ইসলামে মানুষের জীবনের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ আইনি সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে। ইসলামি আইন বা ফিকহশাস্ত্রের মূল উদ্দেশ্য হলো—মানুষের জীবন, ধর্ম, বংশ, বুদ্ধি ও সম্পদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা, যাকে আইনি পরিভাষায় ‘মাকাসিদ আশ–শারিয়াহ’ বলা হয়। (ইমাম গাজালি, আল-মুসতাসফা মিন ইলমিল উসুল , ১/২৮৬, দারুল কুতুব আল-ইলমিয়া, বৈরুত, ১৯৯৩)
ইসলামি আইনে মৃত্যুদণ্ড কোনো সাধারণ শাস্তি নয়; বরং এটি শুধু সমাজ ও রাষ্ট্রের অস্তিত্বের জন্য হুমকিস্বরূপ নির্দিষ্ট কয়েকটি গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। এর মূল দর্শন প্রতিশোধ নেওয়া নয়, বরং বৃহত্তর সমাজের নিরাপত্তা ও ভারসাম্য বজায় রাখা।
ইসলামে যে প্রধান অপরাধগুলোর জন্য মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে, তার রূপরেখা তুলে ধরা হলো।
একই সঙ্গে চারজন নির্ভরযোগ্য প্রাপ্তবয়স্ক মানুষকে সরাসরি ও স্পষ্টভাবে অপরাধের চূড়ান্ত মুহূর্তটি দেখতে হবে। কারণ, ইসলাম মূলত মানুষের ব্যক্তিগত পাপ লুকিয়ে রাখার পক্ষপাতী।
অন্যায়ভাবে কোনো মানুষকে হত্যা করা হলে ইসলামি আইনে তার শাস্তি মৃত্যুদণ্ড, যাকে ‘কিসাস’ বলা হয়। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনগণ, নিহতদের ব্যাপারে তোমাদের ওপর কিসাসের বিধান দেওয়া হয়েছে।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৭৮)
এর আইনি দর্শন হলো, একজন মানুষের জীবনের মূল্য অন্য মানুষের জীবনের সমান। কেউ যখন অন্যের বেঁচে থাকার মৌলিক অধিকার হরণ করে, তখন আইন তার বেঁচে থাকার অধিকার বাতিল করে দেয়। সমাজকে খুনির হাত থেকে বাঁচাতে এবং ভবিষ্যৎ অপরাধীদের মনে ভয় সৃষ্টি করতে এই বিধান রাখা হয়েছে।
তবে এখানে শুধু রাষ্ট্রের হাতেই সব ক্ষমতা নেই; বরং ভুক্তভোগীর পরিবারকে আইনি অধিকার দিয়েছে। তারা চাইলে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে পারে, আবার চাইলে রক্তপণ (দিয়াত) নিয়ে খুনিকে ক্ষমাও করে দিতে পারে।
এই আইনি নমনীয়তার উদ্দেশ্য হলো সমাজে রক্তপাতের বদলে ক্ষমার চর্চা ও আপসের সুযোগ রাখা। (ইবন কুদামা, আল-মুগনি , ৮/২১৫, দারুল ফিকর, বৈরুত, ১৯৮৪)
পরিবার হলো মানবসমাজের মূল ভিত্তি। বিবাহিত অবস্থায় ব্যভিচার করাকে ইসলামি আইনে শুধু একটি ব্যক্তিগত পাপ হিসেবে দেখা হয় না, বরং এটি পারিবারিক কাঠামো ও বংশধারার (নসব) প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা।
রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘তিনটি অপরাধ ছাড়া কোনো মুসলিমের রক্ত হালাল নয়: একটি হলো বিবাহিত ব্যক্তি হওয়া সত্ত্বেও ব্যভিচারে লিপ্ত হওয়া।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৮৭৮)
যেহেতু একজন বিবাহিত ব্যক্তির যৌনচাহিদা পূরণের বৈধ আইনি অধিকার ও সুযোগ রয়েছে, তাই এরপরও ব্যভিচারে জড়ানোকে নৈতিক অবক্ষয় ধরা হয়।
তবে এই মৃত্যুদণ্ড প্রমাণের শর্ত বাস্তবায়ন করা বেশ কঠিন। একই সঙ্গে চারজন নির্ভরযোগ্য প্রাপ্তবয়স্ক মানুষকে সরাসরি ও স্পষ্টভাবে অপরাধের চূড়ান্ত মুহূর্তটি দেখতে হবে। কারণ, ইসলাম মূলত মানুষের ব্যক্তিগত পাপ লুকিয়ে রাখার পক্ষপাতী।
কিন্তু কেউ যদি এমন প্রকাশ্যে এই কাজ করে যে চারজন তা দেখে ফেলে, তার মানে সে সমাজের শালীনতার ভিত্তিমূলে প্রকাশ্য বিদ্রোহ করেছে। (আল-মারগিনানি, আল-হিদায়া , ২/৩৪৮, দার আল–ইহয়া আত–তুরাস আল-আরাবি, বৈরুত, ১৯৯৫)
আইনি দর্শন হলো, ‘জনস্বার্থ রক্ষা’ বা মাসলাহা মুরসালাহ। যখন একদল মানুষ অস্ত্র হাতে নিয়ে জনমনে চরম আতঙ্ক সৃষ্টি করে, তখন তারা পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থার বিরুদ্ধেই যুদ্ধ ঘোষণা করে।
সমাজে অস্ত্রের মুখে নৈরাজ্য সৃষ্টি করা, ছিনতাই-ডাকাতি বা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালনাকালে কাউকে হত্যা করাকে ইসলামি আইনে ‘হিরাবাহ’ বলা হয়। এটি রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক চলাচলের অধিকারের ওপর সরাসরি আঘাত।
পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘যারা জমিনে বিপর্যয় সৃষ্টি করে বেড়ায়, তাদের শাস্তি হলো—তাদের হত্যা করা হবে।’ (সুরা মায়েদা, আয়াত: ৩৩)
এর আইনি দর্শন হলো, ‘জনস্বার্থ রক্ষা’ বা মাসলাহা মুরসালাহ। যখন একদল মানুষ অস্ত্র হাতে নিয়ে জনমনে চরম আতঙ্ক সৃষ্টি করে, তখন তারা পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থার বিরুদ্ধেই যুদ্ধ ঘোষণা করে।
সাধারণ নাগরিকদের জানমালের নিরাপত্তা দিতে রাষ্ট্র বাধ্য। তাই রাষ্ট্রদ্রোহ ও জননিরাপত্তা নষ্ট করার মতো এমন সশস্ত্র অপরাধীদের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার বিধান রাখা হয়েছে। (আস-সারাখসি, আল-মাবসুত , ৯/১৩৪, দারুল মাআরিফা, বৈরুত, ১৯৮৯)
ইসলামি রাষ্ট্রের আনুগত্য অস্বীকার করে অস্ত্র হাতে তুলে নেওয়া এবং ধর্ম ত্যাগ করে মুসলিম সমাজের ঐক্য নষ্ট করার উদ্দেশ্যে বিদ্রোহ ঘটানো ইসলামে মৃত্যুদণ্ডযোগ্য অপরাধ। একে ফিকহের পরিভাষায় ‘রিদ্দাহ’ ও ‘বাগি’ বলা হয়।
রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘...এবং যে ব্যক্তি নিজের ধর্ম ত্যাগ করে মুসলিম জামাত ও সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৮৭৮)
কোনো রাষ্ট্রই তার নিজের অস্তিত্ব ধ্বংস করার আইনি অধিকার কাউকে দিতে পারে না। তাই যারা ইসলামি রাষ্ট্রে ধর্ম ত্যাগ করে বিদ্রোহ করে বা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সশস্ত্র হয়, তাদের কঠোরভাবে দমনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যাতে সমাজে গৃহযুদ্ধ ও অরাজকতা ছড়িয়ে না পড়ে। (আল-কাসানি, বাদাইউস সানায়ি , ৭/১৪০, দারুল কুতুব আল-ইলমিয়া, বৈরুত, ১৯৮৬)
ইসলামে একজন অপরাধীকে মৃত্যুদণ্ড দিয়ে সমাজকে সুরক্ষিত করার চেয়ে, একজন নিরপরাধ মানুষের জীবন রক্ষা করাকে আদালতের বৃহত্তর আইনি দায়িত্ব হিসেবে দেখা হয়।
ইসলামি বিচারব্যবস্থায় মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আইনি মূলনীতি হলো, ‘সন্দেহ বা অস্পষ্টতার কারণে হদ্দ (সর্বোচ্চ শাস্তি) মওকুফ হয়ে যায়।’ (ইবন নুজাইম, আল-আশবাহ ওয়ান নাজাইর , পৃষ্ঠা ১২৩, দারুল কুতুব আল-ইলমিয়া, বৈরুত, ১৯৯৯)
বিচারক যদি অপরাধ প্রমাণের ক্ষেত্রে সামান্যতম সন্দেহও খুঁজে পান, তবে তিনি মৃত্যুদণ্ড বাতিল করে অপরাধীকে অন্য কোনো লঘু শাস্তি (তাজির) দেবেন। অর্থাৎ, শতভাগ সন্দেহমুক্ত প্রমাণ ছাড়া ইসলামি আদালতে কারও মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার আইনি কোনো সুযোগ নেই।
এর মূল লক্ষ্য হলো, কোনো নিরীহ মানুষ যেন ভুল বিচারের শিকার হয়ে মারা না যান। ইসলামে একজন অপরাধীকে মৃত্যুদণ্ড দিয়ে সমাজকে সুরক্ষিত করার চেয়ে, একজন নিরপরাধ মানুষের জীবন রক্ষা করাকে আদালতের বৃহত্তর আইনি দায়িত্ব হিসেবে দেখা হয়।