চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাস থেকে হরমুজ প্রণালি অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের ফলে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই সমুদ্রপথে জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় প্রাকৃতিক গ্যাস ও সারের রপ্তানি মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়েছে। এই পরিস্থিতির সরাসরি প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক খাদ্য উৎপাদন এবং কৃষি খাতের ওপর। ভূখণ্ডগতভাবে অনেক দূরে অবস্থিত হওয়া সত্ত্বেও এই ভূরাজনৈতিক সংকটের খেসারত দিতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। এর ফলে দেশে কৃত্রিম, প্রকৃত রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। চ্যানেল নিউজ এশিয়া (সিএনএ) সেপ্টেম্বরে ‘আ লাইফ উইদাউট অয়েল’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদনে বাংলাদেশের কৃষি খাত এবং কৃষকদের বর্তমান সংকটের বিস্তারিত চিত্র তুলে ধরেছে।
উক্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, বাংলাদেশ তার প্রয়োজনীয় রাসায়নিক সারের প্রায় ৮৫ শতাংশই আমদানি করে থাকে। বিশ্ববাণিজ্যে ব্যবহৃত ইউরিয়ার ৩০ শতাংশ এবং অ্যামোনিয়ার ২৫ শতাংশই হরমুজ প্রণালির মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে সরবরাহ করা হয়। সংঘাতের কারণে বৈশ্বিক বাজারে সারের দাম একলাফে প্রায় ৮০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এর পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ গ্যাস–সংকটের কারণে বাংলাদেশের পাঁচটি প্রধান ইউরিয়া কারখানার মধ্যে চারটির উৎপাদনই বর্তমানে বন্ধ হয়ে আছে।
ধান রোপণের এই গুরুত্বপূর্ণ মৌসুমে সারের তীব্র অভাব কৃষকদের সামনে চরম অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। দেশের প্রান্তিক এলাকাগুলোতে সারের কৃত্রিম সংকট তৈরি করে তা কালোবাজারে বিক্রির অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। এছাড়া পেট্রোলের প্যানিক বাইয়িং বা আতঙ্কে কেনাকাটার প্রবণতার কারণে পরিবহনব্যবস্থায় স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশে প্রতিদিন প্রায় ৪৯ হাজার টন কীটনাশক প্রয়োজন হয়, কিন্তু এর অভাবের কারণে ফসল পোকামাকড়ের আক্রমণে নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে। কারওয়ান বাজারের মতো বড় পাইকারি বাজারে মধ্যরাতেও খাদ্যবাহী ট্রাক প্রবেশ করতে বেগ পেতে হচ্ছে। পরিবহন খরচ বৃদ্ধি এবং জোগানের ঘাটতির প্রভাবে খুচরা বাজারে সবজি ও ফলের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছে। গ্লোবাল হাঙ্গার ইনডেক্স সূচকে ১২৭টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৮৪তম। বাংলাদেশ বর্তমানে মাঝারি মাত্রার ক্ষুধাপীড়িত দেশের তালিকায় রয়েছে এবং খাদ্য সরবরাহের এই ব্যাঘাত পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
বিশ্বজুড়ে শিল্পভিত্তিক কৃষি মূলত একফসলি চাষ এবং জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে তৈরি নাইট্রোজেন সারের ওপর চরমভাবে নির্ভরশীল। তবে দীর্ঘ মেয়াদে এই মডেলটি মারাত্মক ক্ষতিকর বলে প্রমাণিত হচ্ছে। নাইট্রোজেনভিত্তিক সংশ্লেষিত সার (যেমন: অ্যামোনিয়াম ও সালফার) সময়ের সাথে সাথে মাটির পিএইচ মাত্রা বিপজ্জনকভাবে কমিয়ে দেয়। এর ফলে মাটি অতিরিক্ত অম্লীয় হয়ে পড়ে এবং ক্যালসিয়াম ও ম্যাগনেশিয়ামের মতো প্রয়োজনীয় খনিজ উপাদানগুলো উদ্ভিদ শোষণ করতে পারে না। একই সাথে মাটির বন্ধু কেঁচো এবং উপকারী অণুজীবগুলো মারা যায়। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের ৯৫ শতাংশ কৃষক অতিরিক্ত মাত্রায় নাইট্রোজেন, ফসফরাস, পটাশিয়াম ও সালফার ব্যবহার করেন। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, কৃষক সুপারিশকৃত মাত্রার চেয়ে ২ থেকে ৫ গুণ বেশি সার ব্যবহার করছেন। জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের ২০১৫–২০১৭ সালের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, জরিপ করা ১০ হাজার ক্যানসার রোগীর মধ্যে অন্তত ১০০ জনই কৃষক। যার অন্যতম কারণ হিসেবে অনিয়ন্ত্রিত কীটনাশক ও সার ছিটানোকে চিহ্নিত করা হয়েছে।
এই সব সমস্যার বিকল্প সমাধান খুঁজছেন কৃষকেরা। বাংলাদেশের আনারসের রাজধানী হিসেবে পরিচিত টাঙ্গাইলের মধুপুরে মোট আনারসের ৬০ শতাংশের বেশি উৎপাদিত হয়। এখানকার স্থানীয় কৃষকেরা কেঁচো সারের মাধ্যমে সফলভাবে চাষাবাদ করছেন। রাসায়নিক সারের মতো হঠাৎ করে অতিরিক্ত পুষ্টি না দিয়ে ভার্মিকম্পোস্ট মাটিকে ধীর ও টেকসই গতিতে সুষম পুষ্টি জোগায় এবং মাটির স্বাভাবিক জৈব গুণাগুণ ফিরিয়ে আনে। অন্যদিকে, গ্যাসের সংকটে বালাইনাশক আমদানি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ঝিনাইদহের নারী কৃষকেরা রাসায়নিক সার ও কীটনাশক পুরোপুরি ত্যাগ করেছেন। তাঁরা এখন নিজ উদ্যোগে প্রাকৃতিক জৈব উপায়ে তৈরি বালাইনাশক ব্যবহার করছেন।
১৯৯০ সালে বাংলাদেশে ব্যবহৃত কৃষি রাসায়নিকের পরিমাণ ছিল তিন হাজার মেট্রিক টন, যা ২০২১ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৫ হাজার মেট্রিক টনে। এর পেছনে বড় কারণ ছিল উচ্চ রাসায়নিক–নির্ভর বিদেশি হাইব্রিড বীজ। বাংলাদেশ প্রতিবছর প্রায় ২৭ হাজার টন তেলবীজ আমদানি করে। এই নির্ভরতা কমাতে বীজ বিজ্ঞানীরা এখন দেশীয় বীজ নিয়ে গবেষণা করছেন। এই বীজগুলো স্থানীয় জলবায়ু, মাটি ও বৃষ্টির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারে এবং অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ছাড়াই স্বাভাবিক ফলন দিতে সক্ষম।