অস্ট্রেলিয়ার ভিক্টোরিয়া রাজ্যের ওয়াঙ্গারাতায় এক ভয়াবহ ঘটনায় ফেডারেল পার্লামেন্টের স্বতন্ত্র সদস্য হেলেন হেইন্সকে (৬৫) লক্ষ্য করে গাড়িচাপা দিয়ে হত্যাচেষ্টা চালানো হয়েছে। গতকাল সোমবার তাঁর নিজ কার্যালয়ের সামনে এই নৃশংস হামলাটি সংঘটিত হয়। এই প্রাণঘাতী হামলায় নারী রাজনীতিকের একটি পা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। বর্তমানে মেলবোর্নের আলফ্রেড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন হেলেন হেইন্সের অন্য পাটি বাঁচানোর আপ্রাণ চেষ্টা করছেন চিকিৎসকেরা। তাঁর শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক বলে জানা গেছে। ঘটনার পরপরই ঘটনাস্থল থেকে হামলার অভিযোগে সন্দেহভাজন ৪৩ বছর বয়সী ব্রেন্ডন নিউজান্টকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
পুলিশ ও উদ্ধারকারী সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, ইন্ডাই নির্বাচনী এলাকার এমপি হেলেন হেইন্স যখন তাঁর গাড়ির পেছনের অংশে রাখা কিছু মালপত্র তুলছিলেন, ঠিক সেই মুহূর্তেই একটি ল্যান্ড ক্রুজার ফোর-হুইল গাড়ি দিয়ে তাঁকে লক্ষ্য করে একাধিকবার ধাক্কা দেওয়া হয় এবং চাপা দেওয়া হয়। গাড়ির নিচে আটকা পড়ার ফলে তাঁর একটি পা ঘটনাস্থলেই প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। জানা গেছে, হামলার সময় আক্রমণকারীর কাছে একটি ধারালো অস্ত্রও ছিল।
ঘটনাটি প্রত্যক্ষ করে দ্রুত এগিয়ে আসেন পাশের সেলুনকর্মী রিকি জেফরিস এবং একটি দোকানের কর্মী কোডি লাপোইদেভিন। তাঁরা অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে হামলাকারীর পকেট থেকে ছুরিটি ফেলে দিয়ে পুলিশ না আসা পর্যন্ত তাঁকে মাটিতে চেপে ধরে রাখেন। এরপর জরুরি সেবা দলের দ্রুত তৎপরতায় রক্তাক্ত অবস্থায় এমপি হেলেনকে উদ্ধার করে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সের মাধ্যমে মেলবোর্নে স্থানান্তর করা হয়।
অস্ট্রেলিয়ার স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গ্রেপ্তারকৃত ব্রেন্ডন নিউজান্টের পরিবারের সাথে হেলেন হেইন্সের দীর্ঘ ২০ বছরেরও বেশি সময়ের ঘনিষ্ঠ সখ্যতা ছিল। এই মর্মান্তিক ঘটনায় হামলাকারীর বাবা রড নিউজান্ট তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেন, “কয়েক মাস ধরে ব্রেন্ডনের আচরণে অসংলগ্নতা দেখা যাচ্ছিল।” তাঁর পরিবার এই ঘটনাটিকে অত্যন্ত বেদনাদায়ক হিসেবে উল্লেখ করে পুলিশের তদন্ত প্রক্রিয়ায় পূর্ণ সহযোগিতার কথা জানিয়েছে।
এই নৃশংস ঘটনায় গভীর শোক ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি অ্যালবানিজ। তিনি জানান, চিকিৎসাধীন এমপির স্বামী ফিলের সঙ্গে তিনি কথা বলেছেন এবং সবার প্রার্থনা হেলেনের সঙ্গে রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী আরও জানান, ভিক্টোরিয়া পুলিশ, অস্ট্রেলিয়ান ফেডারেল পুলিশ এবং গোয়েন্দা সংস্থা এএসআইও-এর সমন্বয়ে একটি যৌথ সন্ত্রাসবিরোধী টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে, যারা ঘটনার বিস্তারিত তদন্ত করছে। তবে এই পর্যায়ে হামলার প্রকৃত উদ্দেশ্য এখনো স্পষ্ট হয়ে ওঠেনি।
অস্ট্রেলিয়ার ইতিহাসে জনপ্রতিনিধিদের ওপর এমন প্রত্যক্ষ ও প্রাণঘাতী হামলা কার্যত নজিরবিহীন। সব রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরাই এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন এবং রাজনৈতিক অঙ্গনে সহিংসতা ও নারী জনপ্রতিনিধিদের ওপর ক্রমবর্ধমান হুমকির বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। দেশটির কেন্দ্রীয় পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে রাজনীতিকদের ওপর হুমকি ও হামলার ঘটনা ১ হাজার ছাড়িয়েছে।
এই ঘটনায় চরম নিরাপত্তাহীনতা ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে অস্ট্রেলিয়াপ্রবাসী বাংলাদেশিদের মাঝেও। মেলবোর্নপ্রবাসী প্রকৌশলী এবং অর্ডার অব অস্ট্রেলিয়া মেডেলপ্রাপ্ত কামরুজ্জামান বালার্ক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “অস্ট্রেলিয়ার মতো নিরাপদ ও গণতান্ত্রিক দেশে একজন নারী এমপির ওপর এমন হামলা পুরো সমাজকে নাড়িয়ে দিয়েছে। এটা আমাদের মতো সাধারণ অভিবাসীদের প্রতিদিনের নিরাপত্তাবোধের জন্য চরম অশনিসংকেত।”
অস্ট্রেলিয়ার ফেডারেল পুলিশ জানিয়েছে, যদিও ঘটনাটিকে একটি বিচ্ছিন্ন আক্রমণ হিসেবে দেখা হচ্ছে, তবুও আইনপ্রণেতাদের নিরাপত্তা প্রটোকল দ্রুত ঢেলে সাজানো হচ্ছে। হামলাকারীর বিরুদ্ধে মামলা দায়েরসহ স্থানীয় ও ফেডারেল আইনের আওতায় কঠোরতম আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে।