এখানে যে যোগাযোগমন্ত্রীর গল্প বলা হচ্ছে তিনি আওয়ামী লীগ, বিএনপি বা এরশাদ আমলের মন্ত্রী নন। অন্য কোনো আমলের। তবে আনন্দের বিষয় সব আমলের জিনিস একই।—লেখক

দুপুরের অল্প কিছু সময় ঘুমানোর এক অদ্ভুত অভ্যাস রয়েছে যোগাযোগমন্ত্রী সালাহউদ্দিন খান ভুলু সাহেবের। মন্ত্রীর অত্যন্ত কঠিন দায়িত্ব পালনের ব্যস্ততার মাঝেও তিনি এই অভ্যাসটি ধরে রেখেছেন। তবে এখন কিছুটা সমস্যা হচ্ছে; আগে ঘুমানোর সময় একজন তার গায়ের ঘামাচি মেরে দিত, এখন আর তা সম্ভব হচ্ছে না। তিনি প্রায়ই ভাবেন, পলিটিক্যাল পিএস-কেই হয়তো ঘামাচি মারতে বলবেন, কারণ সে আগ্রহ নিয়ে কাজটা করবে। তবে তার মনে একটাই ভয়, এই খবর যদি কোনো পত্রিকায় চলে যায়! তার মতে, পত্রিকাগুলো এখন দুষ্টদের দখলে এবং তারা সম্মানিত মন্ত্রীদের ওপর টেলিস্কোপ ফিট করে রেখেছে, যার ফলে ১০ মিনিট আরাম করে ঘুমানোর উপায়ও নেই।

সালাহউদ্দিন খান ভুলু যখন দিবানিদ্রা সেরে উঠলেন, তখন তার মন মেজাজ পুরোপুরি ধাতস্থ হয়নি। তিনি কয়েকবার হাই তুললেন। ঠিক সেই মুহূর্তে তার পিএস (সরকারি) কক্ষে প্রবেশ করে বিনীত গলায় জিজ্ঞেস করলেন, "স্যারের ঘুম ভালো হয়েছে?"

মন্ত্রী উত্তর দিলেন, "আমি আপনাকে অনেকবার বলেছি, দুপুরে আমি ঘুমাই না। চোখ বন্ধ করে এক ধরনের যোগব্যায়াম করি। শবাসন এই ব্যায়ামের নাম। এতে টেনশন কমে।"

পিএস তখন বললেন, "স্যার, সরি। আমি যোগব্যায়ামের ব্যাপারটা বুঝতে পারিনি। আপনার নাক ডাকার শব্দে বিভ্রান্ত হয়েছি।"

মন্ত্রী ক্ষুব্ধ হয়ে বললেন, "এরা বিখ্যাত হলো কবে? আমি তো নামও শুনি নাই। মিডিয়া এদের বিখ্যাত বানিয়েছে। সব মিডিয়ার কারসাজি। দেশটাকে নষ্ট করে দিচ্ছে মিডিয়া।"

এরপর তিনি পুনরায় বুঝিয়ে বললেন, "আর বিভ্রান্ত হবেন না। নাক ডাকা না। দ্রুত নিঃশ্বাস-প্রশ্বাস ফেলা যোগব্যায়ামেরই অংশ। আমার নাকে পলিপ আছে বলে দ্রুত নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসের সময় নাক ডাকার মতো শব্দ হয়। এখন ক্লিয়ার হয়েছে?"

পিএস সম্মতি জানিয়ে বললেন, "অবশ্যই, স্যার।"

মন্ত্রী জানতে চাইলেন, "কোনো কাজে এসেছেন?"

পিএস জানালেন, "একটা রেড অ্যাকসিডেন্ট হয়েছে। মাইক্রোবাস ভেঙে গুঁড়া হয়ে গেছে। পাঁচ জন মারা গেছে।"

মন্ত্রী বিরক্তির সাথে বললেন, "অ্যাকসিডেন্ট হলে মানুষ মারা যাবে, এটা নতুন কী? এই তুচ্ছ বিষয় নিয়ে আপনি আমার কাছে এসেছেন?"

পিএস পাল্টা যুক্তি দিলেন, "অনেকেই আপনাকে দুষছে। রাস্তাঘাট ভাঙা, খানাখন্দে ভরা। এই কারণেই অ্যাকসিডেন্ট হচ্ছে।"

মন্ত্রী জিজ্ঞেস করলেন, "এটা কী মাস?"

পিএস উত্তর দিলেন, "ভাদ্র মাসের শুরু।"

মন্ত্রী জানতে চাইলেন, "বৃষ্টি হচ্ছে না?"

পিএস বললেন, "রোজ বৃষ্টি হচ্ছে।"

মন্ত্রী প্রশ্ন করলেন, "এই বৃষ্টিতে রাস্তাঘাট ঠিক থাকে?"

পিএস উত্তর দিলেন, "থাকে না, স্যার।"

তখন মন্ত্রী বললেন, "বাস্তবতা বুঝতে হবে। তুচ্ছ বিষয়ে মন্ত্রীকে দুষলে হবে না। বুঝেছেন?"

পিএস বললেন, "জি স্যার।"

মন্ত্রী মন্তব্য করলেন, "খরা মৌসুম আসুক, রাস্তাঘাট ঠিক হবে।"

পিএস জানালেন, "সাংবাদিকেরা আপনার কাছ থেকে শুনতে চায়।"

মন্ত্রী সাফ জানিয়ে দিলেন, "শুনতে চাইলেই আমি শোনাব না। আপনি বলে দিন, গতবারের সরকারের যোগাযোগ খাতে সীমাহীন দুর্নীতির কারণে রাস্তাঘাটের আজ এমন বেহাল দশা। একটা স্টেটমেন্ট দিয়ে দিন।"

পিএস বললেন, "জি স্যার। স্টেটমেন্টের ব্যবস্থা করছি। তবে আপনাকে একটু কষ্ট করে হাসপাতালে যেতে হবে। মাইক্রোবাস দুর্ঘটনায় কিছু বিখ্যাত মানুষ মারা গেছে। যাঁরা আহত, তাঁদের দেখতে যাওয়া উচিত।"

মন্ত্রী অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, "বিখ্যাত মানুষ কে মারা গেল?"

পিএস যখন বিখ্যাত মানুষদের তালিকা বললেন, তখন মন্ত্রী বিরক্ত হয়ে বললেন, "এরা বিখ্যাত হলো কবে? আমি তো নামও শুনি নাই। মিডিয়া এদের বিখ্যাত বানিয়েছে। সব মিডিয়ার কারসাজি। দেশটাকে নষ্ট করে দিচ্ছে মিডিয়া।"

পিএস বললেন, "যথার্থ বলেছেন। তবে মিডিয়াকে অগ্রাহ্য করা ঠিক হবে না।"

মন্ত্রী জিজ্ঞেস করলেন, "হাসপাতালে গিয়ে কী বলব, ঠিক করে এনেছেন? উল্টাপাল্টা কিছু বলে ফেলতে পারি। মুডি মানুষ তো, মুডের ওপর চলি।"

পিএস জানালেন যে তিনি দুই ধরনের বক্তব্য তৈরি করেছেন। প্রথমটি হলো, "আল্লাহর মাল আল্লাহ নিয়ে গেছে, আমাদের কী করার আছে?"

মন্ত্রী মনে মনে ভাবলেন, লোমের পয়েন্টে মামলা করা যেতে পারে, তবে এখন নতুন ঝামেলায় যাওয়া ঠিক হবে না। কারণ এরপর নিউজ হবে যে, কার্টুন ছবিতে মন্ত্রীর গায়ের লোম দেখানোয় এক কোটি টাকার মানহানির মামলা।

মন্ত্রী বললেন, "ভালো বক্তব্য। আল্লাহর ওপর কোনো কথা নেই। ধর্মভিত্তিক দল আমার এই বক্তব্য পছন্দ করবে।"

পিএস দ্বিতীয় বিকল্পটি দিলেন, "অথবা আপনি বলবেন, মাইক্রোবাসের চালকের অদক্ষতাই দুর্ঘটনার কারণ। সে ওভারটেক করতে গিয়ে দুর্ঘটনা ঘটিয়েছে। এতে দোষটা ওদের ঘাড়ে গিয়েই পড়বে।"

মন্ত্রী বললেন, "এটাও খারাপ না। আমি বরং দুটো একত্র করে বলি। প্রথম বলি, মাইক্রোবাস চালকের ভুল। তারপর বলি, আল্লাহর মাল আল্লায় নিয়েছে। বুদ্ধিটা কেমন বের করেছি?"

পিএস প্রশংসা করে বললেন, "অসাধারণ। আপনার চিন্তাধারাই বৈপ্লবিক।"

এরপর এই মুডি মন্ত্রী নানা কথা বলতে শুরু করলেন এবং মিডিয়া তা নিয়ে কাজ করল। মন্ত্রী যখন রাস্তার বেহাল দশা দেখতে গেলেন, তখন কিছু পত্রিকা তার হাসিমুখের ছবি ছাপাল। রাস্তার বিশাল এক গর্তের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি হাসছেন—এমন ছবি প্রকাশিত হলো। এই অপরাধ ক্ষমা করা গেলেও, তার পদত্যাগ চেয়ে প্রতিবেদনটি ক্ষমা করা যায় না। বাংলাদেশের ইতিহাসে কোনো মন্ত্রী কি কখনো পদত্যাগ করেছেন? মন্ত্রীরা হলেন কচ্ছপের মতো, যারা কামড়ে মন্ত্রিত্ব ধরে রাখেন। এটাই নিয়ম।

মন্ত্রী তার রাজনৈতিক সচিবের পরামর্শে কিছু জটিল পদক্ষেপ নিলেন। একজন দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হলো। কিন্তু সমস্যা দেখা দিল যে, সবাই দুর্নীতিবাজ। রসুনের বোঁটা অবস্থা। একজনকে শাস্তি দিলে বাকিরা খেপে যাবে, তাই তাদের গায়ে হাত দেওয়া যাবে না। শেষ পর্যন্ত অনেক ঝামেলা করে একজন সৎ কর্মচারীকে খুঁজে তাকে বরখাস্ত করা হলো।

মন্ত্রী সব পত্রিকায় তার একটি ছবি পাঠালেন, যেখানে তিনি কোদাল হাতে ভাঙা রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে। নিচে লেখা ছিল, ’মন্ত্রী মহোদয় নিজেই রাস্তা মেরামতে নেমে পড়েছেন।’

কোনো পত্রিকা এই ছবি ছাপাল না, বরং একটি বদ পত্রিকা ছবিটিকে কার্টুন বানিয়ে ছাপাল। কার্টুনে দেখা গেল, রাক্ষস চেহারার এক লোক খালি গায়ে খাকি হাফপ্যান্ট পরে বেলচা হাতে দাঁড়িয়ে আছে এবং তার গায়ের ও পায়ের বড় বড় লোম দেখা যাচ্ছে। নিচে লেখা ছিল, "যোগাযোগমন্ত্রী বলেছেন, আমি একাই ৩৫০ কিলোমিটার রাস্তা মেরামত করব, ইনশাআল্লাহ।"

মন্ত্রী ক্ষুব্ধ হয়ে পিএসকে বললেন, "তিন কোটি টাকার একটা মানহানি মামলার ব্যবস্থা করুন। আমার ছবি বিকৃত করে ছেপে আমার মানহানি করেছে।"

পিএস বললেন, "বিকৃত করে তো ছাপে নাই, স্যার। কার্টুনে আপনাকে চেনা যায়।"

মন্ত্রী অবাক হয়ে বললেন, "আমাকে চেনা যায়?"

পিএস বললেন, "জি স্যার।"

মন্ত্রী জিজ্ঞেস করলেন, "আমার গাভর্তি লোম?"

পিএস উত্তর দিলেন, "লোমের পয়েন্টে মামলা করতে পারেন। তবে এখন নতুন ঝামেলায় যাওয়া ঠিক হবে না। এরপর এরা নিউজ করে দেবে—কার্টুন ছবিতে মন্ত্রীর গায়ের লোম দেখানোয় এক কোটি টাকার মানহানির মামলা।"

এক সকালবেলার কথা। মন্ত্রীর স্ত্রী সালমা বানু (বিশিষ্ট সমাজসেবী, পরিবেশ রক্ষাকর্মী, বিপন্ন হনুমান বাঁচাও আন্দোলনের সভানেত্রী) তার স্বামীকে ঘুম থেকে ডেকে তীক্ষ্ণ গলায় বললেন, "আমাকে না জানিয়ে, আমার সঙ্গে পরামর্শ না করে তুমি কী করে এই কাজ করলে?"

মন্ত্রী অবাক হয়ে বললেন, "কী কাজ করলাম?"

স্ত্রী বললেন, "পদত্যাগ করেছ, আমাকে না জানিয়ে।"

মন্ত্রী বিস্মিত হয়ে বললেন, "পদত্যাগ করব কোন দুঃখে?"

স্ত্রী তাকে পত্রিকা দেখিয়ে বললেন, "পত্রিকায় নিউজ এসেছে। এই দেখো।"

পত্রিকায় লেখা ছিল, ‘যোগাযোগমন্ত্রীর পদত্যাগ’। নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, মন্ত্রী মহোদয় স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেছেন।

হতভম্ব মন্ত্রী তার পিএসকে টেলিফোন করলেন। অনেকবার রিং হলেও পিএস ফোন ধরলেন না, কারণ তিনিও নিউজ পড়েছেন এবং এখন যে আর মন্ত্রী নন, তার ফোন ধরার প্রয়োজন মনে করেননি। আমজনতার ফোন ধরার কোনো মানে নেই।

এরপর মন্ত্রী প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক পিএসকে ফোন করলেন। কথা শুরু করার আগেই পিএস বললেন, "পদত্যাগ করে ভালো করেছেন। দলের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হয়েছে। আচ্ছা রাখি।"

লাইন কেটে দেওয়ার পর মন্ত্রী অনেক চেষ্টা করেও আর প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সচিবের সাথে যোগাযোগ করতে পারলেন না।

কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি লক্ষ্য করলেন, পত্রিকার এই বানোয়াট খবর সবাই বিশ্বাস করে বসে আছে। তার নিরাপত্তায় নিয়োজিত পুলিশ বাহিনীর সাব-ইন্সপেক্টর সিগারেট ফুঁকছিল, তাকে দেখে সিগারেট ফেলে না দিয়ে শুধু পেছনে আড়াল করল।

মন্ত্রী প্রধানমন্ত্রীকে ধরার জন্য রবার্ট ব্রুসের চেয়েও বেশি চেষ্টা করলেন। অবশেষে প্রধানমন্ত্রী ফোন ধরলেন এবং বললেন, "আপনি স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করে একটি সাহসী পদক্ষেপ নিয়েছেন। আপনাকে অভিনন্দন। মন্ত্রী না থেকেও জনগণের সেবা করা যায়। জনগণের সেবা করুন।"

প্রধানমন্ত্রী টেলিফোন রেখে দিলেন।

গল্পের মোরাল: মন্ত্রীদের বুকে এবং পায়ে লোম না-থাকা বাঞ্ছনীয়।