মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে আজ সোমবার দুপুরে পদত্যাগের ঘোষণা দেবেন বলে জানিয়েছেন ইশরাক হোসেন। আজ সকাল সাড়ে আটটার পর নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে তিনি এই ঘোষণাটি প্রদান করেন।
অথচ এর ঠিক আগের রাতে মুক্তকণ্ঠতে তাঁর পদত্যাগের নির্দেশ পাওয়ার খবর প্রকাশিত হলে তা সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছিলেন তিনি। একের পর এক ফেসবুক পোস্ট এবং হোয়াটসঅ্যাপে অডিও বার্তার মাধ্যমে ওই সংবাদটিকে ‘গুজব’ বলে দাবি করেছিলেন ইশরাক হোসেন। শুধু তিনি নন, তাঁর প্রেস কর্মকর্তাও এই সংবাদটিকে অসত্য ও বিভ্রান্তিকর বলে অভিহিত করে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন।
আজ সকাল ৯টা ৮ মিনিটে হোয়াটসঅ্যাপের মিডিয়া গ্রুপে দেওয়া একটি অডিও বার্তায় ইশরাক হোসেন জানান, ‘দুপুর দুইটায় প্রেসক্লাবে, একটি প্রেস কনফারেন্সের মাধ্যমে আমার যে চূড়ান্ত ঘোষণাটি, যেটি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কনভে করেছেন, সেটি আমরা ঘোষণা দেব।’
ঘটনার সূত্রপাত হয় গত শনিবার। রাজধানীর গেন্ডারিয়ায় মাদকবিরোধী অভিযানে অংশ নেন ইশরাক হোসেন, যেখানে তাঁকে আগ্নেয়াস্ত্র উঁচিয়ে থাকতে দেখা যায়। তাঁর সঙ্গে থাকা অন্যান্য ব্যক্তিদের হাতেও অস্ত্র ছিল। এই ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনার ঝড় ওঠে। এই বিষয়টি বিএনপি এবং সরকারের অভ্যন্তরেও যথেষ্ট অস্বস্তি ও অসন্তোষের সৃষ্টি করে।
এরই পরিপ্রেক্ষিতে গতকাল বিকেলে সচিবালয়ে মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষ হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী ইশরাক হোসেনকে ডেকে পাঠান এবং সেখানে তাঁকে পদত্যাগের নির্দেশ দেওয়া হয়।
গতকাল রোববার রাত ১০টার দিকে মুক্তকণ্ঠ অনলাইনে ‘মন্ত্রিসভা থেকে ইশরাককে পদত্যাগের নির্দেশ’ শিরোনামে সংবাদটি প্রকাশিত হয়। এই খবর প্রকাশের মাত্র ২২ মিনিট পর, রাত ১০টা ২২ মিনিটে নিজের হোয়াটসঅ্যাপ মিডিয়া গ্রুপে ইশরাক লেখেন, ‘পদত্যাগের গুজবে কান না দেওয়ার অনুরোধ জানাচ্ছি।’
এর চার মিনিট পর, রাত ১০টা ২৬ মিনিটে তিনি ওই একই গ্রুপে একটি অডিও বার্তা দেন। সেখানে মুক্তকণ্ঠের সংবাদটিকে ‘গুজব’ ও ‘উড়োখবর’ হিসেবে উল্লেখ করে ইশরাক বলেন, ‘দয়া করে সবাইকে অনুরোধ জানাচ্ছি, এই পুরো বিষয়টিকে গুজব হিসেবে ধরবেন। এর কোনো সত্যতা এখনো নেই। এরকম কোনো সিদ্ধান্ত যদি দল থেকে আমরা নেই, তাহলে সেটি অবশ্যই উড়োখবরের মাধ্যমে আসবে না।’
ঠিক দুই মিনিট পর, রাত ১০টা ২৮ মিনিটে ইশরাক হোসেনের প্রেস কর্মকর্তা হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে একটি আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞপ্তি দিয়ে সংবাদের প্রতিবাদ জানান। বিজ্ঞপ্তিতে মুক্তকণ্ঠের খবরটিকে অসত্য ও বিভ্রান্তিকর বলা হয় এবং অবিলম্বে তা প্রত্যাহার না করলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়। পরবর্তীতে এই বিজ্ঞপ্তিটি ইশরাকের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজেও শেয়ার করা হয়।
রাত সাড়ে ১০টার দিকে তাঁর ফেসবুক পেজে আরও একটি বার্তা প্রকাশ করা হয়। সেখানে দাবি করা হয়, ইশরাক হোসেনকে মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগের নির্দেশ দেওয়ার খবরটি সঠিক নয়। সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে তাঁকে পদত্যাগের কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি এবং তাঁর পদত্যাগের কোনো প্রশ্নই ওঠে না। বার্তায় আরও বলা হয়, একটি নির্দিষ্ট মহল রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিল এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টির লক্ষ্যে কাল্পনিক ও মিথ্যা তথ্য ছড়াচ্ছে।
রাত ১০টা ৪০ মিনিটে ইশরাক হোসেন পুনরায় হোয়াটসঅ্যাপ মিডিয়া গ্রুপে সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে অডিও বার্তা দেন এবং জানান যে তিনি প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন।
এই সময়ে গ্রুপের কয়েকজন গণমাধ্যমকর্মী তাঁকে একটি ভিডিও বার্তা দেওয়ার অনুরোধ জানান। এর জবাবে রাত ১০টা ৫১ মিনিটে তাঁর প্রেস কর্মকর্তা লেখেন, ‘দু-একটি গণমাধ্যমের অপসাংবাদিকতার ঘটনায় তিনি ভিডিও বার্তা দিয়ে বক্তব্য প্রদানকে গুরুত্ব মনে করেন না।’ তিনি আরও জানান, এ বিষয়ে কথা বলার প্রয়োজন হলে সরাসরি খোলামেলা কথা বলবেন।
উল্লেখ্য, মুক্তকণ্ঠতে ইশরাক হোসেনের পদত্যাগের নির্দেশ পাওয়ার খবর প্রকাশের পর রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম বাংলাদেশ টেলিভিশনেও (বিটিভি) তা স্ক্রল আকারে প্রচার করা হয়েছিল। এই ঘটনার তীব্র সমালোচনা করে হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে আরেকটি বার্তা দেন ইশরাকের প্রেস কর্মকর্তা।
ওই বার্তায় উল্লেখ করা হয়, কোনো সুনির্দিষ্ট প্রজ্ঞাপন বা চূড়ান্ত সরকারি ঘোষণা ছাড়াই মন্ত্রিসভার একজন প্রতিমন্ত্রীর পদত্যাগের মতো স্পর্শকাতর খবর স্ক্রলে প্রচার করে বিটিভি গুরুতর দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিয়েছে, যা সাংবাদিকতার মৌলিক নীতিমালার পরিপন্থী। বার্তায় আরও বলা হয়, এ ধরনের ভুল তথ্য প্রচারের পর নীরব থাকা এবং আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা না চাওয়ার বিষয়টি গণমাধ্যমটির পেশাদারত্বকে আরও প্রশ্নবিদ্ধ করে।
কিছুক্ষণ পর বিটিভি আগের স্ক্রলটি বন্ধ করে এবং ইশরাক হোসেন পদত্যাগের খবর অস্বীকার করছেন—এমন স্ক্রল প্রচার করতে শুরু করে।