ফেনীর সীমান্তবর্তী উপজেলাগুলোতে আশঙ্কাজনক হারে ছড়িয়ে পড়ছে অত্যন্ত ভয়ংকর এক ধরনের মাদক, যা স্থানীয়ভাবে ‘জম্বি ড্রাগ’ হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে পরশুরাম ও ফুলগাজী উপজেলায় এই মাদকের বিস্তার ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে বলে জানা গেছে। সম্প্রতি এই মাদক সেবনের পর দুই যুবককে রাস্তায় অদ্ভুতভাবে মাতলামি করতে দেখা যায়। সেই ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে এলাকায় ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি হয়।

চিকিৎসাবিজ্ঞানে ‘জম্বি ড্রাগ’ কোনো নির্দিষ্ট বা আনুষ্ঠানিক নাম নয়। মূলত বড় পশু বা ঘোড়ার চিকিৎসায় ব্যবহৃত চেতনানাশক ওষুধ ‘জাইলাজিন’-এর সঙ্গে হেরোইন কিংবা ফেন্টানিলের মতো মারাত্মক শক্তিশালী মাদকের মিশ্রণে এটি তৈরি করা হয়। এই মাদক সেবনের পর মানুষ রূপকথার সিনেমার ‘জম্বি’র মতো অনুভূতিহীন হয়ে পড়ে এবং আচ্ছন্ন আচরণ করতে শুরু করে।

‘জম্বি ড্রাগ’ সেবনের পর ব্যবহারকারীরা অনেক সময় চোখ খোলা রেখেই অদ্ভুত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে বা বসে থাকেন। তাদের শরীরের নড়াচড়া করার ক্ষমতা এবং চারপাশের পরিবেশ সম্পর্কে সচেতনতা অত্যন্ত কমে যায়। আক্রান্ত ব্যক্তিরা মেরুদণ্ড সোজা রাখতে বা স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে চরম সমস্যায় পড়েন। এছাড়া তাদের কথা বলা বা সাড়া দেওয়ার ক্ষমতাও মারাত্মকভাবে হ্রাস পায়।

জাইলাজিন মিশ্রিত এই মাদক শরীরের ত্বকের মারাত্মক ক্ষতি করে। এর প্রভাবে ব্যবহারকারীদের ত্বকে পচন ধরে এবং বড় বড় গভীর ক্ষত বা আলসার সৃষ্টি হয়। এটি কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের কার্যক্রমকে মারাত্মকভাবে ধীর করে দেয়। এর ফলে হৃদস্পন্দন ও শ্বাসপ্রশ্বাস অতিরিক্ত কমে গিয়ে ওভারডোজ, কোমা, এমনকি মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে।

গত ১১ অক্টোবর সন্ধ্যায় জেলার পরশুরাম হাসপাতাল সড়কের জালালিয়া সুইটসের সামনে স্থানীয়দের ধারণ করা একটি ভিডিওতে রাজেষপুর নোয়াপাড়ার বাসিন্দা মো. রিপনকে মাতলামি করতে দেখা যায়। এ ছাড়া ফুলগাজী উপজেলার নতুন মুন্সীরহাট এলাকায় শারদীয় মেলায় এক যুবককে ‘জম্বি ড্রাগ’-এর উপসর্গ নিয়ে মাতলামি করতে দেখা যায়। এই দুই ব্যক্তির ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, ভারত থেকে নতুন নতুন ধরনের মাদক দেশে প্রবেশ করায় তরুণ প্রজন্ম দ্রুত এতে আসক্ত হয়ে পড়ছে। এই মরণনেশা থেকে মুক্তি পেতে তারা সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলের দ্রুত পদক্ষেপ ও সুদৃষ্টি কামনা করেছেন।

এ বিষয়ে ফেনীর পরশুরাম উপজেলা প্রেসক্লাবের সভাপতি এম. এ. হাসান মুক্তকণ্ঠকে জানান, ‘পরশুরাম সীমান্তবর্তী উপজেলা। এখানে মাদকের বিস্তার ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। বিশেষ করে হঠাৎ করেই ‘জম্বি ড্রাগ’ নামে একটি মাদকের নাম শোনা যাচ্ছে। মাদকটি সেবনের পর দুজনকে মাতলামিও করতে দেখা গেছে। এ ধরনের মাদকের বিরুদ্ধে সবাইকে সোচ্চার ভূমিকা রাখার পাশাপাশি মাদক প্রতিরোধে করণীয় ঠিক করতে হবে।’

জেলার প্রবীণ সাংবাদিক ও ফেনী প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি একেএম আবদুর রহিম মুক্তকণ্ঠকে জানান, ‘আমাদের ছেলে-মেয়েদের জন্য ‘জম্বি ড্রাগ’ মরণনেশা নিয়ে এসেছে। সীমান্তে যদি কঠোর নজরদারি না করা হয়, তাহলে নতুন এ মাদকে বিপথগামী হবে হাজারো মানুষ। এতে করে বাড়বে সামাজিক অস্থিরতা। এ জন্য সরকারকে দ্রুত এ বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে হবে।’

পরশুরাম মডেল থানার ওসি আশরাফুল ইসলাম মুক্তকণ্ঠকে জানান, ‘একজন ছেলের মাতলামির ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখে তাৎক্ষণিক ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো হয়েছিল। পুলিশ সেখানে গিয়ে তাকে পায়নি। নতুন এ ‘জম্বি ড্রাগ’ সম্পর্কে জনগণকে অবশ্যই সচেতন হতে হবে। এ বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর নজরদারি অব্যাহত রয়েছে।’

ফেনী বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. হাসিবুল ইসলাম মুক্তকণ্ঠকে জানান, ‘ফেনীর সীমান্ত এলাকা দিয়ে যাতে কোনো মাদক প্রবেশ করতে না পারে, সে বিষয়ে জিরো টলারেন্স নীতি অব্যাহত রয়েছে। নতুন করে ছড়িয়ে পড়া ‘জম্বি ড্রাগ’ যাতে সীমান্ত দিয়ে কোনোভাবেই প্রবেশ করতে না পারে, সে বিষয়ে ফেনী বিজিবি সতর্ক অবস্থানে রয়েছে এবং গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।’