সাইকেলের সামনের খাঁচায় এবং পেছনের ক্যারিয়ারে সাজানো রয়েছে বিভিন্ন সংবাদপত্র। সেই সাইকেল নিয়ে দ্রুত ছুটছেন একজন হকার। ঠিক তার পাশেই পত্রিকার পসরা সাজিয়ে বসে আছেন এক দোকানি। সেখানে নানা বয়সী আগ্রহী পাঠকদের ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। তাঁরা আসছেন, দেখছেন এবং পছন্দের পত্রিকা থেকে সঠিক ও নির্ভুল সংবাদ খুঁজে নিচ্ছেন।

ডিজিটাল যুগের এই সময়ে ছাপা পত্রিকার গুরুত্বকে এভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে চট্টগ্রাম নগরের একটি দুর্গাপূজা মণ্ডপে। ‘যুগান্তরের বার্তা বহন’ থিমের ওপর ভিত্তি করে এবারের পূজার আয়োজন সাজিয়েছে নগরের পতেঙ্গার কাঠগড় মোড় এলাকার পতেঙ্গা শ্যামা সংঘ। এই ব্যতিক্রমী আয়োজনটি দেখতে পুণ্যার্থীদের পাশাপাশি সাধারণ দর্শনার্থীদেরও ব্যাপক ভিড় জমেছে মণ্ডপে।

পতেঙ্গা শ্যামা সংঘের সভাপতি পিকলু দেব মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘এবারের শারদ উৎসবে “যুগান্তরের বার্তা বহন” শিরোনামে আমরা যে থিম করেছি, তাতে আমাদের মূল প্রতিপাদ্য বার্তা হারিয়ে যায়, বাহনের ইতিহাস থেকে যায়।’

সরেজমিনে দেখা যায়, মন্দিরের প্রধান ফটকে একটি ব্যানার টানানো হয়েছে, যেখানে লেখা রয়েছে ‘যুগান্তরের বার্তা বহন’। ভেতরে প্রবেশ করলেই নারী ও পুরুষের জন্য আলাদা সারির ব্যবস্থা করা হয়েছে।

মূল ফটক পেরিয়ে দ্বিতীয় ফটকে সবকিছুই পত্রিকা দিয়ে সাজানো। ফটকের এক পাশে লেখা রয়েছে, ‘গন্তব্য, কবুতর, আকাশ, দূরত্ব, মুদ্রণযন্ত্র, কাগজ, বহু পাঠক, সংবাদপত্র, হকার ও মানুষের দরজা।’ অপর পাশে বিভিন্ন পাঠকের পত্রিকা পড়ার ছবি প্রদর্শিত হয়েছে এবং ওপরে শিরোনাম দেওয়া হয়েছে, ‘যুগান্তরের বার্তা বহন’।

দ্বিতীয় ফটক দিয়ে ভেতরে ঢুকতেই মন্দিরের প্যান্ডেলে দেশের বিভিন্ন প্রচারিত সংবাদপত্র দিয়ে সাজসজ্জা করা হয়েছে। পুরোনো সংবাদপত্রের ওপর আঁকা হয়েছে গ্রাফিতি। প্রবেশপথেই এক দোকানি তাঁর দোকানে বিভিন্ন পত্রিকা সাজিয়ে রেখেছেন; তিনি আগ্রহী পাঠকদের কাছে পত্রিকা বিক্রি করছেন এবং নিজেও পত্রিকা পড়ছেন।

মন্দিরের ঠিক যেখানে দুর্গাপ্রতিমা স্থাপন করা হয়েছে, তার সামনেই একজন হকার সাইকেল ধরে দাঁড়িয়ে আছেন। একজন বাস্তব হকারের মতোই তাঁর সাইকেলের সামনের খাঁচায় নানা পত্রিকা রাখা হয়েছে এবং পেছনে বাঁধা রয়েছে আরও এক বান্ডিল সংবাদপত্র।

প্যান্ডেলের দেয়ালে থাকা কাপড়ে বিভিন্ন বাণী লেখা রয়েছে। কোথাও লেখা হয়েছে, ‘খবরের পথ বদলেছে বদলেছে তার বাহন, মানুষের হাতে আজও চলে যুগান্তরের বার্তা বহন’, আবার কোথাও লেখা, ‘কালির অক্ষর কাগজ পেল ছাপা হলো খবর, এক পাতাতেই ছড়িয়ে গেল কত মুহূর্তের খবর’।

আয়োজকেরা জানিয়েছেন, সময়ের সাথে সাথে পত্রিকার নানা বিবর্তন ঘটেছে। তবে এখনো মানুষের কাছে পত্রিকা পৌঁছে দেওয়ার কাজটি করেন হকারেরা; তাঁদের সেই চিরাচরিত চিত্রটি এখনো বদলায়নি। তাঁরা কীভাবে মানুষের কাছে খবর পৌঁছে দিতেন এবং মানুষ সেই খবরের ওপর বিশ্বাস করে কীভাবে সামনের দিকে এগিয়ে যেতেন, সেই বিষয়টিই এই মণ্ডপে চিত্রে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।

আয়োজকদের মতে, আগে মানুষের কানে কানে খবর পৌঁছাত, এরপর এল ছাপা কাগজের যুগ এবং বর্তমানে আমরা ডিজিটাল মিডিয়ার যুগে বাস করছি। তবে তথ্য কিংবা খবরের ধরন এবং উপস্থাপনা বদলে গেলেও বর্তমানে প্রচুর অপতথ্য ও ভুল তথ্য ছড়িয়ে পড়ছে। এমন বিভ্রান্তিকর তথ্যের ভিড়ে সঠিক সংবাদ পাওয়ার জন্য মানুষকে পুনরায় পত্রিকা পড়তে হবে। সঠিক গণমাধ্যম চিহ্নিত করে সঠিক তথ্য গ্রহণ করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কানকথা বা ছড়িয়ে পড়া গুজবে বিশ্বাস না করে নিজে পড়ে-শুনে সত্য যাচাই করার বার্তা দিতে চেয়েছেন তাঁরা।

মন্দির পরিক্রমায় মণ্ডপে আসা শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সুরজিৎ চৌধুরী মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘থিমটি দেখে আমার ভালো লেগেছে। আমাদের যুবসমাজের জন্য একটা বার্তা এখানে দেওয়া হয়েছে। এখানকার থিমটা যুবসমাজকে সঠিক তথ্য গ্রহণে অনুপ্রাণিত করবে।’

পতেঙ্গা শ্যামা সংঘের সহসাধারণ সম্পাদক অনিক চৌধুরী মুক্তকণ্ঠকে বলেন, মানুষ এখন পড়াশোনা থেকে পিছিয়ে যাচ্ছেন। তার ধারাবাহিকতায় এখন মানুষ পত্রিকা কম পড়ছেন এবং ডিজিটাল মিডিয়ার প্রতি বেশি আকৃষ্ট হচ্ছেন। ডিজিটাল মিডিয়ায় প্রচারিত সব তথ্য সব সময় সত্য হয় না, সেটি যাচাই করতে হলে পত্রিকার পাতায় চোখ রাখতে হয়। এ শিল্পটি যেন হারিয়ে না যায় এবং মানুষ যেন সঠিক তথ্য খোঁজার জন্য পত্রিকার পাতা উল্টায়, সে জন্য তারা মূলত একটা মেসেজ দিতে চেয়েছেন সমাজকে।

অনিক চৌধুরী আরও বলেন, কবুতরের ডানায় বার্তা বহন থেকে শুরু করে ঢোলের শব্দ, রানারের ছুটে চলা, সাইকেলের গতি পেরিয়ে আজকের পেপারওয়ালা—সংবাদ পৌঁছে দেওয়ার এই ধারাবাহিক যাত্রায় সময়ের বিবর্তন, যোগাযোগের পরিবর্তন এবং যুগে যুগে নীরবে দায়িত্ব পালন করে যাওয়া বার্তাবাহকদের অবদান তুলে ধরতে চেয়েছেন তাঁরা। তাঁর মতে, এই আয়োজন কেবল একটি শিল্পনির্মাণ নয়; এটি ইতিহাসের প্রতি শ্রদ্ধা, ঐতিহ্যের প্রতি ভালোবাসা এবং সেই সব নীরব বার্তাবাহকের নিরলস শ্রম ও আত্মত্যাগের প্রতি এক আন্তরিক শ্রদ্ধার্ঘ্য।