২০০৬ সালের সেই বিপর্যয়কর মধ্যবর্তী নির্বাচনের মাত্র কয়েক মাস আগে প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ তাঁর প্রেস সচিব স্কট ম্যাকক্লেলানকে বরখাস্ত করেছিলেন। একই সময়ে তিনি সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি পদের জন্য মনোনীত তাঁর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সহযোগী হ্যারিয়েট মায়ার্সের মনোনয়নও প্রত্যাহার করে নেন।
তবে কংগ্রেসের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে তিনি প্রতিরক্ষামন্ত্রী ডোনাল্ড রামসফেল্ডকে সরিয়েছিলেন না। রিপাবলিকানরা কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারানোর পর তিনি রামসফেল্ডকে বরখাস্ত করেন। সে সময় ইরাক যুদ্ধ ক্রমেই অজনপ্রিয় হয়ে উঠছিল এবং সেই যুদ্ধের মূল নেতৃত্বে ছিলেন রামসফেল্ড।
সম্প্রতি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র কেটি জাকারিয়াকে আকস্মিকভাবে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দিয়েছেন। এই পদে তিনি মাত্র পাঁচ দিন দায়িত্ব পালন করেছিলেন। জাকারিয়াকে বরখাস্ত করার পাশাপাশি তাঁর সময়ে আলোচিত আরেকটি খবর ছিল গ্রিসে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূতের পদ থেকে কিম্বার্লি গিলফয়েলকে সরিয়ে দেওয়া।
এদিকে রাজনৈতিক মহলে গুঞ্জন ছড়িয়েছে যে, ‘যুদ্ধমন্ত্রী’ পিট হেগসেথকেও দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হতে পারে। বিশেষ করে ফোর্ট হুড সামরিক ঘাঁটিতে ২০০৯ সালে ১৩ জনকে গুলি করে হত্যাকারী সন্ত্রাসী নিদাল হাসানের মৃত্যুদণ্ড সরাসরি সম্প্রচারের পরিকল্পনা ট্রাম্প প্রত্যাখ্যান করার পর এই গুঞ্জন আরও জোরালো হয়েছে।
অবশ্য ট্রাম্প ও বুশের প্রেসিডেন্সির মধ্যে কিছু মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। ম্যাকক্লেলান পাঁচ দিন নয়, বরং তিন বছর প্রেস সচিবের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। এছাড়া হ্যারিয়েট মায়ার্সের মনোনয়ন প্রত্যাহারের পেছনে কোনো ব্যক্তিগত কেলেঙ্কারি ছিল না; বরং সংবাদমাধ্যম ও সিনেট তাঁর যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল। পাশাপাশি, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ এখনো ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসনের মতো রক্তক্ষয়ী বা ব্যয়বহুল হয়ে ওঠেনি। তবে যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো প্রেসিডেন্টের দ্বিতীয় মেয়াদের শেষার্ধে রাজনৈতিক পরিস্থিতি অস্থির হয়ে উঠতে পারে, তা ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত।
রোনাল্ড রিগ্যানের দ্বিতীয় মেয়াদে তাঁর প্রেস টিমকে ইরান-কন্ট্রা কেলেঙ্কারের ভয়াবহ পরিণতি সামলাতে হয়েছিল। বিল ক্লিনটনের দ্বিতীয় মেয়াদে মনিকা লিউনস্কি কেলেঙ্কারি সংবাদমাধ্যমের প্রধান আলোচ্য বিষয় হয়ে ওঠে। রিচার্ড নিক্সনকে দ্বিতীয় মেয়াদে অভিশংসনের মুখোমুখি হতে হয়েছিল। এমনকি বারাক ওবামাকেও তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদজুড়ে লিবিয়ার বেনগাজিতে যুক্তরাষ্ট্রের কনস্যুলেটে হামলার ঘটনায় সৃষ্ট বিতর্ক সামলাতে হয়েছে, যে ঘটনায় তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটনও বিতর্কে জড়িয়ে পড়েছিলেন।
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চলমান যুদ্ধ এবং জ্বালানির উচ্চমূল্যের কারণে ট্রাম্প প্রশাসন যে কিছু সমস্যার মুখে পড়েছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু একজন প্রেস সচিবকে বরখাস্ত করাকে প্রশাসনের গুরুতর সংকটের প্রমাণ হিসেবে দেখা ঠিক হবে না।
কেটি জাকারিিয়া কীভাবে এই গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ পেয়েছিলেন, তা এখনো স্পষ্ট নয়। ট্রাম্পের পুনর্নির্বাচনী প্রচারে তিনি কাজ করেননি। অতীতে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে উপস্থিত হলেও তিনি পেশাদার সাংবাদিক নন। ক্রিস্টি নোয়েম যখন যুক্তরাষ্ট্রের স্বরাষ্ট্রনিরাপত্তাবিষয়ক মন্ত্রী ছিলেন, তখন জাকারিয়া অল্প সময়ের জন্য ওই বিভাগের গণমাধ্যম শাখায় কাজ করেছিলেন। কিন্তু নোয়েমের স্বল্পস্থায়ী দায়িত্বকাল বিভিন্ন বিতর্কে জর্জরিত ছিল এবং শেষ পর্যন্ত চলতি বছরের মার্চে তাঁকেও বরখাস্ত করা হয়। ফলে সেই অভিজ্ঞতাকে জাকারিয়ার জন্য ইতিবাচক বলা কঠিন।
ট্রাম্প সম্ভবত বুঝতে পেরেছিলেন যে, জাকারিয়াকে নিয়ে সমস্যা তৈরি হয়েছে। তাই ক্ষতি আরও বাড়ার আগেই তিনি দ্রুত তাঁকে সরিয়ে দিয়েছেন। এতে বোঝা যায়, পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ এখনো তাঁর হাতেই রয়েছে। সংবাদমাধ্যমের শিরোনামে যেমন বলা হচ্ছে যে তাঁর প্রশাসন ভেঙে পড়ছে বা চরম অস্থিরতার মধ্যে রয়েছে, বাস্তবতা তেমন নয়।
অতীতে সব প্রেসিডেন্ট অবশ্য এত দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারেননি। উদাহরণ হিসেবে জো বাইডেনের কথা বলা যায়। তাঁর শেষ প্রেস সচিব কারিন জ্যঁ-পিয়েরকে আরও আগেই সরানো উচিত ছিল। তিনি জাকারিয়ার মতোই অযোগ্য ছিলেন, কিন্তু বাইডেন তাঁকে তিন বছর দায়িত্বে রেখেছিলেন। এই সময়কাল বুশের প্রেস সচিব ম্যাকক্লেলানের দায়িত্ব পালনের সময়ের প্রায় সমান।
এই দুঃখজনক ঘটনা থেকে ট্রাম্প ও তাঁর দলের শিক্ষা নেওয়া উচিত। অযোগ্য ব্যক্তিকে নিয়োগ দিয়ে তাঁকে সংবাদমাধ্যমের সামনে তুলে ধরা এবং পরে সমালোচনার মুখে বরখাস্ত করা হোয়াইট হাউসের জন্য সুখকর নয়। দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে জাকারিয়াকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য ট্রাম্প প্রশংসা পেতে পারেন, কারণ এতে তিনি আরও বড় বিব্রতকর পরিস্থিতি এড়িয়েছেন।
তবে প্রেসিডেন্টের সবচেয়ে জরুরি কাজ হলো, শুরুতেই যোগ্য ব্যক্তিদের নিয়োগ নিশ্চিত করা। সে জন্য নিয়োগপ্রক্রিয়ায় আরও কার্যকর ব্যবস্থা প্রয়োজন। পরবর্তীবার অন্তত চিফ অব স্টাফের সঙ্গে পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত নিলে ভালো হয়।
জন ফিহেরি ইএফবি অ্যাডভোকেসি নামের একটি বিশেষায়িত লবিং ও কৌশলগত প্রচারপ্রতিষ্ঠানের অংশীদার।
আল–জাজিরা থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে অনূদিত।