দুর্গাপূজার আনন্দ মুহূর্তেই বিষাদে পরিণত হয়েছে শংকর বেপারীর পরিবারে। পূজা শেষে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে বাড়ি ফেরার পথে অতিরিক্ত যাত্রী ও মোটরসাইকেল বোঝাই একটি ট্রলার ডুবে মা ও মেয়ে নিখোঁজ হয়ে যান। উদ্ধার অভিযানের কয়েক ঘণ্টা পর মেয়ে অর্পিতার মরদেহ উদ্ধার করা সম্ভব হলেও এখনও নিখোঁজ রয়েছেন তার মা রিনা বেপারী।

সন্তানকে হারানোর শোকে ভেঙে পড়া বাবা শংকর বেপারী আহাজারি করে বলেন, ‘গত রাতেও মেয়ে আমার সঙ্গে ঘুমিয়েছে, আজ সে স্মৃতি। আমি কীভাবে রাতগুলো পার করব? নৌকাডুবির পর যখন আমার পরিবারের কাউকে খুঁজে পাচ্ছিলাম না, তখন হাসপাতালসহ আশপাশের নদীতে খুঁজেছি। সবাই তীরে উঠলেও ওরা নিখোঁজ রয়ে যায়। এখন মেয়ে মারা গেছে, ওর মাও হয়তো বেঁচে নেই।’

গত সোমবার (১৯ অক্টোবর) রাত ৯টার দিকে পিরোজপুরের নাজিরপুর ও নেছারাবাদ উপজেলার সীমান্তবর্তী শ্রীরামকাঠী-ভরতকাঠী ফেরিঘাট এলাকায় কালীগঙ্গা নদীতে এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনাটি ঘটে। জানা গেছে, প্রায় ৫০ জনের বেশি যাত্রী এবং ৬ থেকে ৮টি ভারী মোটরসাইকেল নিয়ে একটি ট্রলার চলাচল করছিল, যা হঠাৎ ডুবে যায়। এই ঘটনায় অধিকাংশ যাত্রী তীরে ফিরতে পারলেও রিনা বেপারী ও তার মেয়ে অর্পিতা নদীতে তলিয়ে যান।

খবর পাওয়ার পরপরই ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা প্রথম দফায় উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করেন, তবে কাউকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। পরবর্তীতে বরিশাল থেকে ডুবুরি দল এনে দ্বিতীয় দফায় অভিযান চালানো হয়। এই দ্বিতীয় অভিযানে নিখোঁজ শিশু অর্পিতার মরদেহ উদ্ধার করা সম্ভব হয়, তবে রিনা বেপারীর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।

মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) রাত ১০টা ১৩ মিনিট পর্যন্ত প্রায় ২৬ ঘণ্টা অতিবাহিত হলেও রিনা বেপারীকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন নাজিরপুর ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের ফায়ার ফাইটার মো. পারভেজ।

নিখোঁজ রিনা বেপারীর (৩৯) বাড়ি নেছারাবাদ উপজেলার গুয়ারেখা ইউনিয়নের ভরতকাঠী গ্রামে। তিনি শংকর বেপারীর স্ত্রী। তাদের একমাত্র মেয়ে অর্পিতার বয়স ছিল মাত্র ৮ বছর। শংকর বেপারী ঢাকার একটি প্রতিষ্ঠানে নিরাপত্তাপ্রহরী হিসেবে কর্মরত। দুর্গোৎসবের ছুটিতে তিনি পরিবার নিয়ে গ্রামের বাড়িতে এসেছিলেন। সোমবার রাতে শ্রীরামকাঠীতে প্রতিমা দর্শন ও পূজা শেষ করে আনন্দের সাথে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ট্রলারে বাড়ি ফিরছিলেন তিনি। কিন্তু অতিরিক্ত বোঝাইয়ের কারণে সেই আনন্দ বিষাদে পরিণত হয় এবং প্রাণ হারায় ছোট্ট অর্পিতা।

প্রত্যক্ষদর্শী এবং ট্রলার থেকে বেঁচে ফেরা এক যাত্রী কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানান, নাজিরপুর প্রান্ত থেকে ভরতকাঠী ফেরিঘাটের উদ্দেশে ছেড়ে আসার সময় ট্রলারটিতে ধারণক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি যাত্রী এবং অন্তত আটটি ভারী মোটরসাইকেল তোলা হয়েছিল। অতিরিক্ত বোঝার কারণে ট্রলারটি ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে এবং ঘাট ছাড়ার পরপরই নদীতে তলিয়ে যায়। চারদিকে তখন বাঁচার আকুতি ও হাহাকার শুরু হয়। অধিকাংশ মানুষ সাঁতরে এবং স্থানীয়দের সহায়তায় তীরে উঠতে পারলেও অন্ধকারের মধ্যে তলিয়ে যান রিনা বেপারী ও তার ছোট্ট মেয়ে অর্পিতা।

দুর্ঘটনাস্থল ও উদ্ধার পরিস্থিতি তদারকি করতে দ্রুত সেখানে পৌঁছান নাজিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাজিয়া শাহনাজ তমা, সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. আহসান হাবিব এবং অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) নাসরিন জাহান। উদ্ধার অভিযানে নেতৃত্ব দিতে ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন পিরোজপুর জেলা ফায়ার সার্ভিসের উপপরিচালক রায়হানুল আশরাফ এবং নাজিরপুর ফায়ার সার্ভিসের পরিদর্শক সোয়াইব হোসেন মুন্সি। এছাড়া আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বজায় রাখতে নাজিরপুর ও নেছারাবাদ থানা-পুলিশের একটি যৌথ দল সেখানে অবস্থান করে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাজিয়া শাহনাজ তমা জানান, ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল তীব্র পানির স্রোতের মধ্যেও দুই দফায় অভিযান চালিয়ে শিশু অর্পিতার মরদেহ উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছে। তিনি আরও বলেন, “এ ঘটনায় যাদের অবহেলা ছিল, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

মঙ্গলবার বেলা ১২টার দিকে দুর্ঘটনাস্থল শ্রীরামকাঠী ও নেছারাবাদের ভরতকাঠী খেয়াঘাট এলাকা সরেজমিনে পরিদর্শন করেন পিরোজপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য ও গৃহায়ন ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী আহম্মেদ সোহেল মনজুর। পরিদর্শনকালে তার সঙ্গে পিরোজপুরের জেলা প্রশাসক মো. গোলাম রাব্বানী ও পুলিশ সুপার মুহাম্মদ তালেবুর রহমান উপস্থিত ছিলেন।