একটি মৃত গরু পড়ে আছে, যার শরীরজুড়ে গভীর ক্ষত। চারপাশে মাছিদের ভনভন শব্দ। কে বা কারা এমন নৃশংসভাবে প্রাণীটিকে হত্যা করল? দক্ষিণ কোরিয়ার উত্তর কোরিয়া সীমান্তঘেঁষা ছোট্ট শহর হোপ হারবারে এই রহস্যের তদন্তভার পান পুলিশপ্রধান বিওম-সক (হোয়াং জং-মিন)। তবে এই একটি গরুর মৃত্যু যে এক ভয়াবহ বিপর্যয়ের আগাম সংকেত, তা বুঝতে তাঁর খুব বেশি সময় লাগেনি। খুব দ্রুতই পুরো শহরজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে লাশের স্তূপ, ভেঙে পড়তে থাকে ভবনের দেয়াল; চারদিক প্রকম্পিত হয় গুলির শব্দ আর মানুষের আর্তনাদে। এক অদৃশ্য শক্তির বিরুদ্ধে শুরু হয় জীবন বাঁচানোর লড়াই। কোরীয় নির্মাতা না হং-জিনের ‘হোপ’ সিনেমাটি শুরু থেকেই দর্শককে এমন এক অস্থির জগতে নিয়ে যায়, যেখানে বিপদের উৎস বোঝার আগেই বিপর্যয় এসে হাজির হয়। প্রায় ১৬০ মিনিটের এই সায়েন্স ফিকশন–অ্যাকশন থ্রিলারে এলিয়েনের সঙ্গে মানুষের সংঘাতের পাশাপাশি রয়েছে ডার্ক হিউমার, সহিংসতা এবং একের পর এক অপ্রত্যাশিত মোড়। সব মিলিয়ে সিনেমাটি প্রচলিত দানব কেন্দ্রিক গল্পের চেয়ে অনেক বেশি বেপরোয়া। তবে দুর্দান্ত অ্যাকশনের এই আয়োজনটি শেষ পর্যন্ত সমান গতি ধরে রাখতে পারেনি।

একনজরে সিনেমা: ‘হোপ’
ধরন: সায়েন্স ফিকশন–অ্যাকশন–থ্রিলার
পরিচালক: না হং-জিন
অভিনয়: হোয়াং জং-মিন, জুং হে–ইওন, জো ইন-সাংও, মাইকেল ফাসবেন্ডার ও অ্যালিসিয়া ভিকান্দর
স্ট্রিমিং: অ্যাপল টিভি+ (রেন্ট)
দৈর্ঘ্য: ২ ঘণ্টা ৪০ মিনিট

সিনেমার প্রারম্ভিক পর্যায়টি অত্যন্ত চমৎকার। পরিচালক শুরুতেই দানবটিকে সরাসরি পর্দায় দেখাননি। বরং ধ্বংসস্তূপ, মৃতদেহ, গুলির শব্দ এবং আতঙ্কিত মানুষের প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে তার উপস্থিতি বুঝিয়ে দিয়েছেন। বিওম-সক শহরে প্রবেশ করে একের পর এক মৃতদেহ দেখতে থাকেন। পরিচিত মানুষদের লাশ পড়ে থাকতে দেখে তাঁর পেশাদারি নির্লিপ্ততা ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ে। পরিস্থিতি সামলানোর মতো পর্যাপ্ত পুলিশ সদস্য বা প্রস্তুতি—কোনোটিই তাঁর হাতে ছিল না। অন্যদিকে, তাঁর আত্মীয় সুং-কি (জো ইন–সাং)-এর নেতৃত্বে একটি শিকারি দল রহস্যময় প্রাণীটিকে খুঁজতে বনে প্রবেশ করে। শহরে বিওম-সকের সঙ্গে যোগ দেন নবীন পুলিশ কর্মকর্তা সুং-এ (জুং হে–ইওন)। দায়িত্ববোধ এবং সাহসের জোরে তিনি বিপদের মুখে পড়তে দ্বিধাবোধ করেন না। তবে প্রাণীটির শক্তি সম্পর্কে তাদের ধারণা যত বাড়ে, নিজেদের অসহায়ত্বও তত বেশি স্পষ্ট হতে থাকে।

প্রথম এক ঘণ্টায় দানবকে আড়ালে রেখে যে আতঙ্ক তৈরির কৌশল নেওয়া হয়েছে, তা দারুণ কার্যকর। দর্শকও চরিত্রগুলোর মতোই ভাবতে থাকেন—এটি কি কোনো বাঘ, অন্য কোনো হিংস্র প্রাণী, নাকি পৃথিবীর বাইরের কোনো সত্তা? রহস্যের জট খোলার আগেই একের পর এক বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি করে পরিচালক উত্তেজনা ধরে রেখেছেন।

‘হোপ’–এর সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো এর অ্যাকশন। দ্রুতগতির গাড়ির ধাওয়া, বিপজ্জনক ইউটার্ন, বন্দুকযুদ্ধ, বিস্ফোরণ এবং দানবের আক্রমণ—সবকিছুই এমন ছন্দে সাজানো যে দর্শক স্বস্তিতে বসার সুযোগ পান না। বিশেষ করে গাড়ির ধাওয়ার দৃশ্যগুলোতে ক্যামেরার ব্যবহার ছিল চোখে পড়ার মতো। চলন্ত গাড়ির সঙ্গে ক্যামেরার গতি এমন সাবলীলভাবে পরিবর্তিত হয় যে দৃশ্যগুলো একই সঙ্গে উত্তেজনাপূর্ণ ও দৃষ্টিনন্দন হয়ে উঠেছে।

চিত্রগ্রাহক হং কিয়ং-পিয়োর কাজ ছিল প্রশংসনীয়। ‘প্যারাসাইট’ ও ‘দ্য ওয়েইলিং’–এর মতো সিনেমায় কাজ করা এই চিত্রগ্রাহক বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির মধ্যেও ক্যামেরাকে এমনভাবে পরিচালনা করেছেন, যাতে দৃশ্যের গতি ও স্থানিক ব্যাপ্তি দুটিই স্পষ্টভাবে বোঝা যায়। ধ্বংসস্তূপের মধ্যে চরিত্রদের ছোটাছুটি, সরু রাস্তা দিয়ে দ্রুত গাড়ি ছুটে যাওয়া কিংবা হঠাৎ আক্রমণের মুহূর্ত—সবকিছুতেই নিখুঁত যত্নের ছাপ রয়েছে।

তবে সিনেমাটিকে কেবল একটি গম্ভীর অ্যাকশন থ্রিলার হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এতে রয়েছে অদ্ভুত সব কৌতুক, উদ্ভট পরিস্থিতি এবং চরিত্রদের হাস্যকর ভুলভ্রান্তি। কখনো ভুল করে নিরীহ কাউকে লক্ষ্য করে গুলি চালিয়ে বসে তারা, আবার কখনো বিপদের মুখে এমন সব সিদ্ধান্ত নেয় যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। রক্তপাত ও মৃত্যুর মতো ভয়াবহ ঘটনার পাশে ডার্ক হিউমার প্রথমে অপ্রত্যাশিত মনে হতে পারে, কিন্তু পরিচালকের নির্মাণভঙ্গির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার পর এই বৈপরীত্যই হয়ে ওঠে সিনেমাটির অন্যতম আকর্ষণ।

বিওম-সক চরিত্রে হোয়াং জং-মিন সিনেমাটির বড় দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছেন। শুরুতে তাঁকে একজন অভিজ্ঞ ও আত্মবিশ্বাসী পুলিশ কর্মকর্তা মনে হলেও, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে তাঁর সেই আত্মবিশ্বাসে চিড় ধরে। ভয়, হতাশা ও দায়িত্ববোধের টানাপোড়েন চরিত্রটিকে ধীরে ধীরে বদলে দেয় এবং হোয়াং জং-মিন এই পরিবর্তনকে অত্যন্ত বিশ্বাসযোগ্য করে তুলেছেন।

অন্যদিকে, সুং-এ চরিত্রে জুং হে–ইওন সিনেমাটির বড় চমক। ‘স্কুইড গেম’ দিয়ে আন্তর্জাতিক খ্যাতি পাওয়া এই অভিনেত্রী এখানে অ্যাকশন দৃশ্যেও সাবলীল। অস্ত্র হাতে বিপদের দিকে এগিয়ে যাওয়া থেকে শুরু করে সহকর্মীদের পাশে দাঁড়ানো—সব ক্ষেত্রেই তাঁর উপস্থিতি নজর কাড়ে। চরিত্রটির সাহসের পাশাপাশি পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার দৃঢ়তাও ফুটিয়ে তুলেছেন তিনি। অ্যাকশন তারকা হিসেবে হোয়নের সম্ভাবনা যে যথেষ্ট, সিনেমাটি তার প্রমাণ দেয়।

সুং-কি চরিত্রে জো ইন-সাংও গল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবে চরিত্রগুলোর ব্যক্তিগত জীবন বা মানসিক জগৎ সম্পর্কে খুব বেশি জানার সুযোগ মেলেনি। সিনেমাটি তাদের গভীরভাবে চেনানোর চেয়ে বিপদের মুখে তাদের আচরণ দেখাতেই বেশি আগ্রহী। ‘হোপ’–এর গল্পের ভেতরে আরেকটি প্রশ্ন ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে ওঠে—অচেনা কাউকে দেখলেই কি তাকে শত্রু ভাবতে হবে? উত্তর কোরিয়ার সীমান্তঘেঁষা শহরটির বাসিন্দারা এমন এক পরিবেশে থাকেন, যেখানে অনুপ্রবেশকারী ও শত্রুর আশঙ্কা দৈনন্দিন জীবনের অংশ। অপরিচিত কাউকে সন্দেহ করা বা অস্ত্র হাতে প্রতিরোধ গড়ে তোলা যেন তাদের স্বভাবজাত হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এই মানসিকতা রহস্যময় প্রাণীটির আবির্ভাবের পর আরও তীব্র হয়। শহরবাসী প্রথমে বোঝার চেষ্টা করে না যে প্রাণীটি কী চায় বা কেন এসেছে; তাদের প্রতিক্রিয়া মূলত ভয় ও আগ্রাসননির্ভর। কিন্তু গল্প যত এগোয়, ততই স্পষ্ট হয় যে যাদের বিরুদ্ধে মানুষ যুদ্ধ করছে, তাদের সম্পর্কেও অনেক কিছু অজানা রয়ে গেছে।

পরিচালক প্রচলিত অ্যাকশন সিনেমার নায়কোচিত ধারণাকে এখানে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন। সাধারণত এমন গল্পে মানুষ নিজের ঘরবাড়ি ও পরিবার রক্ষার জন্য দানবের বিরুদ্ধে লড়ে এবং দর্শক তাদের জয় কামনা করে। কিন্তু ‘হোপ’ সেই নিশ্চিন্ত অবস্থানটিকে নড়বড়ে করে দেয়। মানুষের লোভ, সংকীর্ণতা ও সহিংসতা সামনে আসতে থাকলে প্রশ্ন জাগে, বিপদের প্রকৃত উৎস কি শুধু অজানা প্রাণীটিই?

সিনেমাটি এই ভাবনাকে খুব গভীর কোনো দার্শনিক আলোচনায় নিয়ে যায় না, বরং চরিত্রদের আচরণ ও গল্পের মোড়ের মধ্য দিয়ে দর্শককে নিজের অবস্থান নিয়ে ভাবতে বাধ্য করে। এই দিকটি সিনেমাটিকে নিছক দানব-শিকারের গল্পের বাইরে নিয়ে যায়।

সামগ্রিকভাবে উপভোগ্য হলেও ‘হোপ’ পুরোপুরি সন্তুষ্ট করতে পারে না। সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল এর ভিজ্যুয়াল ইফেক্টস বা সিজিআই। বাস্তব লোকেশনে ধারণ করা দৃশ্যগুলো যেখানে প্রাণবন্ত ও বিশ্বাসযোগ্য, সেখানে দানবের কিছু দৃশ্য তুলনামূলক দুর্বল মনে হয়। ফলে যে প্রাণীকে ঘিরে এত রহস্য ও আতঙ্ক তৈরি করা হয়েছে, পর্দায় তার উপস্থিতি কখনো কখনো প্রত্যাশিত প্রভাব তৈরি করতে ব্যর্থ হয়।

দ্বিতীয় সমস্যাটি হলো সিনেমার দৈর্ঘ্য। প্রথম ঘণ্টায় যে রহস্য ও উত্তেজনা দর্শককে ধরে রাখে, মাঝের অংশে তার গতি কিছুটা কমে যায়। বনের মধ্যে শিকারিদের অভিযান, প্রাণীটির পরিচয় নিয়ে নানা ইঙ্গিত এবং একের পর এক অ্যাকশন দৃশ্য গল্পকে এগিয়ে নেওয়ার বদলে কখনো কখনো একই জায়গায় ঘোরাফেরা করে। কয়েকটি ধাওয়া ও সংঘর্ষের দৃশ্য প্রয়োজনের তুলনায় দীর্ঘ হওয়ায় উত্তেজনার তীব্রতাও কমে আসে।

শেষভাগে সিনেমাটি পুনরায় গতি ফিরে পায়। তবে শেষের দিকে এলিয়েনদের পরিচয় ও তাদের জগৎ নিয়ে নতুন তথ্য হাজির হলেও অনেক প্রশ্নের উত্তর মেলে না। বরং বোঝা যায়, গল্পের আরও একটি পর্বের সম্ভাবনা তৈরি করে রেখেছেন নির্মাতা। এতে পরবর্তী সিনেমা দেখার আগ্রহ তৈরি হতে পারে, তবে স্বতন্ত্র গল্প হিসেবে পূর্ণ পরিণতি না পাওয়ায় পুরো তৃপ্তি মেলে না।

না হং-জিন এর আগে ‘দ্য চেজার’, ‘দ্য ইয়েলো সি’ ও ‘দ্য ওয়েইলিং’ সিনেমায় ঘরানার প্রচলিত নিয়ম ভেঙেছেন। ‘হোপ’–এও সেই প্রবণতা দেখা যায়। তবে এবার তিনি বড় পরিসরের অ্যাকশন, অস্বাভাবিক পরিস্থিতি ও ডার্ক হিউমারের মিশেলে দর্শককে বিনোদনমূলক সিনেমা উপহার দিতে চেয়েছেন। সঙ্গে মানুষের ভয় ও নিষ্ঠুরতা নিয়ে কিছু প্রশ্নও জুড়ে দিয়েছেন তিনি। শিল্পের বিচারে তিনি পুরোপুরি সফল নন, তবে বিনোদনের হিসেবে বছরের অন্যতম সেরা কোরীয় সিনেমা ‘হোপ’; এতে সন্দেহ নেই।