পার্ক দে প্রিন্সেস স্টেডিয়ামে খেলা তখনও শুরু হয়নি। খেলোয়াড়রা টানেল দিয়ে মাঠে নামছিলেন। ঠিক সেই মুহূর্তে একটি গোলপোস্টের পেছনের গ্যালারিতে পিএসজি সমর্থকদের হাতে হাতে ভেসে উঠল বিশাল এক ‘তিফো’ বা ব্যানার। তবে সেই ব্যানারে যে দৃশ্যটি ফুটিয়ে তোলা হয়েছিল, তা বার্সেলোনার কোনো সমর্থকেরই পছন্দ হবে না।

দেখা গেল, মুখোশ পরা এক ব্যক্তি করাত চালাচ্ছেন বার্সার ব্যাজে! এই দৃশ্য ফুটিয়ে তোলার পাশাপাশি ব্যানারের নিচে বার্সার জন্য একটি বার্তাও লেখা ছিল—‘ম্যাসাকার, প্যারিসিয়ান স্টাইল।’ বাংলায় এই কথার আক্ষরিক অর্থ খেলার সাথে খুব একটা খাপ খায় না, বরং প্যারিসে চলমান সহিংস দাঙ্গার সাথে তা বেশি মানানসই। তবে ফুটবল খেলার প্রেক্ষাপটে এই বার্তাটির কাছাকাছি অর্থ হতে পারে, ‘নৃশংস ধংসযজ্ঞ চালাও প্যারিসীয় কায়দায়।’

দৃশ্যটিকে আরও বাস্তব করতে ব্যবহার করা হয়েছিল আতশবাজি। তিফোর সেই মুখোশ পরা ব্যক্তির করাত থেকে ছিটকে পড়া স্ফুলিঙ্গ বোঝাতে আতশবাজি পোড়ানো হয়। ইএসপিএন-এর সূত্রে জানা গেছে, ওই ব্যানারে ফুটিয়ে তোলা দৃশ্যপট ছিল ‘অত্যন্ত আক্রমণাত্মক ও আপত্তিকর।’ বার্সেলোনার জন্য এটি মেনে নেওয়া কঠিন ছিল, বিশেষ করে পিএসজির মাঠে ৪–২ গোলে হারের পর। এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে কাতালান ক্লাবটি উয়েফার কাছে পিএসজির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ জানিয়েছে। তবে ক্লান্তি ও প্রস্তুতির ঘাটতি নিয়ে বার্সা কোচ হান্সি ফ্লিক কার কাছে নালিশ জানাবেন!

চ্যাম্পিয়নস লিগে গতকাল রাতে পিএসজির কাছে হারের পর ফ্লিকের বক্তব্যে এই দুটি বিষয় স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। তিনি প্রথমে দলের ভুলের কথা উল্লেখ করেন এবং পরবর্তীতে সেই ভুলের কারণ হিসেবে খেলোয়াড়দের ক্লান্তি ও প্রস্তুতির অভাবের প্রসঙ্গ টানেন।

খেলোয়াড়দের ক্লান্তির বিষয়টি মাঠের পারফরম্যান্সেও স্পষ্ট ছিল, বিশেষ করে রক্ষণভাগের দুর্বলতায়। বার্সার পোস্টে পিএসজি ১৫টি শট নিতে সক্ষম হয়েছে, যা গত এক দশকে বার্সার বিপক্ষে কোনো অফিশিয়াল ম্যাচে সর্বোচ্চ। অন্যদিকে, মাঝমাঠ এবং আক্রমণে বার্সার খেলোয়াড়রা প্রচুর বল হারিয়েছেন।

ম্যাচ শেষে ফ্লিক আক্ষেপ করে বলেন, ‘আমরা অনেক ভুল করেছি। বিশেষ করে বল দখলে, সহজে বল হারিয়েছি...এটা বুঝতে হবে যে খেলোয়াড়রা তরতাজা নেই বলেই ভুল হয়েছে। গত কয়েক সপ্তাহে তাদের যা করতে হয়েছে সেটা অবিশ্বাস্য। তাদের মানসিকতার প্রশংসা করি।’

গত ১১ দিনে লা লিগা ও চ্যাম্পিয়নস লিগ মিলিয়ে মোট চারটি ম্যাচ খেলেছে বার্সেলোনা। তারা দুর্দান্ত ফর্মে ছিল, যার কারণে এই ম্যাচটিকে ইউরোপের বর্তমান সময়ের সেরা দুই ক্লাবের লড়াই হিসেবে অভিহিত করা হচ্ছিল। পিএসজি সর্বশেষ দুবারের চ্যাম্পিয়নস লিগ জয়ী এবং বার্সা এই মৌসুমে প্রথম ১১টি ম্যাচ জিতে ৪৮ গোল করেছে।

তবে লড়াইটি বার্সার প্রত্যাশা অনুযায়ী হয়নি। সংবাদ সম্মেলনে এর কারণ খুঁজতে গিয়ে ফ্লিক প্রস্তুতির ঘাটতির কথা বলেন। তবে এই ঘাটতি তাদের ইচ্ছাকৃত ছিল না। স্পেনে প্রবল ঝড়ের কারণে গত শনিবারে রিয়াল বেতিসকে হারানোর পর সেভিয়া থেকে ফিরতি ফ্লাইট বাতিল হয়ে যাওয়ায় নির্ধারিত পরিকল্পনা থেকে সরে আসতে হয় বার্সাকে। সেই আক্ষেপের কথা জানিয়ে ফ্লিক বলেন, ‘(বেতিসের বিপক্ষে জয়ের) পর কী হয়েছে সবাই জানে। এটি কোনো অজুহাত নয়, শুধু আপনারা যেন বুঝতে পারেন কেন হয়তো আমরা সেরা ছন্দে ছিলাম না।’

খেলোয়াড়দের ব্যক্তিগত পারফরম্যান্স নিয়ে ফ্লিকের কোনো অভিযোগ নেই; তাঁর মতে ম্যাচটি দারুণ হয়েছে। পিএসজি কোচ লুইস এনরিকেও একই কথা মনে করেন। তিনি বলেন, ‘আমরা আগ্রাসী খেলেছি... পেদ্রি, ইয়ামাল, ওলমো, রাফিনিয়া; জানেনই তো এই মানের খেলোয়াড়দের প্রেস করা কত কঠিন। এটাই সেই সর্বোচ্চ পর্যায় আমরা যার মুখোমুখি হয়েছি।’

বার্সার সামনে এখন সবচেয়ে বড় লড়াই ‘এল ক্লাসিকো’। আগামী রোববার রাতে লিগে তাদের প্রতিপক্ষ টেবিলের তৃতীয় স্থানে থাকা রিয়াল মাদ্রিদ। রিয়ালের চেয়ে ৬ পয়েন্ট এগিয়ে শীর্ষে অবস্থান করছে বার্সা। এই ক্লাসিকো ম্যাচের কথা মাথায় রেখেই রদ্রিকে বিশ্রাম দিতে তাঁকে মূল একাদশে রাখেননি ফ্লিক। রাফিনিয়ার নজরও এখন রিয়ালের বিপক্ষে ম্যাচের দিকে। তাই হারের পর দৃঢ় কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘এই হার ক্লাসিকোয় আমাদের সম্ভাবনায় কোনো প্রভাব ফেলবে না।’