ফ্রান্সের সাম্প্রতিক বিক্ষোভ ও সামাজিক অস্থিরতা দমনে সম্পূর্ণ ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ। দেশটির সামগ্রিক পরিস্থিতি থেকে তিনি অনেকটা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন বলে মনে করা হচ্ছে। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং সরকারের রাজস্ব ঘাটতির মতো গুরুতর সমস্যাগুলোকে পুঁজি করে রাজনৈতিক সুবিধা নিতে এখন মাঠে নেমেছে মেরিন লো পেনের নেতৃত্বাধীন উগ্র ডানপন্থী দল। ২০ অক্টোবর নিউইয়র্ক টাইমসে এক নিবন্ধে এই পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করেছেন ক্যাটরিন বেনহোল্ড।

চলতি সপ্তাহান্তে ফ্রান্সের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়া অগ্নিগর্ভ বিক্ষোভের দৃশ্য ২০১৭ সালের স্মৃতি মনে করিয়ে দেয়। সেই বছর পরিবর্তন এবং নতুন প্রত্যাশার প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছিলেন এমানুয়েল মাখোঁ। তাঁর নির্বাচনী প্রচারণার মূল কথা ছিল ‘বিপ্লব’। কট্টর ডানপন্থীদের রাজনৈতিকভাবে কীভাবে পরাজিত করা যায়, সেই কৌশল নিয়ে নির্বাচনের আগেই তিনি ‘বিপ্লব’ নামে একটি বই প্রকাশ করেছিলেন।

ব্রেক্সিট এবং যুক্তরাষ্ট্রে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথমবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার এক বছরেরও কম সময়ের মধ্যে মাখোঁ মেরিন লো পেনকে পরাজিত করে ক্ষমতায় আসেন। লেখক ক্যাটরিন বেনহোল্ড জানান, তখন তিনি লন্ডনে কর্মরত ছিলেন এবং অনেক ফরাসি পরিবারকে দেখেছিলেন যারা মাখোঁর সেই ‘আন্দোলনের’ অংশ হতে স্বতঃস্ফূর্তভাবে দেশে ফিরে গিয়েছিল।

তবে প্রায় এক দশক পর দৃশ্যপট সম্পূর্ণ বদলে গেছে। আগামী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দৌড়ে মেরিন লো পেন এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছেন। মাখোঁ হয়তো একটি বিপ্লবের সাক্ষী হতে যাচ্ছেন, তবে সেটি তাঁর দেওয়া প্রতিশ্রুতির বিপ্লব নয়।

এমানুয়েল মাখোঁ যে সাধারণ মানুষের জীবন ও দেশের বাস্তব পরিস্থিতি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন, তার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছিল আগেই। চলতি মাসের শুরুতে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ কমানোর প্রতিবাদে যখন হাজার হাজার উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষার্থী রাজপথে নেমেছিল, তখন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট দেশটির ব্রিটানির উপকূলের কাছে একটি যুদ্ধজাহাজে সময় কাটাচ্ছিলেন।

২০১৭ সালের সেই আত্মবিশ্বাসী ও উদ্যমী মাখোঁর সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির পার্থক্য এখন প্রকট। মাত্র ৩৯ বছর বয়সে দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে, ফ্রান্সকে দীর্ঘদিনের স্থবির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কট্টর ডানপন্থীদের উত্থান এবং অকার্যকর সমাজব্যবস্থা থেকে মুক্ত করবেন।

ক্যাটরিন বেনহোল্ডের সহকর্মী মার্ক ল্যান্ডলার জানান, ওই সময়ে মাখোঁ ফ্রান্সের একটি পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিন থেকে নতুন ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের কার্যক্রম দেখছিলেন। ফলে দেশের মানুষকে আশ্বস্ত করার পুরো দায়িত্বটি পড়েছিল প্রধানমন্ত্রীর ওপর। প্রধানমন্ত্রী চেষ্টা করেছিলেন জনগণকে বোঝাতে যে, সরকার দেশের সংকট মোকাবিলায় তৎপর।

কিন্তু এরপর পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে যায়। অবশেষে গত রোববার মাখোঁ জনসমক্ষে এসে বক্তব্য প্রদান করেন। তবে ততক্ষণে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে এবং তা সহিংস দাঙ্গায় রূপ নেয়। শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষও এই বিক্ষোভে যোগ দেয়। বিক্ষোভকারীরা ব্যাপক হারে দোকানপাট ভাঙচুর ও লুটপাট করে, গাড়িতে আগুন দেয় এবং সরকারি স্থাপনা ধ্বংস করে। লিমোজ শহরের ঐতিহাসিক টাউন হলটি এই দাঙ্গায় পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যায়।

দাঙ্গার পূর্বাভাস দিতে সরকারের ব্যর্থতা এবং পরিস্থিতি সামাল দিতে তাদের ভূমিকা রাজনৈতিক মহলে তীব্র সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। সহিংসতা শুরু হওয়ার আগেই মাখোঁর প্রতি জনসমর্থন নেমে এসেছিল মাত্র ১৫ শতাংশে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।

২০১৭ সালে সাবেক বিনিয়োগ ব্যাংকার হিসেবে মধ্য-বামপন্থী সরকারের অর্থমন্ত্রী থেকে প্রেসিডেন্ট হয়ে ক্ষমতায় আসা মাখোঁ প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তিনি বাম ও ডান—উভয় রাজনৈতিক মেরুকরণের বাইরে থেকে বিভক্ত ফ্রান্সকে ঐক্যবদ্ধ করবেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল এমন এক রাষ্ট্র গঠন করা, যেখানে মানুষ আর কখনো কট্টরপন্থীদের ভোট দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করবে না। কিন্তু বর্তমানের শিক্ষার্থী ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর এই তীব্র বিক্ষোভ প্রমাণ করেছে যে, প্রায় এক দশকের শাসনামলে ফ্রান্সের মৌলিক সমস্যাগুলোর কোনো সমাধান হয়নি।

অর্থনৈতিক নীতিতে মাখোঁ ছিলেন একজন কট্টর মুক্তবাজারপন্থী। তাঁর বিশ্বাস ছিল, ব্যবসায়িক বিনিয়োগ সহজ ও সাশ্রয়ী করতে পারলে নতুন কর্মসংস্থান হবে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়বে, যা শেষ পর্যন্ত কট্টর ডানপন্থীদের প্রতি ভোটারদের আকর্ষণ কমিয়ে দেবে। গত ৯ বছরে তিনি করপোরেট কর ও আয়কর হ্রাস করেছেন এবং সম্পদের ওপর আরোপিত কর বাতিল করেছেন। তবে এসব পদক্ষেপের ফলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আশানুরূপভাবে বাড়েনি এবং ফ্রান্সের সরকারি ঋণের বোঝা কমেনি।

করছাড়ের কারণে প্রতিবছর সরকারের কোষাগারে কয়েক হাজার কোটি ইউরো রাজস্ব কম আসছে। আগে থেকেই ঋণের চাপে থাকা ফ্রান্সের জন্য এখন এই পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, আগামী বছর ফ্রান্সের করদাতাদের সরকারি ঋণের সুদ পরিশোধ করতেই প্রতিরক্ষা ও শিক্ষা খাতের চেয়ে বেশি অর্থ ব্যয় করতে হবে।

এই কাঠামোগত সংকট এবং সামাজিক অবিচারের ফলে দেশজুড়ে অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়েছে। যদিও এসব সমস্যার অনেকগুলোই মাখোঁর ক্ষমতায় আসার আগের, তবে কোভিড-১৯ মহামারির মতো অনিয়ন্ত্রিত ঘটনাগুলো সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে। ফলে চলতি সপ্তাহান্তের বিক্ষোভ গত কয়েক বছরের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ দাঙ্গায় পরিণত হয়।

ফ্রান্সের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে রাজপথে বিক্ষোভ নতুন কিছু নয়। তবে শনিবারের দাঙ্গা ছিল ভিন্ন প্রকৃতির। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং স্কুলগুলোর অব্যবস্থাপনার প্রতিবাদে পাঁচ লাখ মানুষ মিছিল করার পর তা সহিংসতায় রূপ নেয়। দাঙ্গাকারীরা প্রায় তিন হাজার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ক্ষতি করেছে এবং রাষ্ট্রের পরিচয় বহনকারী একাধিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

এই অস্থিতিশীলতার কারণে অনেক ভোটার এখন কট্টর ডানপন্থী মেরিন লো পেনের দিকে ঝুঁকতে পারেন, যা মাখোঁর রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় পরাজয় হতে পারে, কারণ তাঁর রাজনীতির শুরুই হয়েছিল লো পেনের উত্থান ঠেকানোর জন্য।

ইতিমধ্যেই লো পেনের দল ‘ন্যাশনাল র‍্যালি’ এই পরিস্থিতির রাজনৈতিক সুবিধা নিতে তৎপর হয়ে উঠেছে। মাখোঁ সরকার এবং কট্টর বামপন্থীরা যখন দাঙ্গার জন্য একে অপরকে দোষারোপ করতে ব্যস্ত, তখন লো পেনের শিবির সরাসরি নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করেছে। ন্যাশনাল র‍্যালির সভাপতি জর্ডান বারদেলা বলেন, “মানুষের এখন জেগে ওঠা দরকার। তাদের সঠিক রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আর দেশে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে আমরা প্রস্তুত।”

রোববার সন্ধ্যায় একটি ভিডিও বার্তায় মেরিন লো পেন ফ্রান্সকে একটি বিভক্ত দেশ হিসেবে উপস্থাপন করেন। ভিডিওতে তাঁকে একটি কাঠের টেবিলের পেছনে ফ্রান্সের পতাকার সামনে বসে থাকতে দেখা যায়। ক্যাটরিন বেনহোল্ডের এক সহকর্মীর মতে, দৃশ্যটি এমন ছিল যেন তিনি এখনই প্রেসিডেন্ট হতে চলেছেন।

একসময় মাখোঁর বয়স এবং তাঁর উদ্দীপনাময় বক্তব্যের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সঙ্গে তাঁর তুলনা করা হতো। ওবামার মতো আশার বার্তা দিয়ে রাজনীতিতে পরিবর্তন আনতে চেয়েছিলেন তিনি। তবে ওবামার মতোই অনেক ভোটার মাখোঁকেও একজন ‘অভিজাত শ্রেণির মানুষ’ হিসেবে দেখেন এবং তাঁর আচরণে সাধারণ মানুষের জীবন থেকে এক ধরণের দূরত্বের ছাপ খুঁজে পান।

এমানুয়েল মাখোঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকার এখন তাঁর প্রত্যাশার চেয়ে ভিন্ন দিকে মোড় নিচ্ছে। তাঁর বিদায়ের পর কে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট হবেন, তার ওপরই নির্ভর করবে ইতিহাসে মানুষ তাঁকে কীভাবে মনে রাখবে।