মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দিতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে অস্ত্রকাণ্ডের বিষয়ে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করেছেন ইশরাক হোসেন। তিনি বলেন, ‘যদি আমার দ্বারা কোনো ভুল হয়ে থাকে, আমি কাউকে আঘাতপ্রাপ্ত করে থাকি এই অভিযানের মাধ্যমে, সেটার জন্য আগে আমি দুঃখপ্রকাশ করে নিচ্ছি। কিন্তু আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, আমি কোনো ভুল সেদিন করিনি। আমি কেবল আমার নিরাপত্তার জন্য আমার হাতে অস্ত্রটুকু যতটুকু সময় প্রয়োজন রেখেছিলাম, পরবর্তীকালে সেটি আর আমার দৃশ্যমান হয়নি।’

আজ সোমবার দুপুরে রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবে এই সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। পূর্বনির্ধারিত এই সম্মেলন করতে বেলা পৌনে ২টার দিকে জাতীয় প্রেসক্লাবের আবদুস সালাম হলে নেতাকর্মীদের সাথে প্রবেশ করেন ইশরাক হোসেন। সেই মুহূর্তে তাঁর অনুসারীরা ‘রাজপথের ইশরাক ভাই, আমরা তোমায় ভুলি নাই’, ‘ইশরাক ভাই ভয় নাই, রাজপথ ছাড়ি নাই’, ‘মাদকের আস্তানা, ভেঙে দাও, গুঁড়িয়ে দাও’ ইত্যাদি স্লোগান দিতে থাকেন। বেলা দুইটার দিকে আনুষ্ঠানিকভাবে সংবাদ সম্মেলনটি শুরু হয়।

পদত্যাগ প্রসঙ্গে সংবাদ সম্মেলনে ইশরাক হোসেন বলেন, ‘আজকের দিন থেকে আমি মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব থেকে স্বেচ্ছায় অব্যাহতি চেয়েছি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে। আমি তাঁকে বলেছি পুরো সময়টাতে ঢাকা-৬ আসন, পার্শ্ববর্তী এলাকা, পরবর্তী সময়ে আরও যদি এলাকা থাকে, সেখানকার মাদক নির্মূল এবং আমাদের জাতীয় জনজীবনের অন্যান্য সমস্যা নিয়ে কাজ করতে চাই। তিনি সদয় সম্মত হয়েছেন এবং আমাকে সুযোগ করে দিয়েছেন-‘‘ঠিক আছে যাও, এলাকা ঠিক করে এলাকায় কাজ কর।’’

ইশরাক হোসেন আরও উল্লেখ করেন যে, নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে প্রধানমন্ত্রী তাঁকে প্রথম মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন। তিনি দাবি করেন, দেশের সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করার সুযোগ তিনি পেয়েছিলেন। তিনি বলেন, ‘আজকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উপস্থাপন করতে এসেছি, যা গত দুই-তিন ধরে নানা আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এ বিষয়ে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে নানা ধরনের খবর প্রকাশিত হয়েছে। কিছু সত্য, কিছুটা অতিরঞ্জিত নানা ধরনের খবর প্রকাশ পেয়েছে। আমি আজকে আপনাদের সামনে উপস্থিত হয়েছি মূলত ওই দিন ঠিক কী ঘটেছিল, সেটির বিস্তারিত তুলে ধরতে।’

পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী তিনি ঘুণ্টিঘরে গিয়েছিলেন বলে জানান ইশরাক হোসেন। তিনি উল্লেখ করেন, তাঁরা স্থানীয় থানাকে অবহিত করেই সেখানে যান। তাঁর লাইসেন্সকৃত অস্ত্রটি সবসময় কোমরে থাকে। পরিস্থিতি মোকাবিলা এবং আত্মরক্ষার স্বার্থে তিনি আগ্নেয়াস্ত্র হাতে নিয়েছিলেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া ভিডিওর মাধ্যমে তিনি নিশ্চিত করতে চেয়েছেন যে, মাদকাসক্তদের হাতে কোনো অস্ত্র ছিল না।

ওই ঘটনার পর তিনি পূজামণ্ডপ পরিদর্শনে গিয়েছিলেন বলে জানান ইশরাক। তিনি বলেন, রাতে তিনি দেখতে পান একটি ভিডিও ভাইরাল হয়েছে এবং গণমাধ্যমে বিভিন্ন শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। ঘটনার দিন প্রধানমন্ত্রী ১৩টি জায়গা পরিদর্শন করেছিলেন, যা অত্যন্ত প্রশংসনীয় ছিল। কিন্তু ইশরাক হোসেনের ঘটনাটি গণমাধ্যমে যেভাবে প্রচারিত হয়েছে, তাতে প্রধানমন্ত্রীর সেই ইতিবাচক কর্মকাণ্ডগুলো ঢাকা পড়ে গেছে বলে তিনি মনে করেন।

পরবর্তীতে প্রধানমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাৎ করে মাদকের ভয়াবহতার বিষয়টি বিস্তারিত জানান ইশরাক হোসেন। সেখানে তিনি পদত্যাগের ইচ্ছা প্রকাশ করেন। তাঁর কারণে যেন প্রধানমন্ত্রীর কর্মকাণ্ড ম্লান না হয়ে যায়, সে লক্ষ্যেই তিনি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে উল্লেখ করেন। তবে মাদকের বিরুদ্ধে তাঁর অভিযান অব্যাহত থাকবে বলে ঘোষণা দেন তিনি।

এদিকে গতকাল রোববার সরকার-সংশ্লিষ্ট উচ্চপর্যায়ের একাধিক সূত্র থেকে জানা গিয়েছিল যে, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনকে মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সূত্রগুলো জানায়, রোববার বিকেলে সচিবালয়ে মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষ করে ইশরাককে ডেকে পাঠান প্রধানমন্ত্রী এবং সেখানেই তাঁকে পদত্যাগের নির্দেশ দেওয়া হয়।

গত শনিবার রাজধানীর গেন্ডারিয়ার ঘুণ্টিঘরে আগ্নেয়াস্ত্র উঁচিয়ে মাদকবিরোধী অভিযানে অংশ নেন ইশরাক হোসেন। তাঁর সাথে থাকা ব্যক্তিদের হাতেও অস্ত্র ছিল। এই ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে একজন প্রতিমন্ত্রীর এমনভাবে অস্ত্র প্রদর্শন করে অভিযানে অংশ নেওয়া নিয়ে ব্যাপক প্রশ্ন ওঠে। এই ঘটনা বিএনপি এবং সরকারের ভেতরেও অস্বস্তি ও অসন্তোষ তৈরি করে। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যখন রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারি আবাসিক এলাকার পরিস্থিতি দেখতে আকস্মিক পরিদর্শন করছেন, তখন একজন প্রতিমন্ত্রীর এ ধরনের কর্মকাণ্ড সরকারকে বিব্রত করেছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

তবে সমালোচনার মুখে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক বিবৃতিতে ইশরাক হোসেন দাবি করেছিলেন, তিনি মাদকবিরোধী সামাজিক প্রতিরোধ কর্মসূচিতে অংশ নিতে সেখানে গিয়েছিলেন। পুলিশ, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা ও সামাজিক নেতাদের যৌথ সিদ্ধান্তে ওই কর্মসূচি নেওয়া হয়েছিল বলে তিনি জানান।

এর আগে গতকাল রোববার রাত ১০টার দিকে ‘মন্ত্রিসভা থেকে ইশরাককে পদত্যাগের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর’ শিরোনামে খবর প্রকাশ করেছিল মুক্তকণ্ঠ। এই খবর প্রকাশের পর একের পর এক ফেসবুক পোস্ট এবং হোয়াটসঅ্যাপে অডিও বার্তার মাধ্যমে সংবাদটিকে ‘গুজব’ বলে দাবি করেছিলেন ইশরাক। তাঁর প্রেস কর্মকর্তাও সংবাদটিকে ‘অসত্য ও বিভ্রান্তিকর’ বলে প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন। তবে আজ সকাল সাড়ে ৮টার পর নিজেই ফেসবুকে পদত্যাগের ঘোষণা দেন ইশরাক। পরবর্তীতে দুপুরে জাতীয় প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগের কথা জানান।