সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ নাগরিক অস্থিরতার মুখে পড়ে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁর ক্ষমতার শেষ সময়গুলো অত্যন্ত সংকটময় হয়ে উঠেছে। সামাজিক ক্ষোভ সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছেন তিনি। সাধারণ মানুষের দাবি মেটানোর জন্য সরকারের হাতে এখন ব্যয় করার মতো পর্যাপ্ত অর্থ নেই, রাজনৈতিক প্রভাবও তাঁর প্রায় নিঃশেষ হয়ে গেছে এবং জনশৃঙ্খলার ওপর তাঁর নিয়ন্ত্রণ ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে। সামগ্রিক এই পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে একজন রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে মাখোঁর অসহায়ত্ব এখন স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান।

গত শনিবার ফ্রান্সজুড়ে ছড়িয়ে পড়া ব্যাপক বিক্ষোভের এক পর্যায়ে দোকানপাটে লুটপাট, বিভিন্ন ভবনে অগ্নিসংযোগ এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানে ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। ক্ষমতার মেয়াদের শেষ প্রান্তে এসে এই সহিংসতা মাখোঁর সামনে সম্ভবত সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ, দেশটির নাগরিকরা সরকারের কাছ থেকে আরও বেশি সুযোগ-সুবিধা প্রত্যাশা করছেন, কিন্তু সেই চাহিদা পূরণের মতো আর্থিক সামর্থ্য বর্তমানে মাখোঁ সরকারের নেই।

প্রায় এক দশক আগে ক্ষমতায় আসার পর মাখোঁ প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে, তিনি ফ্রান্সের স্থবির রাজনৈতিক ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনবেন, অর্থনৈতিক সংস্কারের গতি ত্বরান্বিত করবেন এবং আরও দৃঢ় নেতৃত্বের মাধ্যমে রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠা করবেন।

২০১৮-১৯ সালের ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলনের সময় জনরোষ প্রশমিত করতে মাখোঁ করছাড় ও ভর্তুকিসহ শতকোটি ইউরোর আর্থিক ছাড় দিয়েছিলেন। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই সুযোগ খুবই সীমিত। ফ্রান্সের সরকারি অর্থব্যবস্থার ওপর তীব্র চাপ এবং বিভক্ত পার্লামেন্টের কারণে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার মতো কার্যকর উপায় মাখোঁর হাতে খুব কমই রয়েছে। উল্লেখ্য, বর্তমানে ফ্রান্সে ‘বিভক্ত পার্লামেন্ট’ তৈরি হওয়ার মূল কারণ হলো ২০২৪ সালের আগাম নির্বাচনে কোনো একক দল বা জোট সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় আসন সংখ্যা পেতে ব্যর্থ হওয়া। বর্তমানে পার্লামেন্ট প্রধানত তিনটি প্রতিদ্বন্দ্বী ও চরম বিপরীতমুখী ব্লকে বিভক্ত হয়ে পড়েছে।

প্রেসিডেন্ট হিসেবে তাঁর ক্ষমতার মেয়াদ শেষ হতে এখনো ছয় মাস বাকি থাকলেও, কার্যত তিনি এখন একজন ক্ষমতাহীন প্রেসিডেন্টে পরিণত হয়েছেন। মাখোঁর নেতৃত্বে ফ্রান্স এখন রাজনৈতিক অচলাবস্থায় আটকে আছে এবং তীব্র আর্থিক চাপের মুখে পড়েছে। এমন এক অস্থিরতা তৈরি হয়েছে যা রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের সীমাবদ্ধতাকেও সামনে নিয়ে এসেছে।

২০২৪ সালে পার্লামেন্ট ভেঙে দেওয়ার যে সিদ্ধান্ত প্রেসিডেন্ট নিয়েছিলেন, সমালোচকদের মতে তা ছিল অযৌক্তিক এবং এর ফলে দেশ অচল হয়ে পড়েছে। পঞ্চম প্রজাতন্ত্রের (ফ্রান্সের বর্তমান সংবিধান ও সেই সংবিধানের অধীনে পরিচালিত রাজনৈতিক ব্যবস্থা) ইতিহাসে এটিই সম্ভবত সবচেয়ে খারাপ সিদ্ধান্ত হিসেবে চিহ্নিত হবে। মাখোঁর সাবেক মিত্ররাও এখন প্রকাশ্যে তাঁর কঠোর সমালোচনা করছেন। তাঁদের মতে, দেশের বর্তমান অচলাবস্থার মূল কারণ হলো ২০২৪ সালে মাখোঁর আগাম পার্লামেন্ট নির্বাচন দেওয়ার সিদ্ধান্ত, যা তাঁর নিজস্ব কর্তৃত্বকে দুর্বল করে দিয়েছে।

মাখোঁর শিবিরের সাবেক আইনপ্রণেতা লোয়িক কেরভ্রাঁ সামাজিকমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, ‘এই মেয়াদের শেষটা যেন ধীরে ধীরে চলা এক যন্ত্রণা, যা মাখোঁর রাজনৈতিক অসহায়ত্ব ও ক্ষমতার ধীর পতনকে স্পষ্ট করে তুলছে। ২০২৪ সালে পার্লামেন্ট ভেঙে দেওয়ার যে অযৌক্তিক সিদ্ধান্ত প্রেসিডেন্ট নিয়েছিলেন, তাতে দেশ অচল হয়ে পড়েছে। পঞ্চম প্রজাতন্ত্রের (ফ্রান্সের বর্তমান সংবিধান ও সেই সংবিধানের অধীনে পরিচালিত রাজনৈতিক ব্যবস্থা) ইতিহাসে এটিই সম্ভবত সবচেয়ে খারাপ সিদ্ধান্ত।’

প্রেসিডেন্ট মাখোঁর এই চরম দুরবস্থা ফ্রান্সের আরেক রাজনীতিকের জন্য রাজনৈতিক সৌভাগ্য হয়ে উঠতে পারে। তিনি হলেন কট্টর ডানপন্থী দল ন্যাশনাল র‍্যালির নেত্রী মেরিন লো পেন। ২০২৭ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অংশ নেওয়া প্রার্থীদের মধ্যে জনমত জরিপে এখন তিনিই সবচেয়ে এগিয়ে আছেন। ফ্রান্সে চলমান এই অস্থিরতা লো পেনের জন্য ব্যাপক রাজনৈতিক সুবিধা বয়ে আনতে পারে। জীবনযাত্রার মানের অবনতি নিয়ে মানুষের তীব্র ক্ষোভ এবং সপ্তাহান্তের সহিংসতার পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে তৈরি হওয়া উদ্বেগ—এই দুই দিক থেকেই লো পেন লাভবান হতে পারেন।

মাখোঁর দলের সাবেক আইনপ্রণেতা জ্যঁ-বাতিস্ত মোরো রয়টার্সকে বলেন, ‘লো পেনের এখন নির্বাচনী প্রচারে আর কোনো অর্থ খরচ করারও প্রয়োজন নেই। তাঁর সামনে পথ শুধু পরিষ্কারই হয়ে যায়নি; বরং ছয় লেনের মহাসড়ক তৈরি হয়ে গেছে।’

গত রোববার এক ভিডিও বার্তায় জাতির উদ্দেশে বক্তব্য দেন লো পেন। সেখানে তিনি মাখোঁর সরকারকে ভেঙে পড়তে থাকা এক ক্ষমতা হিসেবে তুলে ধরেন এবং নিজেকে এমন একজন নেতা হিসেবে উপস্থাপন করেন, যিনি দেশে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হবেন।