পদার্থবিজ্ঞানের জগতে এক অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করেছেন একদল গবেষক। তাঁরা পদার্থের এমন এক নতুন অবস্থার খোঁজ পেয়েছেন, যা চরম ও অতিশীতল পরিস্থিতিতে কোয়ান্টাম কণার আচরণ বুঝতে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে বিবেচিত হচ্ছে। এই আবিষ্কারের ফলে স্বাভাবিক অবস্থার বাইরে কণাগুলো কীভাবে একটি সুশৃঙ্খল বিন্যাস তৈরি করে, সে সম্পর্কে বিস্তারিত জানা সম্ভব হবে।

দীর্ঘদিন ধরে পরিচালিত গবেষণার পর বিজ্ঞানীরা পদার্থের এই অস্বাভাবিক অবস্থাকে চিহ্নিত করেছেন। এই নতুন আবিষ্কারটি অত্যন্ত ক্ষুদ্র পরিসরে কণার আচরণ সম্পর্কে পদার্থবিদদের দীর্ঘদিনের প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে। গবেষকেরা এই বিশেষ অবস্থাকে ‘ফ্র্যাকশনাল ফারমি সি’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানের এখনও অজানা ও রহস্যময় দিকগুলো অন্বেষণ করতে এই নতুন অবস্থা গবেষকদের দারুণ সহায়তা করবে বলে আশা করা হচ্ছে। এই গবেষণার কাজে অতিশীতল পরমাণু ব্যবহার করা হয়েছে। গবেষক দলটি একটি নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে কণাগুলোর আচরণের ওপর নিবিড় পরীক্ষা চালান। তাঁরা লক্ষ্য করেন, পরমাণুগুলোর মধ্যকার বল যখন বারবার পরিবর্তিত হয়, তখন পুরো সিস্টেমটি তার স্বাভাবিক অবস্থা থেকে দূরে সরে যায়। তবে সবচেয়ে অবাক করার মতো বিষয় ছিল এই যে, কণাগুলো অত্যন্ত উত্তেজিত হওয়া সত্ত্বেও একটি সুশৃঙ্খল বিন্যাস তৈরি করে। এই যুগান্তকারী গবেষণার ফলাফলটি বিখ্যাত বৈজ্ঞানিক সাময়িকী ‘ফিজিক্যাল রিভিউ লেটার্স’ জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে।

হ্যান্স-ক্রিস্টোফ নাগেরলের নেতৃত্বে একদল বিজ্ঞানী এই বিশেষ গবেষণাটি পরিচালনা করেন। তাঁদের সাথে এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত ছিলেন সিএনআরএস এবং ইউনিভার্সিটি প্যারিস-ডাউফাইনের তাত্ত্বিক পদার্থবিদ অ্যালভিসে বাস্টিয়ানেলো। এই গবেষণার মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল ‘ফার্মিয়ন’ নামক এক শ্রেণির কণা, যার অন্যতম উদাহরণ হলো ইলেকট্রন। সাধারণ পরিস্থিতিতে দুটি অভিন্ন ফার্মিয়ন একই সময়ে একই কোয়ান্টাম অবস্থায় অবস্থান করতে পারে না। তবে গবেষকেরা প্রমাণ করেছেন যে, কোয়ান্টাম স্তরে পদার্থের আচরণ সম্পূর্ণ ভিন্ন হতে পারে। অত্যন্ত কম তাপমাত্রায় ঠান্ডা করার পর এই কণাগুলো উপলব্ধ শক্তির অবস্থাগুলোকে একটি নির্দিষ্ট প্যাটার্নে পূরণ করে, যাকে বলা হয় ‘ফারমি সি’। এই অস্বাভাবিক বিন্যাসের কারণে কণাগুলো ভিন্ন ধরনের কোয়ান্টাম আচরণ ও মিথস্ক্রিয়া প্রদর্শন করে। এখানে ‘ফ্র্যাকশনাল’ শব্দটির অর্থ এই নয় যে পরমাণুগুলো টুকরো টুকরো হয়ে ভেঙে গেছে; বরং এটি মূলত এই সিস্টেমে কোয়ান্টাম অবস্থার এক অনন্য বিন্যাসকে নির্দেশ করে।

পরীক্ষাটি করার জন্য গবেষকেরা সিজিয়াম পরমাণুকে একটি নির্দিষ্ট দিকে চালিত করেন। কণাগুলোর মধ্যকার মিথস্ক্রিয়া যখন বারবার শক্তিশালী বিকর্ষণ থেকে আকর্ষণে পরিবর্তিত হয়, তখন সিস্টেমটি কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখায়, তা তাঁরা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেন। সাধারণত এ ধরনের চরম পরিবর্তন হলে কোয়ান্টাম সিস্টেমের পূর্বাভাস দেওয়া অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। তা সত্ত্বেও গবেষকেরা দেখেছেন যে, চরম উত্তেজিত হওয়া সত্ত্বেও ফলাফলটি একটি অনন্য সুবিন্যস্ত প্যাটার্ন বজায় রেখেছে। এই ফলাফলটি ইঙ্গিত দেয় যে, কণাগুলো স্বাভাবিক অবস্থার বাইরে পরিচালিত হলেও তারা অপ্রত্যাশিত ও সুশৃঙ্খল বিন্যাস প্রদর্শন করতে সক্ষম।

গবেষকদের মতে, এই নতুন অবস্থাটি জটিল কোয়ান্টাম সিস্টেমের আচরণ বুঝতে বিজ্ঞানীদের সাহায্য করবে। কণাগুলোর মধ্যকার পারস্পরিক সম্পর্কের এই অস্বাভাবিক প্যাটার্ন গবেষকদের জন্য নতুন তথ্যের উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভবিষ্যতে কোয়ান্টাম সিমুলেটর ব্যবহার করে যে সকল গবেষণা করা হবে, এই আবিষ্কারটি সেখানে গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা প্রদান করতে পারে।