ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর এবং যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও মুম্বাইয়ে এক গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে মিলিত হয়েছেন। মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার কৌশলগত অংশীদারত্বকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে দুই শীর্ষ কূটনীতিক দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল জ্বালানি নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য এবং আধুনিক প্রযুক্তির মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো।
বৈঠক শেষে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় মার্কো রুবিও জানান, দুই দেশের পারস্পরিক সম্পর্ককে আরও সুদৃঢ় করার পাশাপাশি জ্বালানি নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতার বিষয়টিতে বৈঠকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
ভারতে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত সার্জিও গর এই আলোচনাকে ইতিবাচক হিসেবে মূল্যায়ন করেছেন। তিনি উল্লেখ করেন, প্রতিরক্ষা, জ্বালানি, বাণিজ্য এবং উদীয়মান প্রযুক্তির ক্ষেত্রে পারস্পরিক সহযোগিতা আরও গভীর করার লক্ষ্যেই এই আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
অন্যদিকে, জ্বালানি আমদানির সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান এক ভিন্ন চিত্র তুলে ধরেছে। তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে রাশিয়া থেকে অপরিশোধিত তেল আমদানির পরিমাণ প্রায় ১৩ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। এর ফলে টানা দুই মাস আমদানির ক্ষেত্রে নিম্নমুখী প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। তবে এই হ্রাস সত্ত্বেও ভারতের বৃহত্তম জীবাশ্ম জ্বালানি সরবরাহকারী হিসেবে মস্কো তার শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে, যার আর্থিক মূল্য সেপ্টেম্বরে ছিল প্রায় ৪ দশমিক ১ বিলিয়ন ইউরো। বিশ্ববাজারে রাশিয়ার জ্বালানির সবচেয়ে বড় ক্রেতা চীন এবং দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ভারত।
উল্লেখ্য যে, গত জুলাই মাসে ভারত তার মোট আমদানির প্রায় ৫০ দশমিক ৮ শতাংশ তেল রাশিয়া থেকে আমদানি করে একটি রেকর্ড গড়েছিল, যা বর্তমানে কমে প্রায় ৪৪ শতাংশে নেমে এসেছে।
ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে রাশিয়া থেকে তেল না কেনার জন্য নানামুখী চাপ দেওয়া হলেও নয়াদিল্লি তাদের জ্বালানি আমদানি অব্যাহত রেখেছে। মূলত দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে প্রক্রিয়াজাত তেল রপ্তানি কার্যক্রম সচল রাখতেই ভারতীয় শোধনাগারগুলো এই সিদ্ধান্ত ধরে রেখেছে বলে জানা গেছে।
ভারতীয় বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক মস্কোবান্ধব অবস্থান লক্ষ্য করা গেলেও, মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই সফরের পর তেল আমদানির ক্ষেত্রে ভারতের রুশনির্ভরতা কতটা হ্রাস পায়, তা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন।
দ্বিপক্ষীয় আলোচনার পাশাপাশি এস জয়শঙ্কর ও মার্কো রুবিও সংযুক্ত আরব আমিরাতের উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ আবদুল্লাহ বিন জায়েদ আল নাহিয়ানের সঙ্গে একটি ত্রিপক্ষীয় বৈঠকেও অংশ নেন।
এই ত্রিপক্ষীয় বৈঠকের বিষয়ে এক্স বার্তায় জয়শঙ্কর লিখেছেন, বৈঠকে ‘জ্বালানি, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং সমসাময়িক ঘটনাবলি নিয়ে অত্যন্ত কার্যকর মতবিনিময়’ হয়েছে।
অন্যদিকে, মার্কো রুবিও এই সাক্ষাতে সন্তোষ প্রকাশ করে এক্সে লিখেছেন, ‘আঞ্চলিক জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা করতে পেরে এবং আমাদের যৌথ অর্থনৈতিক অগ্রাধিকারগুলোকে এগিয়ে নিতে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ বি জায়েদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে পেরে দারুণ লেগেছে।’
মার্কিন রাষ্ট্রদূত সার্জিও গর জানান, এই ত্রিপক্ষীয় বৈঠকটি জ্বালানি, বাণিজ্য, প্রযুক্তি ও আঞ্চলিক যোগাযোগব্যবস্থার ক্ষেত্রে তিন দেশের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ককে বাস্তব ফলাফলে রূপ দেওয়ার একটি বড় সুযোগ করে দিয়েছে।
বিশ্লেষকদের ধারণা, সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে জ্বালানি সরবরাহ বৃদ্ধির বিষয়ে ভারত কোনো নতুন পরিকল্পনা করছে কি না, এই উচ্চপর্যায়ের বৈঠকটি সেই সম্ভাবনার দিকেই ইঙ্গিত করছে।