জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে ফ্রান্সজুড়ে চলমান বিক্ষোভে যে ‘লাগামহীন’ সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েছে, তার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ। রাজধানী প্যারিসে বিক্ষোভকারী ও লুটপাটকারীদের সঙ্গে পুলিশের নতুন করে সংঘর্ষের পর গতকাল রোববার এই প্রতিক্রিয়া জানান তিনি।
ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়েছে, শনিবারের সহিংস ঘটনার প্রেক্ষিতে প্রায় ২ হাজার ৪০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ফ্রান্সের শহরাঞ্চলে ঘটে যাওয়া সবচেয়ে ভয়াবহ সহিংসতাগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম। এই অস্থিরতায় প্রায় এক হাজার পুলিশ ও জেন্ডারমেরি (ফ্রান্সের সামরিক কাঠামোর অধীন একটি সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী) সদস্য আহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে সাতজনের অবস্থা অত্যন্ত গুরুতর বলে জানা গেছে।
রোববার জাতির উদ্দেশে দেওয়া এক ভাষণে প্রেসিডেন্ট মাখোঁ বলেন, প্রয়োজন হলে আগামী কয়েক দিনে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ নির্দিষ্ট কিছু সমাবেশ নিষিদ্ধ করতে পারবে। তবে তিনি জরুরি অবস্থা জারি বা কারফিউ দেওয়ার মতো কঠোর পদক্ষেপের ঘোষণা দেননি। বিক্ষোভের ফলে সৃষ্ট ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের বিষয়ে তিনি গভীর শোক প্রকাশ করে বলেন, ‘আজ রাতে আমরা সবাই ক্ষোভ ও লজ্জা অনুভব করছি।’
শনিবারের বিক্ষোভে একাধিক টাউন হলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয় এবং শত শত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে লুটপাট ও ভাঙচুর চালানো হয়। এই পরিস্থিতির ভয়াবহতা নিয়ে মাখোঁ বলেন, ‘এই ছবিগুলো দেখে আমরা সবাই নিজেদের প্রশ্ন করেছি, তাদের মনে কী চলছে? ফরাসিরা ফ্রান্সের সঙ্গে এমন করতে পারে কীভাবে?’
প্রেসিডেন্ট মাখোঁ জোর দিয়ে উল্লেখ করেন যে, যেসব বিক্ষোভকারীর দাবি যৌক্তিক, তাঁদের সঙ্গে ধ্বংসযজ্ঞ, ভাঙচুর ও লুটপাটে জড়িত ব্যক্তিদের আলাদা করে চিহ্নিত করতে হবে। তিনি আরও বলেন, চরম বামপন্থী প্রান্তিক গোষ্ঠীর উসকানিদাতাদের বিরুদ্ধে কর্তৃপক্ষ কোনো ধরনের ছাড় দেবে না। তাঁর মতে, এই উসকানিদাতাদের সঙ্গে বিপুলসংখ্যক অপরাধী যোগ দিয়েছে এবং এই চক্রই ফ্রান্সের শহরগুলোতে লাগামহীন সহিংসতা ছড়িয়েছে।
দেশটিতে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হতে আর মাত্র কয়েক মাস বাকি এমন সময়ে এই অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়েছে। মধ্যপন্থী মাখোঁ আর নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবেন না। অন্যদিকে, কট্টর ডানপন্থী ন্যাশনাল র্যালি পার্টির প্রেসিডেন্ট প্রার্থী মেরিন লো পেন জনমত জরিপে এগিয়ে রয়েছেন। এই পরিস্থিতি নিয়ে লো পেন মন্তব্য করে বলেন, এই অস্থিরতা দেখিয়ে দিয়েছে, মাখোঁর সরকারের জ্বালানি ফুরিয়ে এসেছে। সরকার ক্লান্ত ও দিশেহারা হয়ে পড়েছে।
এদিকে রোববার প্যারিসের একটি চত্বরে জড়ো হওয়া কয়েক শ মানুষের ওপর পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও স্টান গ্রেনেড ছোড়ে বলে এএফপির সাংবাদিকেরা জানিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আহ্বানের পর সেখানে লোকজন জড়ো হলেও কর্তৃপক্ষ জানায়, সমাবেশটির কোনো অনুমোদন ছিল না। কর্তৃপক্ষের দাবি, বিক্ষোভকারীরা পুলিশের দিকে বোতল ও পাথর ছুড়েছে, যার ফলে প্যারিসজুড়ে ১০৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। রিপাবলিক চত্বরের আশপাশে অন্তত পাঁচটি দোকানে লুটপাট চালানো হয় এবং কেন্দ্রীয় এলাকার বেশ কিছু দোকানের কাচ ভাঙচুর করা হয়। নগর কর্তৃপক্ষ অনেক দোকান বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছে।
দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় শহর লিয়ঁতে একটি বিলাসবহুল পোশাকের দোকানে লুটপাটের চেষ্টা করা তরুণদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। ফ্রান্সের টাউন হলগুলোতে আগুন এবং দোকানে লুটপাটের ছবি বিশ্বজুড়ে সংবাদমাধ্যমের শিরোনাম হয়েছে। এই বিতর্কে যোগ দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি এই অস্থিরতার জন্য অভিবাসনকে দায়ী করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক পোস্টে বলেন, ‘ফ্রান্স জ্বলছে। সম্পূর্ণ ভিন্ন এক জগৎ থেকে আসা, হৃদয়ে ঘৃণা পোষণ করা অভিবাসীরা একসময়কার মহান দেশটিকে ধ্বংস করে দিয়েছে।’
নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে মাখোঁ বলেছেন, ‘শীর্ষ কর্মকর্তারা আমাদের শহর, সরকারি ভবন ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো সুরক্ষিত রাখতে মেয়রদের সঙ্গে সমন্বয় করে সিদ্ধান্ত নেবেন।’ তিনি ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে সহায়তা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন এবং বিক্ষোভ মোকাবিলায় নিরাপত্তা বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে ‘পূর্ণ স্বচ্ছতা’ নিশ্চিত করার কথা বলেছেন।
শনিবারের বিক্ষোভের পর পুড়ে যাওয়া সড়ক-ব্যারিকেডের পাশে দাঁড়িয়ে প্যারিসের ৭৮ বছর বয়সী বাসিন্দা মেহমেত ওজেদেন এএফপিকে বলেন, ‘মনে হচ্ছে, যেন আমরা যুদ্ধের মধ্য দিয়ে গেছি।’
লিমোজ শহরের পুরানো টাউন হলটি আগুনে পুড়ে গেছে, যা স্থানীয় প্রশাসনের মতে উচ্ছৃঙ্খল জনতার দ্বারা ইচ্ছাকৃতভাবে করা হয়েছে। লিয়ঁ শহরের কেন্দ্রে বিক্ষোভ চলাকালে একটি পর্যটন তথ্যকেন্দ্রে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয় এবং সেখানে একাধিক সংঘর্ষ ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। এছাড়া ফ্রান্সের শহর সাঁ-এতিয়েনে ভিড় নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত একটি গ্রেনেডের বিস্ফোরণে ১৭ বছর বয়সী এক কিশোরের ডান হাত উড়ে গেছে। মুলুজ শহরে ১৭ বছর বয়সী এক কিশোরী একটি চোখ হারিয়েছে বলে জানিয়েছেন কৌঁসুলিরা।