গাড়ি থেকে নেমেই আগ্নেয়াস্ত্র উঁচিয়ে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন চিৎকার করে বললেন, ‘এই ধর ধর ধর...।’ তাঁর পাশ থেকে একজনকে বলতে শোনা গেল, ‘একেবারে গুলি করে দেব।’

রাজধানীর গেন্ডারিয়া রেলস্টেশনসংলগ্ন দয়াগঞ্জ ঘুণ্টিঘর রেলগেট এলাকায় আজ শনিবার বিকেলে এই ঘটনাটি ঘটে। সেই মুহূর্তে প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে থাকা দেহরক্ষীরা কয়েকজনকে ধরার জন্য দৌড়াচ্ছিলেন। প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ অনুযায়ী, তাঁদের মধ্যে একজন দেহরক্ষী এক ব্যক্তিকে লাথি মারেন।

ঘটনার ভিডিও প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনের ফেসবুক পেজে প্রকাশ করা হলে তা দ্রুত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ‘ভাইরাল’ হয় এবং ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। অন্য একটি ভিডিওতে দেখা যায়, আটক ব্যক্তিদের পুলিশের হাতে বুঝিয়ে দেওয়া হচ্ছে। মূল ভিডিওতে প্রতিমন্ত্রীর হাতের পিস্তলটি অস্পষ্ট বা ব্লার করে দেওয়া হলেও কিছু অংশে তা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। এছাড়া ভিডিওতে প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে থাকা আরও দুই ব্যক্তির হাতে আগ্নেয়াস্ত্র লক্ষ্য করা গেছে।

ঘটনাস্থলে প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ছাত্রদলের সাবেক আহ্বায়ক পাভেল শিকদার। তিনি মুক্তকণ্ঠকে জানান, স্থানীয় বাসিন্দাদের পক্ষ থেকে মাদক ব্যবসার বিষয়ে বারবার অভিযোগ পাওয়ার পর বেলা তিনটা থেকে সাড়ে তিনটার দিকে তাঁরা সেখানে যান। পুলিশকেও বিষয়টি জানানো হয়েছিল, তবে পুলিশ পৌঁছাতে দেরি করে বলে তিনি দাবি করেন।

প্রতিমন্ত্রীর ফেসবুক পেজে ভিডিওটির শিরোনাম ছিল, ‘ইশরাকের অ্যাকশন: মাদক আস্তানা গুঁড়িয়ে বিক্রেতাদের পুলিশে সোপর্দ’। সেখানে ঘটনার তারিখ শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬ এবং স্থান হিসেবে গেন্ডারিয়া রেললাইনসংলগ্ন এলাকার কথা উল্লেখ করা হয়। ভিডিওতে দেখা যায়, অস্ত্র হাতে গাড়ি থেকে নামার পর প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে থাকা ব্যক্তিরা রেললাইনের পাশে অবস্থানরত কয়েকজনকে ধরতে এগিয়ে যান। এসময় কয়েকজন যুবককে বলতে শোনা যায়, ‘স্যার আমি কিছু করিনি। আমি গরিব মানুষ স্যার।’ জবাবে প্রতিমন্ত্রী ইশরাক বলেন, ‘পুলিশ আসবে তারপর কথা হবে।’

প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে তাঁর দুই ব্যক্তিগত দেহরক্ষী তোফাজ্জল হোসেন ও লাভলু এবং একজন সরকারি দেহরক্ষী ছিলেন। ব্যক্তিগত দেহরক্ষীদের কাছে অস্ত্র ছিল এবং সরকারি দেহরক্ষীকেও অস্ত্র তাক করতে দেখা যায়। একপর্যায়ে একজন দেহরক্ষী এক তরুণকে লাথি মারলে, সেই ব্যক্তি কে তা জানতে চাওয়া হলে পাভেল শিকদার জানান, তিনি প্রতিমন্ত্রীর সরকারি দেহরক্ষী। তবে সরকারি দেহরক্ষীরা পালাক্রমে দায়িত্ব পালন করায় তাঁর নাম জানাতে পারেননি পাভেল। এছাড়া গুলি করার হুমকি দেওয়া ব্যক্তির পরিচয় নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি, তবে পাভেল শিকদার দাবি করেছেন যে সেখানে কোনো গুলি ছোড়া হয়নি।

এই ঘটনায় বেশ কিছু গুরুতর প্রশ্ন সামনে এসেছে। প্রথমত, প্রতিমন্ত্রীর হাতে থাকা অস্ত্রটি বৈধ কি না। দ্বিতীয়ত, বৈধ হলেও একজন মন্ত্রী কি এভাবে অস্ত্র প্রদর্শন করে মাদকবিরোধী অভিযান চালাতে পারেন? তৃতীয়ত, মন্ত্রীদের এভাবে অভিযানে নামতে হলে পুলিশের ভূমিকা কী থাকে? এবং চতুর্থত, প্রশাসনিক ব্যবস্থা বা সিস্টেম ঠিক না করে প্রতিমন্ত্রীর এমন অভিযান কতটা গ্রহণযোগ্য?

এই বিষয়ে মুক্তকণ্ঠকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন দাবি করেন, তাঁর হাতে থাকা অস্ত্রটি বৈধ। উল্লেখ্য, ঢাকা-৬ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার সময় রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে জমা দেওয়া হলফনামায় তিনি আগ্নেয়াস্ত্রের কথা উল্লেখ করেননি। এই বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী জানান, তিনি ২০২৫ সালের ১১ ডিসেম্বর শরিফ ওসমান হাদীকে গুলি করার পর অস্ত্রটি নিয়েছেন। যেহেতু তিনি ২৮ ডিসেম্বর (২০২৫) মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন এবং জমার শেষ দিন ছিল ২৯ ডিসেম্বর, তাই তখন মনোনয়ন পত্রে এটি দেখানোর সুযোগ ছিল না।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ২০২৫ সালের নীতিমালার ২৫ অনুচ্ছেদের ‘ক’ উপ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘কোন ব্যক্তি স্বীয় লাইসেন্সে অন্তর্ভুক্ত অস্ত্র আত্মরক্ষার নিমিত্ত নিজে বহন/ব্যবহার করতে পারবেন। তবে অন্যের ভীতি/বিরক্তি উদ্রেক করতে পারে এভাবে অস্ত্র প্রদর্শন করা যাবে না।’

বিষয়টি ব্যাখ্যা করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, তিনি একজন জনপ্রতিনিধি এবং গেন্ডারিয়ার রেলস্টেশনসংলগ্ন দয়াগঞ্জ ঘুণ্টিঘর এলাকাটি তাঁর সংসদীয় আসনের অন্তর্ভুক্ত। সেখানে মাদক ব্যবসার বিষয়ে স্থানীয়দের অভিযোগের কথা জানিয়ে তিনি বলেন, তিনি পুলিশকে বিষয়টি জানিয়েছিলেন কিন্তু কোনো কাজ হয়নি, তাই বাধ্য হয়ে তিনি সেখানে যান। পুলিশের অকার্যকারিতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, পুলিশের কোনো কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি। আমি অন্ততপক্ষে ৩০-৪০ বার পুলিশের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। তারা একেক সময় একেক কথা বলে। তাদের জনবল কম, গাড়ি নেই—এসব কথা বলে। এর আগে সেখানে অভিযান চালাতে গিয়ে কয়েকজন পুলিশ গুলিবিদ্ধ হয়েছে।

তিনি আরও দাবি করেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর পুলিশ এখনো ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি এবং মাদক ব্যবসায়ীরা দূর থেকে গুলি করে দেয়, সে কারণে তাঁর হাতে অস্ত্র ছিল। তিনি বলেন, ‘আমি তো আর গুলি করি নাই, ওটা নিয়ে কাউকে ভয়ও দেখাই নাই। হ্যাঁ, অভিযান আমরা করেছি, আমরা সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলছি।’ যদিও ভিডিওতে দেখা গেছে প্রতিমন্ত্রী অস্ত্র তাক করে আছেন এবং সেখানে শিশুদের উপস্থিতিও ছিল।

প্রতিমন্ত্রীর নির্দেশনার পরও পুলিশ কেন ব্যবস্থা নেয় না, এ প্রশ্নে গেন্ডারিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনিরুজ্জামান জানান, ১১ অক্টোবর তাঁরা ডিবি ও এসআরবি সদস্যদের নিয়ে ৩০০ পুলিশের একটি দল দিয়ে অভিযান চালিয়েছেন। প্রতিমন্ত্রীর অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে সব সময় যোগাযোগ হয় এবং তাঁরা অভিযান ও ফলাফলের বিষয়ে সব সময় জানান।

প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনকে প্রায়ই পরিচ্ছন্নতা ও দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণসহ বিভিন্ন অভিযানে অংশ নিতে এবং ফেসবুকে ভিডিও পোস্ট করতে দেখা যায়। তাঁর পেজের অনুসারী সংখ্যা ৪০ লাখ। তবে শনিবারের এই মাদকবিরোধী অভিযানের ভিডিওটি তাঁর পেজ থেকে সরিয়ে ফেলা হয়েছে।

পুরো বিষয়টি নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শরীফ ভূঁইয়া মুক্তকণ্ঠকে বলেন, সরকার ও মন্ত্রীদের কাজ হলো নির্দেশ দেওয়া। পুলিশ ব্যবস্থা নেবে। মন্ত্রীকেই যদি অস্ত্র হাতে অভিযানে নামতে হয়, তাহলে পুলিশের কাজ কী? তিনি আরও বলেন, একজন মন্ত্রী যেভাবে অস্ত্র প্রদর্শন করেছেন, তা বেআইনি।