শারদীয় দুর্গোৎসবের ছুটিকে কেন্দ্র করে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি খাগড়াছড়িতে পর্যটকদের ব্যাপক ভিড় জমেছে। পাহাড়ের সবুজ প্রকৃতি, গাঢ় নীল আকাশ আর ঝরনার শীতল হাওয়ায় মুগ্ধ হয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে আসছেন ভ্রমণপিপাসুরা। বর্তমানে পুরো জেলাজুড়ে এক উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে। বিশেষ করে ঝরনা, আলুটিলার নান্দনিক গুহা ও ঝুলন্ত সেতু এবং জেলা পরিষদ পার্কসহ জেলার প্রধান সব পর্যটন কেন্দ্র এখন দর্শনার্থীদের পদচারণায় মুখরিত।
উল্লেখ্য যে, কিছুদিন আগে সাজেককেন্দ্রিক স্থানীয় অবরোধ ও উদ্ভূত পরিস্থিতির কারণে খাগড়াছড়িতে পর্যটকদের আগমনের হার কিছুটা হ্রাস পেয়েছিল। তবে জেলা প্রশাসন কর্তৃক ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং সার্বিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পর আবারও দলে দলে পর্যটকরা খাগড়াছড়িতে আসতে শুরু করেছেন।
ঢাকা থেকে পরিবার নিয়ে আলুটিলা পর্যটন কেন্দ্রে আসা পর্যটক আহমেদ নিপু বলেন, “পূজার ছুটিতে পরিবারের সবাইকে নিয়ে একটু রিফ্রেশমেন্টের জন্য পাহাড়ের চেয়ে সেরা জায়গা আর হতে পারে না। আলুটিলা গুহা ও ঝুলন্ত সেতুর পাশাপাশি জেলা পরিষদ পার্কে জিপ লাইন ও জায়ান্ট সুইংয়ে চড়ে আমরা দারুণ রোমাঞ্চিত। নিরাপত্তার পরিবেশও চমৎকার।”
চট্টগ্রাম থেকে বন্ধুদের সঙ্গে আসা আরেক পর্যটক সুমি আক্তার জানান, “সাজেক নিয়ে কিছুটা দ্বিধাদ্বন্দ্ব থাকলেও খাগড়াছড়ির স্থানীয় দর্শনীয় স্থানগুলো ঘুরে আমাদের অসাধারণ অনুভূতি হচ্ছে। বিশেষ করে রিছাং ঝরনার ঠান্ডা পানি আর পাহাড়ের আবহাওয়া সব ক্লান্তি দূর করে দিয়েছে।”
আরেক পর্যটক তৌহিদ হোসেন বলেন, “নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ায় আমরা তড়িঘড়ি করে ট্রিপ প্ল্যান করি। এসে দেখছি চারদিকে প্রচুর মানুষ। খাগড়াছড়ির পাহাড়ের এই নান্দনিক রূপ স্বচক্ষে না দেখলে বিশ্বাসই করা যেত না।”
পর্যটকদের এই ব্যাপক আগমনের ফলে দীর্ঘদিনের মন্দা কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে স্থানীয় পরিবহন খাত। শহরের কলেজ গেট এলাকার চাঁদের গাড়ি (জিপ) চালক মো. লিয়াকত বলেন, “কয়েকদিন গাড়ি বসে ছিল, খুব দুশ্চিন্তায় ছিলাম। কিন্তু পূজার ছুটি শুরু হতেই প্রচুর পর্যটক এসেছেন। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত আমরা পর্যটকদের বিভিন্ন স্পটে নিয়ে যাচ্ছি, ভালো ট্রিপ হচ্ছে।”
একই কথা জানান আরেক সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালক মো. রাসেল। তিনি বলেন, “নিষেধাজ্ঞা উঠে যাওয়ায় আমাদের রোজগার আবার স্বাভাবিক হয়েছে। শহরের ভেতরে এবং আলুটিলা ও জেলা পরিষদ পার্কের দিকে প্রচুর যাত্রী পাচ্ছি। পর্যটকরা আসায় পুরো শহরের অর্থনীতিতে প্রাণ ফিরে এসেছে।”
দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা ও সর্বোচ্চ সুবিধার্থে সার্বিক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে আলুটিলা ও জেলা পরিষদ পার্ক কর্তৃপক্ষ। আলুটিলা পর্যটন কেন্দ্রের তত্ত্বাবধায়ক চন্দ্র কিরণ ত্রিপুরা জানান, “দুর্গাপূজার ছুটিকে কেন্দ্র করে আমরা পার্কটিকে নতুনভাবে সাজিয়েছি। এখানে পর্যটকের উপস্থিতি অনেক বেড়েছে। সাজেকে কিছুদিনের অবরোধের কারণে খাগড়াছড়িতে পর্যটক উপস্থিতি কমে গিয়েছিল। ছুটিকে কেন্দ্র করে অবরোধ ও ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ায় পর্যটকরা আসতে শুরু করেছেন। আশা করছি, চলতি সপ্তাহের বাকি দিনগুলোতেও এই ধারা অব্যাহত থাকবে এবং কিছুদিন পর্যটক না থাকায় আমাদের যে ক্ষতি হয়েছিল, তা কিছুটা হলেও পুষিয়ে নিতে পারব।”
বাংলাদেশ ই-ট্যুরিজম-এর সদস্য ও স্থানীয় এফঅ্যান্ডএফ রেস্টুরেন্টের স্বত্বাধিকারী উজ্জ্বল দে জানান, “পাহাড়ের ট্যুরিজম খাতের জন্য পর্যটকদের সুরক্ষাই প্রধান অগ্রাধিকার। সাজেক বা সীমান্ত এলাকার কিছু বিধিনিষেধ ও ভ্রমণ সংক্রান্ত নির্দেশনা পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে সময়ে সময়ে সমন্বয় করা হয়। প্রশাসন দ্রুত নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ায় পূজার মৌসুমে পর্যটন খাত আবার ঘুরে দাঁড়াতে পেরেছে। আমাদের প্রত্যাশা, সামনের দিনগুলোতে খাগড়াছড়িতে পর্যটকদের আগমন আরও বৃদ্ধি পাবে এবং স্থানীয় ইকো-ট্যুরিজম অর্থনীতি নতুন গতি পাবে।”
খাগড়াছড়ির জেলা প্রশাসক মো. আনোয়ার সাদাত জানান, পূজার ছুটিতে জেলায় আগত দর্শনার্থীরা যেন নির্বিঘ্নে সময় কাটাতে পারেন, সেজন্য পর্যটন স্পটগুলোতে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। তাছাড়া যেকোনো ধরনের হয়রানি এড়াতে পুলিশের জরুরি সেবা চালু রাখা হয়েছে।