মৌসুমের শুরু থেকেই মাঠের লড়াইয়ে অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছে বার্সেলোনা। কোচ হান্সি ফ্লিকের অধীনে লা লিগা এবং চ্যাম্পিয়নস লিগ মিলিয়ে প্রথম ১১টি ম্যাচের সবকটিতেই জয়লাভ করেছে কাতালানরা। তবে এবার তাদের সামনে অপেক্ষা করছে এক কঠিন চ্যালেঞ্জ। প্রতিপক্ষ টানা দুইবারের ইউরোপসেরা দল প্যারিস সেন্ট জার্মেই (পিএসজি)। দুই দলেরই আক্রমণভাগের বিধ্বংসী ছন্দ এবং রক্ষণভাগের চোটের সমস্যা মিলিয়ে এক জমজমাট লড়াইয়ের অপেক্ষায় ফুটবলবিশ্ব।

আগামী মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) প্যারিসের পার্ক দে প্রাঁসে চ্যাম্পিয়নস লিগের লিগ পর্বের তৃতীয় রাউন্ডের ম্যাচে মুখোমুখি হবে এই দুই জায়ান্ট। বাংলাদেশ সময় বুধবার (২১ অক্টোবর) রাত ১টায় ম্যাচটি শুরু হবে। প্রথম দুই ম্যাচ জিতে সমান ৬ পয়েন্ট নিয়ে পয়েন্ট তালিকার শীর্ষ দুই স্থানে অবস্থান করছে পিএসজি ও বার্সেলোনা। গোল ব্যবধানের দিক থেকেও দুই দল সমান, যা হলো +৭। তবে ১০টি গোল করার কারণে তালিকার প্রথম স্থানে রয়েছে পিএসজি, আর বার্সেলোনার গোলসংখ্যা ৯।

চলতি মৌসুমে বার্সেলোনার আক্রমণভাগ প্রতিপক্ষের জন্য এক আতঙ্কের নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে। লা লিগার প্রথম নয়টি ম্যাচের সবকটিতেই জয় পেয়েছে তারা। সর্বশেষ শনিবার রিয়াল বেতিসকে ৫-২ গোলের বড় ব্যবধানে পরাজিত করেছে কাতালানরা। চ্যাম্পিয়নস লিগেও তাদের দাপট অব্যাহত। প্রথম ম্যাচে ফেইনুর্দকে ৫-১ গোলে হারানোর পর গ্যালাতাসারাইয়ের মাঠে ৪-১ ব্যবধানে জয়ী হয়েছে ফ্লিকের শিষ্যরা।

তবে পিএসজিও কোনোভাবেই পিছিয়ে নেই। প্রথম দুই ম্যাচে প্রতিপক্ষের জালে ১০টি গোল জড়াচ্ছে লুইস এনরিকের দল। স্লোভান ব্রাতিস্লাভাকে ৬-১ গোলে উড়িয়ে দেওয়ার পর তারা ম্যানচেস্টার সিটির মাঠে ৪-২ ব্যবধানে জয় পায়। সর্বশেষ ফরাসি লিগে স্ত্রাসবুর্গকে ৩-১ গোলে হারিয়ে আত্মবিশ্বাসের সাথে বার্সেলোনার বিপক্ষে নামছে তারা।

উভয় দলের জন্যই এখন সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তার কারণ রক্ষণভাগ। রিয়াল বেতিসের বিপক্ষে ম্যাচে চোট পাওয়া জুলস কুন্দে ও এরিক গার্সিয়াকে পাচ্ছে না বার্সেলোনা। এর আগে থেকেই মাঠের বাইরে ছিলেন আন্দ্রেয়াস ক্রিস্টেনসেন। ফলে রক্ষণ সাজাতে নতুন কৌশল খুঁজছেন হান্সি ফ্লিক। প্রয়োজনে ফ্রেঙ্কি ডি ইয়ং কিংবা রদ্রিকে রক্ষণভাগে খেলানোর ইঙ্গিত দিয়েছেন এই জার্মান কোচ।

তবে বার্সার জন্য সুখবর হলো রাফিনিয়ার প্রত্যাবর্তন। চোট কাটিয়ে দলে ফিরেছেন এই ব্রাজিলিয়ান ফরোয়ার্ড, যাকে পিএসজির বিপক্ষে শুরুর একাদশে দেখা যেতে পারে। লামিনে ইয়ামাল, পেদ্রি ও রাফিনিয়ার ত্রয়ীর উপস্থিতিতে বার্সেলোনার আক্রমণভাগ আরও শক্তিশালী হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

অন্যদিকে পিএসজির রক্ষণভাগে বড় ধাক্কা হিসেবে এসেছে নুনো মেন্দেসের অনুপস্থিতি। স্ত্রাসবুর্গের বিপক্ষে ম্যাচে বাঁ ঊরুতে চোট পাওয়া এই পর্তুগিজ ডিফেন্ডার আগামী কয়েক সপ্তাহ মাঠের বাইরে থাকবেন। তবে চোট কাটিয়ে স্কোয়াডে ফিরেছেন সেনি মায়ুলু। উসমান দেম্বেলে, ভিতিনিয়া, আশরাফ হাকিমি ও খভিচা কাভারাস্কেইয়াদের মতো তারকাদের নিয়ে শক্তিশালী দল সাজিয়েছেন এনরিকে।

ম্যাচের আগে প্রতিপক্ষের শক্তির কথা স্বীকার করেছেন বার্সেলোনা কোচ ফ্লিক। পিএসজি কোচ লুইস এনরিকেকে বিশ্বের অন্যতম সেরা কোচ হিসেবে অভিহিত করে তিনি বলেন, “তারা টানা দুটি চ্যাম্পিয়নস লিগ জিতেছে। অসাধারণ ফুটবল খেলে। তিনি দারুণ একজন কোচ, বিশ্বের অন্যতম সেরা।”

এই ম্যাচটিকে নিজেদের সামর্থ্য যাচাইয়ের একটি বড় সুযোগ হিসেবে দেখছেন ফ্লিক। তার ভাষায়, “এটি আমাদের জন্য ভালো পরীক্ষা। আমি চাই, সাম্প্রতিক ম্যাচগুলোর মতোই আমার দল আত্মবিশ্বাস, সাহস ও ঐক্য নিয়ে খেলুক। নিজেদের সামর্থ্য দেখানোর সুযোগ এটি। আমরা প্রস্তুত।”

অন্যদিকে, নিজের সাবেক ক্লাব বার্সেলোনার বিপক্ষে জয়ের লক্ষ্য নিয়েই মাঠে নামছেন লুইস এনরিকে। পিএসজি কোচ বলেন, “আমাদের লক্ষ্য ম্যাচটি জেতা। দুটি অসাধারণ ক্লাব, যাদের খেলার ধরনও দুর্দান্ত।”

বার্সেলোনার সঙ্গে নিজের আবেগঘন সম্পর্ক নিয়েও কথা বলেছেন এনরিকে। তিনি বলেন, “আমি বার্সেলোনার খেলোয়াড় ও কোচ ছিলাম। কাতালোনিয়ার সঙ্গে আমার গভীর সম্পর্ক রয়েছে। বার্সেলোনার প্রতিও আমার অনেক টান। কিন্তু এখন আমি পিএসজির কোচ।”

দুই দলের মুখোমুখি লড়াইয়ের ইতিহাস বেশ রোমাঞ্চকর। উয়েফার প্রতিযোগিতায় আগের ১৬টি সাক্ষাতে উভয় দলই জিতেছে ছয়বার করে এবং চারটি ম্যাচ ড্র হয়েছে। তবে সর্বশেষ পাঁচটি লড়াইয়ে পিএসজি জিতেছে তিনবার, আর বার্সেলোনা জিতেছে একবার। গত মৌসুমে বার্সেলোনার মাঠেই ২-১ গোলে জয়লাভ করেছিল ফরাসি চ্যাম্পিয়নরা।

প্যারিসের এই ম্যাচটি হান্সি ফ্লিকের জন্য ব্যক্তিগতভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হতে পারে। পিএসজিকে হারাতে পারলে বার্সেলোনার কোচ হিসেবে শততম জয়ের মাইলফলক স্পর্শ করবেন তিনি।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এই লড়াইয়ে প্রচুর গোলের সম্ভাবনা রয়েছে। চ্যাম্পিয়নস লিগে টানা ১৭ ম্যাচে নিজেদের জাল অক্ষত রাখতে পারেনি বার্সেলোনা। অন্যদিকে পিএসজি ইউরোপের এই প্রতিযোগিতায় টানা ১২ ম্যাচ অপরাজিত। ফলে বার্সেলোনার বিধ্বংসী আক্রমণ আর পিএসজির ধারাবাহিকতার লড়াইয়ে শেষ হাসি কে হাসবে, এখন সেটাই দেখার অপেক্ষা।