গরম ভাতের সঙ্গে ঢেঁড়শ ভাজা বা ঢেঁড়শের পাতলা ঝোল আমাদের অনেকেরই ভীষণ প্রিয়। অনেকে আবার এর পিচ্ছিল স্বভাবের কারণে একদমই ঢেঁড়শ খেতে পছন্দ করেন না। পছন্দ করেন আর না-ই করেন, আমাদের রান্নাঘরের এই অতি পরিচিত সবজিটি কিন্তু পুষ্টিগুণেও বেশ এগিয়ে। যে পিচ্ছিল ভাবের কারণে আপনি ঢেঁড়শ খাচ্ছেন না, সেখানেই আছে শরীরের জন্য দরকারি বেশ কিছু পুষ্টি উপাদান।
অনেকে মনে করেন, শরীরের ক্ষতিকর কোলেস্টেরল কমাতে ঢেঁড়শ নাকি অনেক ভালো কাজ করে। কিন্তু আসলেই কি ঢেঁড়শ খেলে ক্ষতিকর কোলেস্টেরল কমে? চলুন চিকিৎসকরা কী বলছেন জেনে নেওয়া যাক-
ঢেঁড়শের পিচ্ছিল ভাব আসলে কতটা উপকারি?
আমরা রান্না করার সময় ঢেড়শের যে লালা বা পিচ্ছিল ভাব দেখি, চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে ‘মিউসিলেজ’ বলা হয়। এটি এক ধরনের প্রাকৃতিক ও অত্যন্ত শক্তিশালী দ্রবণীয় ফাইবার।
ভারতের বিশিষ্ট গ্যাস্ট্রোএন্টেরোলজিস্টদের মতে, যখনই আমরা ঢেঁড়শ খাই, এই বিশেষ ফাইবারটি পেটের ভেতর গিয়ে পানির সংস্পর্শে এসে একটি নরম জেলির মতো আস্তরণ তৈরি করে। এই জেলি বা জেল-জাতীয় পদার্থটি আমাদের পরিপাকতন্ত্রের মাধ্যমে খাবার চলাচলে সাহায্য করে। ফলে যারা দীর্ঘদিন ধরে কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যায় ভুগছেন, তাদের জন্য এটি ওষুধের মতো কাজ করে। পেট পরিষ্কার রাখার পাশাপাশি পরিপাক প্রক্রিয়াকে একদম স্বাভাবিক রাখতেও সাহায্য করে।
ঢেঁড়শ কীভাবে ক্ষতিকর কোলেস্টেরল কমায়?
আমাদের শরীরে দুই ধরনের কোলেস্টেরল থাকে- ভালো কোলেস্টেরল (এইচডিএল) এবং খারাপ কোলেস্টেরল (এলডিএল) । এই খারাপ কোলেস্টেরল রক্তনালীতে জমে জমে রক্ত চলাচলে বাধা তৈরি করে। এটি পরবর্তীতে হৃদরোগ বা স্ট্রোকের ঝুঁকি অনেক বাড়িয়ে দেয়। গবেষণায় দেখা গেছে, ঢেঁড়শের দ্রবণীয় ফাইবার পরিপাকতন্ত্রে গিয়ে পিত্ত অ্যাসিডের সঙ্গে যুক্ত হয়।
আমাদের লিভার কিন্তু পিত্ত অ্যাসিড তৈরি করার জন্য শরীর থেকে কোলেস্টেরল টেনে নেয়। এখন ঢেঁড়শে থাকা ফাইবার যখন পিত্ত অ্যাসিডের সঙ্গে যুক্ত হয়ে মলের মাধ্যমে তা শরীর থেকে বের করে, তখন লিভারকে নতুন করে আবার পিত্ত অ্যাসিড তৈরি করতে হয়। আর এই নতুন অ্যাসিড বানানোর জন্য লিভার বাধ্য হয়ে রক্তে জমে থাকা খারাপ কোলেস্টেরলকে টেনে খরচ করে ফেলে। ফলে রক্তে খারাপ কোলেস্টেরলের মাত্রা ধীরে ধীরে কমতে শুরু করে।
এর পাশাপাশি ঢেঁড়শের ফাইবার আমাদের অন্ত্রের উপকারী ব্যাকটেরিয়ার পুষ্টি জোগাতেও সাহায্য করতে পারে। এই অণুজীব বা ভালো ব্যাকটেরিয়াগুলো যখন পুষ্টি পায়, তখন পেটের সার্বিক স্বাস্থ্য ভালো থাকে। এতে হজম ক্ষমতাও অনেক গুণ বেড়ে যায়।
তাহলে ঢেঁড়শ খেলেই কি কোলেস্টেরল একেবারে কমে যাবে?
এখন যদি ঢেঁড়শের উপকারের কথা শুনে আপনি ভাবেন খারাপ কোলেস্টেরল কমাতে প্রতিদিন প্লেট ভর্তি করে ঢেঁড়শ খাবেন আর কোলেস্টেরলের ওষুধ বন্ধ করে দেবেন, তাহলে কিন্তু ভুল হবে।
চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, ল্যাবরেটরিতে এবং প্রাণীদের উপর করা চিকিৎসাবিজ্ঞান সংক্রান্ত গবেষণায় ঢেঁড়শের এই গুণগুলো বেশ ইতিবাচক প্রমাণিত হয়েছে। কিন্তু ঢেঁড়শ খেলেই মানবদেহে শতভাগ কোলেস্টেরল কমে যাবে- এমন কোনো প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি। মানুষের শরীরে এর সুনির্দিষ্ট প্রভাব নিয়ে আরও বিস্তারিত গবেষণার প্রয়োজন আছে।
তাই ঢেঁড়শকে আপনি সুস্থ থাকার সহযোগী হিসেবে দেখতে পারেন। কিন্তু কোনো রোগের একমাত্র চিকিৎসা হিসেবে এর ওপর নির্ভর করা বোকামি হবে।
ক্ষতিকর কোলেস্টেরল কমাতে কী করবেন?
ডাক্তারের পরামর্শ মেনে চলুন: আপনার রক্তে যদি কোলেস্টেরলের মাত্রা অনেক বেশি থাকে, তবে অবশ্যই বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ নিন। তিনি যে ওষুধ খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তা নিয়মিত খেয়ে যান।
খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাত্রা: শুধু নির্দিষ্ট একটি সবজির ওপর নির্ভর করবেন না। এর পাশাপাশি ডায়েটে অন্যান্য শাকসবজি ও ফলমূল রাখুন। অতিরিক্ত তেলমসলা দেয়া ও ভাজাপোড়া খাবার এড়িয়ে চলুন।
শরীরচর্চা: শারীরিক পরিশ্রম না করলেও রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা বেড়ে যায়। তাই প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট হাঁটা বা হালকা ব্যায়াম করার অভ্যাস গড়ে তুলুন।
ডায়েটে ঢেঁড়শ রাখুন: সুষম খাবারের পাশাপাশি আপনার প্রতিদিনের মেনুতে ঢেঁড়শের তরকারি, সিদ্ধ বা কম তেলে রান্না করা পদ অনায়াসে রাখতে পারেন। এতে যেমন শরীরের ফাইবারের চাহিদা মিটবে, তেমনই কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখতেও কিছুটা ভুমিকা রাখতে পারে।
তাই কোলেস্টেরল বেশি থাকলে শুধু খাবারের ওপর নির্ভর না করে চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলা জরুরি। সুষম খাবার, নিয়মিত শরীরচর্চা এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসার পাশাপাশি খাদ্যতালিকায় ঢেঁড়শ রাখা যেতে পারে।
সূত্র: টিভি ৯ বাংলা