মানুষের মন এক অদ্ভুত রণক্ষেত্র। একদিকে আলো পাওয়ার আকুলতা, অন্যদিকে মনের গভীরে লুকিয়ে থাকা ষড় রিপুর অন্ধকার। এই চিরন্তন দ্বান্দিক সত্যকে ধারণ করে চট্টগ্রামে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে উত্তর কাট্টলীর তালুকদার বাড়ি। বাণী মন্দির প্রাঙ্গণে এ বছর অনুষ্ঠিত হচ্ছে তাদের ঐতিহ্যবাহী ৫৮তম দুর্গোৎসব। এবারের পূজায় তাদের আকর্ষণীয় ও মননশীল থিম ‘রিপু রজনি’।

এই থিমের পেছনের ভাবনা সম্পর্কে পূজা কমিটির প্রচার সম্পাদক অর্নব দাশ মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ ও মাৎসর্য মানবজীবনের এই ছয় রিপু বা প্রবৃত্তি মানুষের আত্মাকে প্রতিনিয়ত অন্ধকারের দিকে টেনে নিয়ে যায়।” আয়োজক কর্তৃপক্ষের ভাষ্যমতে, মানুষের মনের ভেতরের এই অন্ধকার, রিপুর সঙ্গে লাগাতার যুদ্ধ এবং পরিশেষে দেবী দুর্গার দিব্য সান্নিধ্য লাভের আকুল আবেদন ফুটিয়ে তোলা হয়েছে এই থিমে। এটি কেবল একটি মণ্ডপসজ্জা নয় বরং আত্মশুদ্ধির এক প্রতীকী বার্তা।

একটি থিমকে সফল করে তুলতে প্রয়োজন হয় নিখুঁত পরিকল্পনা ও শিল্পিত হাতের ছোঁয়া। ‘রিপু রজনি’ ফুটিয়ে তুলতে যুক্ত হয়েছেন একদল প্রতিভাবান শিল্পী। রিপু রজনীর মণ্ডপ সাজসজ্জা করেছেন অপটিমিষ্ট দে, প্রতিমা শিল্পী কার্তিক পাল এবং আলোকসজ্জার দায়িত্বে ছিলেন কৈলাশ লাইটিং। এতে গ্লাস ও ফয়েল শিটের পাশাপাশি ঝাড়বাতি ব্যবহার করা হয়েছে। কৈলাশ লাইটিংয়ের জাদুকরী আলোকসজ্জা পুরো থিমটিকে এক রহস্যময় ও গভীর আবহ প্রদান করে দর্শনার্থীদের মোহিত করছে।

চট্টগ্রামের এই পূজাকে কেন্দ্র করে ব্যাপক উৎসাহ তৈরি হয়েছে। রীতিমতো কয়েক কিলোমিটার এলাকা জুড়ে লাইন ধরে এই পূজা দেখছে মানুষ। শনিবার রাতের পরিস্থিতি তুলে ধরে উত্তর কাট্টলির বাসিন্দা জুয়েল শীল মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “রাতের ১২টা বাজেও তিন কিলোমিটার ধরে লম্বা লাইন। হাজার দর্শনার্থী সমাগম সামাল দিতে স্বেচ্ছাসেবকদের হাঁসফাঁস অবস্থা হয়েছে। আমাদের ভাইদের কষ্ট শেষ নাই। তার মধ্যে চাঁদা তুলতে পারছি না। দিন শেষে এত মানুষের সমাগম ভালো লাগছে।”

উত্তর কাট্টলী তালুকদার বাড়ির (বাণী মন্দির) এবারের আয়োজন কেবল চোখ জোড়ানো নান্দনিকতায় সীমাবদ্ধ নয়, এটি মানুষের মানসিক ও আধ্যাত্মিক যাত্রার এক শৈল্পিক প্রকাশ। যারা গতানুগতিকতার বাইরে গিয়ে চিন্তা-চেতনার খোরাক খোঁজেন, তাদের জন্য এটি হতে পারে দুর্গোৎসবের অন্যতম সেরা গন্তব্য।

এর পাশেই বড় কালী বাড়িতে এবার নতুন সংযোজন অঘোরী নৃত্য। অবিশ্বর থিমে এই পূজাতে টাঙ্গাইল থেকে আনা হয়েছে অঘোরীদের। শিবের ভক্ত অঘোরীদের নাচকে কেন্দ্র করেও একধরণের উন্মাদনা সৃষ্টি হয়েছে। ‘অবিনশ্বর’ শব্দটির আক্ষরিক অর্থ হলো যা কখনো ধ্বংস বা ক্ষয় হয় না, অর্থাৎ যা অবিনাশী ও শাশ্বত। জন্ম-মৃত্যুর আবর্তে মানুষের জীবন ক্ষণস্থায়ী হলেও আত্মা, প্রকৃতি এবং পরম সত্য চিরন্তন। এই থিমের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করা হয়েছে যে, জীবনের সুখ-দুঃখের ওঠানামা কিংবা মহাবিশ্বের সৃষ্টি আর ধ্বংসের এই নিয়মই প্রকৃতির শাশ্বত রূপ। দর্শনার্থীরা এই মণ্ডপে প্রবেশ করে কেবল বাহ্যিক জাঁকজমকই নয়, বরং জীবন ও জগতের এক গভীর দার্শনিক সত্যের মুখোমুখি হন। এই আকর্ষণীয় মণ্ডপটির থিম ও পরিকল্পনা নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন শিল্পী তন্ময় দাশ।

তবে এই উন্মাদনাকে অনেকে আবার শঙ্কার কারণ হিসেবেও দেখছেন। দর্শনার্থী বিদ্যুৎ চন্দ্র দাস বলেন, “এরমধ্যে কলকাতায় চাপের মুখে পদতলে হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। উত্তর কাট্টলির বড় কালী মন্দির অবিনশ্বর তাণ্ডব নৃত্য ও তালুকদার বাড়ির রিপু রজনীকে ঘিরে দর্শনার্থী চাপ বেশি। কৃপা করে ধীরে আস্তে দর্শন করুন। তাড়াহুড়ো দরকার নাই। সংশ্লিষ্টদের সতর্কতার দরকার আছে।” গতরাতে দর্শনার্থীদের চাপে তাদের নির্ধারিত সময়ের আগে দর্শন বন্ধ করতে হয়েছে।

সীমান্ত দাস গুপ্ত নামে একজন ফেসবুকে তার আইডিতে লিখেছেন, “দর্শন হলো না, অতিরিক্ত জ্যামের কারণে আকবরশাহ থেকে ফেরত আসলাম। যারা এই পূজাতে যাবেন, হাতে সময় নিয়ে যাবেন, বৃদ্ধ কিংবা শিশুদের নিয়ে যাওয়াটা বোকামি হবে। যে কোনো ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, তাই মানসিক ও শারীরিকভাবে ফিট থাকতে হবে।” পূজা কমিটির প্রতি তিনি অনুরোধ জানান, “আপনারা চট্টগ্রামকে বিশ্বের দরবারে নতুনমাত্রাই উপস্থাপন করেছেন, আপনাদের আয়োজন সত্যিই অনবদ্য, ভূয়সী প্রশংসনীয়। তবে দর্শনার্থীর নিরাপত্তাই যেন মুখ্য বিষয় হয়। লক্ষাধিক ভক্তের ঢল সামলানো সত্যিই কষ্টের। তবে যে কোনো কিছুর বিনিময়ে মায়ের কৃপায় তা আপনাদের পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। আমাদের এই আনন্দময় সময়টি যেন বেদনার না হয়ে যায়।”

চট্টগ্রাম মহানগরীতে প্রায় ২ হাজার ৬০০টি পূজামণ্ডপ রয়েছে। সব মিলিয়ে চট্টগ্রামের পূজায় এবার ভিন্ন আবহ। এর মধ্যে চট্টগ্রামের জেএম সেন হলে প্রধানমন্ত্রীর পূজা দেখতে আসাকে কেন্দ্র করে সেটি এক ভিন্ন মাত্রা পেয়েছে। ২০ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চট্টগ্রামে জেএম সেন হল পূজামণ্ডপ পরিদর্শন করবেন।

প্রশাসনের পক্ষ থেকে চট্টগ্রাম মহানগরীর পূজামণ্ডপগুলোতে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। নিয়মিত টহল, গোয়েন্দা নজরদারি ও বিশেষ স্ট্রাইকিং ফোর্স প্রস্তুত রাখা হয়েছে। পাশাপাশি গুজব ও অপপ্রচার ঠেকাতে সাইবার মনিটরিংও চালানো হচ্ছে।

এসআরবি-৭-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. মোস্তাফিজুর রহমান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “২০ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চট্টগ্রামে জেএম সেন হল পূজামণ্ডপ পরিদর্শন করবেন। প্রধানমন্ত্রীর আগমন চট্টগ্রামবাসীর জন্য গর্বের বিষয়। তার সফর ঘিরে নির্ধারিত নিরাপত্তা প্রটোকল অনুসরণ করে স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্সের (এসএসএফ) নির্দেশনা ও সমন্বয়ে অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা-ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।”