রাজধানীর ব্যস্ত নাগরিক জীবন থেকে মুক্তি পেতে খুব দূরে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। শহরের খুব কাছেই নদী, সবুজ আর খোলা আকাশের মেলবন্ধনে গড়ে উঠেছে এক প্রশান্তির নীড় ‘জল কাচারি-ধলেশ্বরী’। পূজার এই ছুটিতে পরিবার বা প্রিয়জনদের নিয়ে ঘুরে আসার জন্য এটি হতে পারে এক চমৎকার গন্তব্য।
মুক্তকণ্ঠের ‘নকশা’র একটি ফটোশুটের কাজে গত বর্ষায় কেরানীগঞ্জের এই জল কাচারি-ধলেশ্বরীতে যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল। শুরুতে ধারণা ছিল এটি হয়তো গতানুগতিক কোনো রিসোর্ট হবে। কিন্তু সেখানে পৌঁছেই দেখা গেল এক ভিন্ন দৃশ্য। রাজধানীর এত কাছাকাছি নদীর এত কাছাকাছি সময় কাটানোর সুযোগ যে মিলতে পারে, তা ছিল অভাবনীয়। এখানে একদম নদীর পাড় ঘেঁষেই সারা দিন বসে থাকা যায়। চাইলে কাঠের পাটাতনে পা দোলানো অথবা নৌকায় ঘুরে বেড়ানোর অভিজ্ঞতা নেওয়া সম্ভব।
কেরানীগঞ্জে ধলেশ্বরী নদীর তীরে গড়ে ওঠা এই কটেজটি শহরের কোলাহল এবং ঘনবসতি থেকে সম্পূর্ণ দূরে। নদী, সবুজ প্রকৃতি আর খোলা আকাশের এক অপূর্ব সংমিশ্রণে জায়গাটি হয়ে উঠেছে অবকাশ যাপনের আদর্শ স্থান। নদীর ওপর নির্মিত কাঠের ডেক বা পাটাতন থেকে ধলেশ্বরীর শান্ত ও স্নিগ্ধ সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়।
কাঠের পাটাতনের মাঝখানে টিনের ছাউনি দেওয়া বসার জায়গা রয়েছে। সেখানে বসে কিংবা শুয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা গল্প-আড্ডায় মেতে থাকা যায়। নদীর বয়ে চলা আর চারপাশের নিরিবিলি পরিবেশ মনকে প্রশান্তি দেয়। নদীর পাড় ঘেঁষে এই কটেজের দুই পাশে দুটি সানসেট রুম রয়েছে, যেখান থেকে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের মনোরম দৃশ্য দেখা যায়। এছাড়া দোলনায় দুলতে দুলতে প্রকৃতির সান্নিধ্যে কিছু মুহূর্ত কাটিয়ে দেওয়া যায়।
প্রকৃতির মাঝে প্রিয়জনদের সঙ্গে সময় কাটাতে সারা বছরই এখানে ভিড় করেন দর্শনার্থীরা। জল কাচারি-ধলেশ্বরীর প্রতিষ্ঠাতা ইমরুল খান জানান, করোনা মহামারির পর প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সংযোগের বিষয়টি তাঁকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে। তিনি আগে বিডি সাইক্লিস্টদের সঙ্গে এই এলাকায় সাইকেল চালাতে আসতেন এবং নদীর সৌন্দর্য উপভোগ করতে এখানে ক্যাম্পিংও করতেন।
২০২৩ সালের শেষ দিকে জায়গাটিকে সবার জন্য উপযোগী করে তোলার পরিকল্পনা করেন তিনি। এরপর ২০২৪ সালে শুরু হয় নির্মাণকাজ। আগে এখানে তাঁর পরিচিত একজনের একটি ছোট্ট কুঁড়েঘর ছিল। সেটি নষ্ট হয়ে যাওয়ার পর জায়গাটিকে নতুনভাবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেন ইমরুল খান।
শুরুতে কেবল ইমরুল খানের সাইক্লিস্ট বন্ধু এবং পরিচিতজনরা এখানে আসতেন। তবে গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হওয়ার পর সাধারণ দর্শনার্থীদের আগ্রহ বহুগুণ বেড়ে যায়। বর্তমানে বন্ধুদের আড্ডা, পারিবারিক পুনর্মিলনী কিংবা বিভিন্ন দলীয় আয়োজনের জন্য এই স্থানটি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।
ঢাকা থেকে কেরানীগঞ্জের জল কাচারি-ধলেশ্বরীর দূরত্ব মাত্র ১৫ কিলোমিটার। মোহাম্মদপুর বেড়িবাঁধ অথবা গাবতলী ও আমিনবাজার হয়ে ব্যক্তিগত গাড়ি বা অন্য যানবাহনে ২৫ মিনিটেই পৌঁছানো যায়। কলাতিয়া বাজারের দেড় কিলোমিটার পরে ঢালিকান্দি গুদারাঘাটের পাশেই অবস্থিত এই জল কাচারি। তবে সড়কের অবস্থা এবং যানজটের ওপর যাত্রার সময় কিছুটা কম-বেশি হতে পারে। ভ্রমণের আগে কর্তৃপক্ষের ফেসবুক পেজে দেওয়া নম্বরে যোগাযোগ করে বুকিং নিশ্চিত করে নেওয়া জরুরি।
এখানে দিনের পাশাপাশি রাতযাপনের ব্যবস্থাও রয়েছে। দিনের প্যাকেজ সাধারণত সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা ৩০ মিনিট বা ৬টা পর্যন্ত হয়ে থাকে। এই প্যাকেজে সকালের খাবার, নাশতা, দুপুরের খাবার ও বিকেলের নাশতার ব্যবস্থা থাকে এবং নৌকায় ঘোরার সুযোগ পাওয়া যায়। অন্যদিকে, রাতযাপনের প্যাকেজে নাশতা, রাতের খাবার ও পরদিন সকালের খাবার অন্তর্ভুক্ত থাকে।
শহরের ব্যস্ততা থেকে দূরে নদীর হাওয়া আর প্রকৃতির মায়ায় নিজেকে হারিয়ে দিতে পূজার এই ছুটিতে পরিবার নিয়ে ঘুরে আসতে পারেন ধলেশ্বরী নদীর পাড়ে অবস্থিত এই জল কাচারিতে। অল্প সময়ের ভ্রমণের জন্য এটি হতে পারে আপনার জন্য এক দারুণ গন্তব্য।