কুমিল্লার কোটবাড়ীর গন্ধমতী এলাকার নুরজাহান ভিলার তৃতীয় তলার একটি ফ্ল্যাট। দরজার পাশে লেখা রয়েছে—‘অপ্রতিমদের বাসা, প্রযত্নে নাহিদ ও শাহরিয়ার’। কিন্তু সেই বাসায় এখন আর নেই ১৩ বছর বয়সী ইশায়াত শাহরিয়ার ওরফে অপ্রতিম। যে সন্তানকে ঘিরে বাবা-মায়ের সমস্ত স্বপ্ন বোনা ছিল, তাকে হারানোর এক মাস পার হয়ে গেলেও শোকের তীব্রতা কমেনি। তাঁদের কাছে সময় যেন এক জায়গায় থমকে দাঁড়িয়ে আছে।

একসময় অপ্রতিমের হাসি, কথা আর ছোটাছুটিতে মুখর থাকা এই বাড়িটি এখন কেবল তার স্মৃতি বয়ে বেড়াচ্ছে। একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে মা নাহিদা বেগম ও বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ারের জীবন এখন দুই ভাগে বিভক্ত—একটি হলো অপ্রতিমকে নিয়ে কাটানো সুখের দিনগুলো, আর অন্যটি তাকে ছাড়া বেঁচে থাকার এক দুঃসহ বর্তমান। এখন তাঁদের একমাত্র চাওয়া হলো সন্তানের খুনিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি।

সোমবার দুপুরে মুঠোফোনে মুক্তকণ্ঠের সঙ্গে কথা বলার সময় ফিরোজ শাহরিয়ার বলেন, ‘আমাদের পুরোটা অস্তিত্বজুড়ে ছেলেটা। তাকে নিয়ে আমার আর নাহিদার সব স্বপ্ন ছিল। কিন্তু ছেলেটা নেই এক মাস হলো। অপ্রতিমকে ছাড়া পৃথিবীটা বড্ড শূন্য লাগছে। কীভাবে বাকিটা জীবন কাটাব, নিজেও জানি না।’

ছেলের মৃত্যুর পর থেকে মানসিকভাবে পুরোপুরি ভেঙে পড়েছেন মা নাহিদা বেগম। তিনি কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের একজন সহযোগী অধ্যাপক। অপ্রতিমের মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর তাঁর শারীরিক অবস্থার এতটাই অবনতি হয় যে, পরিবারের সদস্যরা তাঁকে খাবার পর্যন্ত খাওয়াতে পারছিলেন না। ঘটনার চার-পাঁচ দিন পর তিনি কুমিল্লা ছেড়ে ঢাকায় তাঁর বোনের বাসায় চলে যান এবং বর্তমানে সেখানেই অবস্থান করছেন।

স্ত্রীর kondisi সম্পর্কে সোমবার দুপুরে ফিরোজ শাহরিয়ার বলেন, ‘একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে আমাদের পুরো পৃথিবীটাই যেন হারিয়ে ফেলেছি। ছেলেটা খুন হওয়ার পর আমার স্ত্রীর জীবন নিয়েও শঙ্কিত ছিলাম। সে কিছুই খেতে চাইত না। কথা বলার শক্তিও হারিয়ে ফেলেছিল। অবস্থাটা এমন হয়েছিল—আমিও তো সন্তানহারা। স্ত্রীকে কীভাবে সান্ত্বনা দেব বা আমরা কে কাকে সান্ত্বনা দেব?’

ফিরোজ শাহরিয়ার আরও জানান, ঢাকায় যাওয়ার পর নাহিদা বেগমের শারীরিক অবস্থার খুব একটা উন্নতি হয়নি। পরবর্তীতে তাঁকে মনোরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। বর্তমানে তিনি কিছুটা ঘুমাতে এবং খেতে পারছেন, তবে সন্তানের শোক কাটিয়ে ওঠা তাঁর পক্ষে সম্ভব হয়নি। ফিরোজ শাহরিয়ারের মতে, স্ত্রীর সঙ্গে কথা হলেই অপ্রতিমকে নিয়ে তাঁর অসহায়ত্বের কথা সামনে আসে। স্ত্রী মাঝে মাঝে অন্যের সঙ্গে কথা বলে মন হালকা করার চেষ্টা করলেও সেখানে বারবার অপ্রতিমের স্মৃতি ফিরে আসে।

নিজের অনুভূতির কথা জানাতে গিয়ে ফিরোজ শাহরিয়ার বলেন, ‘মাঝেমধ্যে মনে হয় কারও সঙ্গে ফোনে কথা বললে ভালো লাগবে। কিন্তু ফোনে কথা বলতে গেলেও অপ্রতিমের ছবিটা আমার আর নাহিদার সামনে ভেসে ওঠে। নিজেকে সামলাতে পারছি না।’

গত ১৮ সেপ্টেম্বর কুমিল্লার কোটবাড়ীর গন্ধমতী এলাকার বাসা থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হয় অপ্রতিম। সে কুমিল্লা কোটবাড়ীর বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। নিখোঁজের পরদিন ১৯ সেপ্টেম্বর সদর দক্ষিণ উপজেলার বিজয়পুর ইউনিয়নের সানন্দা গ্রামের লালমাই পাহাড়ের একটি নির্জন জঙ্গল থেকে পুলিশ তার মরদেহ উদ্ধার করে।

পুলিশের তদন্ত অনুযায়ী, অপ্রতিমের সঙ্গে থাকা আইফোনটি ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে তাকে পরিকল্পিতভাবে নির্জন জঙ্গলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। ফোন ছিনিয়ে নেওয়ার সময় বাধা দিলে বাঁশের লাঠি দিয়ে তার মাথায় প্রচণ্ড আঘাত করা হয়, যার ফলে তার মৃত্যু ঘটে।

এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় পুলিশ চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে। পুলিশের দাবি, গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে তিনজন সরাসরি হত্যাকাণ্ডে অংশ নিয়েছেন এবং একজন সহায়তা করেছেন। গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে দুজন কিশোর। তবে শুরু থেকেই তাদের বয়স নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে অপ্রতিমের পরিবার। প্রয়োজনে ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে তাদের প্রকৃত বয়স নির্ধারণের দাবি জানিয়েছেন পরিবার এবং কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা।

বর্তমানে পরিবারের কাছে সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার হলো দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা। সোমবার এ বিষয়ে জানতে চাইলে ফিরোজ শাহরিয়ার বলেন, ‘আমরা খুনিদের দ্রুত বিচার দেখতে চাই। এখন সেই প্রক্রিয়ায় গেলে অনেক দেরি হয়ে যাবে। পুলিশ বলছে, দুই-তিন দিনের মধ্যে আদালতে অভিযোগপত্র দেবে। এরপর আমরা আইনজীবীর মাধ্যমে পরবর্তী সময়ে এ নিয়ে আইনি প্রক্রিয়ায় যাব।’

গত শনিবার এক সংবাদ সম্মেলনে কুমিল্লার পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান জানিয়েছেন, অপ্রতিম হত্যা মামলার তদন্ত প্রায় শেষ পর্যায়ে। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন, চিকিৎসাসংক্রান্ত নথি এবং প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্র পুলিশের কাছে জমা পড়েছে। আগামী দুই-তিন দিনের মধ্যেই আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হবে।