মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গলের সবুজবাগ এলাকায় আয়োজিত এবারের দুর্গাপূজায় আরাধনার পাশাপাশি গুরুত্ব পেয়েছে দেশজুড়ে চলমান নারী নিপীড়নের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ। সবুজবাগ যুব দুর্গাপূজা উদ্যাপন পরিষদের ১৮তম বর্ষের এই আয়োজনে বিশেষ থিম হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে ‘অভয়া’। মণ্ডপের সামগ্রিক সাজসজ্জার মাধ্যমে নারীর ওপর নির্যাতন, ধর্ষণ ও বৈষম্যের করুণ চিত্র ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
মণ্ডপের বেদিতে অধিষ্ঠিত দেবী দুর্গার প্রতিমার ঠিক ওপরেই বড় অক্ষরে লেখা হয়েছে ‘ভয় নয়, প্রতিবাদ হোক’। তার পাশেই শোভা পাচ্ছে আরেকটি পঙ্ক্তি— ‘অভয়া, প্রতিবাদী নারীর কণ্ঠস্বর’।
দর্শনার্থীরা মণ্ডপে প্রবেশ করলেই চারপাশের দেয়ালে অসংখ্য ব্যানার ও অর্থবহ চিত্রকর্মের দেখা পান। নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়া, সুফিয়া কামাল, ইলা মিত্র, রানি রাসমণি এবং কাদম্বিনী গাঙ্গুলীর অনুপ্রেরণামূলক বাণী দিয়ে সাজানো হয়েছে পুরো মণ্ডপটি। এর পাশাপাশি প্রদর্শিত হয়েছে মুষ্টিবদ্ধ হাত, চোখ বাঁধা নারী এবং রক্তের ছোপের মতো লাল রঙের হাতের ছাপের চিত্রকর্ম, যা দর্শকদের মনে গভীর প্রভাব ফেলছে।
দেয়ালে টাঙানো বিভিন্ন স্লোগানের মাধ্যমে মণ্ডপটিকে একটি প্রতিবাদী মঞ্চে রূপ দেওয়া হয়েছে। সেখানে লেখা রয়েছে— ‘পোশাক নয়, মানসিকতা বদলাও’, ‘অপরাধীর লজ্জা, ভুক্তভোগীর নয়’ এবং ‘প্রতিবাদ মানেই বিদ্রোহ নয়, প্রতিবাদ মানেই বিবেক’।
আয়োজকদের মতে, যখন নারীরা চরম সংকটে পড়েন এবং দেয়ালে পিঠ ঠেকে যায়, তখন তাঁরা মা দুর্গার মতোই অসুর বিনাশ করতে বারবার ‘অভয়া’ রূপে আবির্ভূত হন। এখানে অভয়া কেবল একটি নাম নয়, বরং এটি প্রতিটি প্রতিবাদী নারীর কণ্ঠস্বরের প্রতীক।
আয়োজক কমিটির সভাপতি ত্রিদিব রক্ষিত মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা প্রতিবছরই থিমভিত্তিক পূজা করি। এবার আমাদের থিম অভয়া। সমাজে নারী ও শিশুরাই সবচেয়ে বেশি নিপীড়নের শিকার হচ্ছেন।’ তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে নারীরা মা দুর্গার মতো অসুর বিনাশে বারবার ‘অভয়া’ রূপে ফিরে আসেন—এই বার্তাই তাঁরা সমাজের সামনে তুলে ধরতে চান। ত্রিদিব রক্ষিত বলেন, ‘অভয়া কোনো নাম নয়, এটি প্রতিবাদী নারীর কণ্ঠস্বর। নারীদের অন্ধকারে রাখলে সমাজ কখনো এগোতে পারে না। এসব চিন্তা থেকেই আমরা মণ্ডপ সাজিয়েছি।’
এই ব্যতিক্রমী আয়োজনের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন মণ্ডপে আসা দর্শনার্থীরা। অহনা রায় নামের একজন দর্শনার্থী জানান, সাধারণত পূজামণ্ডপে কেবল দেবীর আরাধনাই দেখা যায়, কিন্তু এখানে দুর্গার মহাশক্তির পাশাপাশি বাস্তব জীবনে নারীদের প্রতিবাদের ভাষাও চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। তাঁর ভাষ্য, ‘এই আয়োজন আমাদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করার সাহস জোগায়।’
অন্যদিকে, সৃজিতা দাশ বলেন, মণ্ডপের ব্যানার, হাতের ছাপ ও বিভিন্ন উক্তিগুলো মনে করিয়ে দেয় যে মুখ বুজে থাকার সময় এখন শেষ। তাঁর মতে, সমাজ পরিবর্তন করতে হলে প্রত্যেক মানুষকে প্রতিবাদী হতে হবে। উৎসবের আনন্দের পাশাপাশি পূজামণ্ডপে এমন সচেতনতামূলক উদ্যোগ অত্যন্ত প্রশংসনীয় বলে তিনি মনে করেন।