হিন্দু নারীদের প্রতি প্রচলিত নানা কুসংস্কার ও সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই করে নিজেদের সংগঠিত করেছেন একদল নারী। এই বৈষম্য থেকে মুক্তির লক্ষ্যে তারা গড়ে তুলেছেন ‘উজ্জয়িনী’ নামের একটি সংগঠন। আর এই সংগঠনের বিশেষ উদ্যোগে গত ১১ বছর ধরে উদযাপিত হয়ে আসছে ‘দুর্গতিনাশিনী দেবী’ দুর্গার পূজা।
টাঙ্গাইলের কালিহাতী উপজেলার দশকিয়া ইউনিয়নের মগড়া গ্রামে অবস্থিত এই দুর্গাপূজামণ্ডপটি তার ব্যতিক্রমী আয়োজনের জন্য পরিচিত। এই মণ্ডপের যাবতীয় ব্যবস্থাপনা, যেমন—চাঁদা সংগ্রহ, বাজারঘাট দেখাশোনা এবং এমনকি ঢাক বাজানোর মতো কাজগুলোও সম্পূর্ণভাবে নারীদের মাধ্যমেই সম্পন্ন করা হয়।
বাংলাদেশ পূজা উদ্যাপন পরিষদ কালিহাতী উপজেলা শাখার জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি কাশীনাথ মজুমদার জানান, টাঙ্গাইল জেলায় এবার মোট ১ হাজার ৩৫৭টি দুর্গাপূজার মণ্ডপ স্থাপন করা হয়েছে। তবে কালিহাতীর মগড়া গ্রামে নারীদের দ্বারা পরিচালিত এই আয়োজনটি অত্যন্ত ব্যতিক্রমী। নারীদের এই অনন্য উদ্যোগের স্বীকৃতিস্বরূপ ইতিপূর্বে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে পূজা কমিটিকে পুরস্কৃত করা হয়েছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, এটিই জেলার একমাত্র মণ্ডপ যেখানে পূজার যাবতীয় আয়োজন করেন নারীরা।
নারীদের উদ্যোগে এই পূজার সূচনা কীভাবে হয়েছিল, সে বিষয়ে পূজা কমিটির সাধারণ সম্পাদক সীমা কর্মকার (৪২) বলেন, ‘এ গ্রামের হিন্দু মেয়েদের সমাজে, এমনকি পরিবারেও বৈষম্যের শিকার হতে হতো। ঘোমটা ছাড়া ঘরের বাইরে বের হলে কথা শুনতে হতো। পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করলেও ছেলে–মেয়ে একসঙ্গে পড়ে, এমন প্রতিষ্ঠানে উচ্চশিক্ষার জন্য ভর্তি হতে বাধা দিত, স্বামীর চেয়ে বেশি লেখাপড়া করা যাবে না, এমন নানা বিধিনিষেধ ছিল।’
তিনি আরও স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘২০০২ সালে সম্মান শ্রেণিতে ভর্তির সময় আমাকেও নানা সমস্যায় পড়তে হয়। তখন মনে মনে চিন্তা করি, এর প্রতিবাদ করতে হবে। নারীদের সংগঠিত করতে হবে। আমাদের গ্রামেই বিয়ে হয়ে আসে এক বধূ। ওনার নামও সীমা কর্মকার (এই সীমা আমার চেয়ে ছয় বছরের বড়)। আমরা নারীদের মুক্তির জন্য ওনার সঙ্গে আলাপ আলোচনা করতাম। একসময় আমরা দুজন (দুই সীমা কর্মকার) এবং শিপ্রা পাল ও বুলবুলি কর্মকার চারজন মিলে ওই বছরই গঠন করি ‘উজ্জয়িনী’ সংগঠন। পরে একে একে আরও নারী, বিশেষ করে শিক্ষার্থীরা যুক্ত হতে থাকে আমাদের সঙ্গে। পরে আমরা সিদ্ধান্ত নেই ‘দুর্গতিনাশিনী দেবী’ দুর্গার পূজা করব আমরা নিজেরাই। সব জায়গায় পুরুষেরা আয়োজনে মুখ্য ভূমিকায় থাকে। পুরুষেরা পারলে আমরা পারব না কেন। ২০১৬ সালে আমরা প্রথম দুর্গাপূজা শুরু করি। সফলভাবে পূজা সম্পন্ন করার পর আমাদের আত্মবিশ্বাস বেড়ে যায়। তারপর থেকে ধারাবাহিকভাবে প্রতিবছর আমরা দুর্গাপূজার আয়োজন করছি। এবার ১১তম দুর্গাপূজা হচ্ছে।’
উল্লেখ্য, টাঙ্গাইল জেলার ১ হাজার ৩৫৭টি মণ্ডপের মধ্যে মগড়া গ্রামের এই আয়োজনটিই একমাত্র নারী-চালিত মণ্ডপ।
গত সোমবার দুপুরে মগড়া গ্রামের কর্মকার পাড়ায় গিয়ে দেখা যায়, উজ্জয়িনী সংগঠনের উদ্যোগে একটি অস্থায়ী মণ্ডপ তৈরি করা হয়েছে। অষ্টমী পূজার পুষ্পাঞ্জলি শেষে নারীরা মন্দির প্রাঙ্গণেই অবস্থান করছেন এবং দর্শনার্থীরা ভিড় করছেন দেবী দুর্গাকে দর্শন করতে। সেখানে এক নারীকে ঢাক বাজাতে দেখা যায়।
টাঙ্গাইল থেকে পূজা দেখতে আসা সুব্রত কুমার তালুকদার বলেন, ‘অনেক পূজামণ্ডপ দেখেছি। শুধু নারীদের উদ্যোগে দুর্গাপূজা এই প্রথম দেখলাম। ভালো লাগল, নারীদের পূজার আয়োজন দেখে।’
মগড়া গ্রামের তুষার কর্মকার মনে করেন, এই গ্রামের নারীদের দুর্গাপূজার আয়োজনটি একটি অত্যন্ত প্রশংসনীয় উদ্যোগ। এর মাধ্যমে কেবল ধর্মীয় আচার পালিত হচ্ছে না, বরং নারীদের ক্ষমতায়ন ও সক্ষমতার বিষয়টিও স্পষ্টভাবে ফুটে উঠছে।
পূজা কমিটির সভাপতি সীমা কর্মকার (৪৮) জানান, ‘পূজার সব কাজ আমরা নারীরাই করি, শুধু পুরুষ পুরোহিত পূজা করেন। আমাদের সদস্যরা সবাই পূজার জন্য চাঁদা দিই। শুরুতে অনেকেই আমাদের এই আয়োজনকে ভালো চোখে দেখত না। এখন সবাই সহযোগিতা করেন।’
এদিকে, বাংলাদেশ মহিলা ক্রীড়া সংস্থার সভানেত্রী সারওয়াত সিরাজ শুক্লা এবারের পূজায় উজ্জয়িনীর সকল সদস্যকে শাড়ি উপহার দিয়েছেন।