্ছে জেমস রিসের দিকে। প্রতিশোধের তালিকা শেষ করার পর জীবন তাঁকে কোথায় নিয়ে যায়, সেই প্রশ্নের উত্তর নিয়েই শুরু হচ্ছে ‘দ্য টার্মিনাল লিস্ট’-এর নতুন অধ্যায়।