রাজধানীর বুকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) বর্জ্যবাহী গাড়িগুলো বর্তমানে অনিয়ন্ত্রিত ঘাতক যানে পরিণত হয়েছে, যা একই সাথে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির এক ভয়াবহ প্রতীকে রূপ নিয়েছে। শহরের পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করার কথা থাকলেও এই যানগুলোর কারণে প্রাণ হারাচ্ছেন সাধারণ মানুষ। ২০১৭ সাল থেকে এ পর্যন্ত বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থীসহ অন্তত ১৮ জন ব্যক্তি এই ময়লার গাড়ির নিচে চাপা পড়ে মৃত্যুবরণ করেছেন। শিক্ষার্থীদের মৃত্যুর পর ব্যাপক আন্দোলন হয়েছিল, তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল এবং দু-একজন চালককে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করার নাটক সাজানো হলেও বাস্তবে এই প্রাতিষ্ঠানিক অরাজকতার কোনো স্থায়ী সমাধান করা সম্ভব হয়নি।
এই প্রাণহানির পেছনে রয়েছে চরম অপরাধমূলক অবহেলা এবং অনৈতিক কিছু চর্চা। নথিপত্রে যাদের স্থায়ী চালক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে এবং যারা নিয়মিত সরকারি বেতন পাচ্ছেন, তারা অলস সময় কাটালেও রাজপথে ভারী গাড়ি চালানোর দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে লাইসেন্সহীন বহিরাগত অথবা অনভিজ্ঞ সহকারীদের হাতে। সম্প্রতি সায়েদাবাদের একটি ফিলিং স্টেশনে রাতে সরেজমিনে দেখা গেছে, একটি ভারী ময়লার গাড়ির স্টিয়ারিং ধরে আছেন একজন চুক্তিভিত্তিক সহকারী, যার মাসিক বেতন মাত্র ১০ হাজার টাকা এবং কোনো বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্স নেই। অন্যদিকে, ওই গাড়ির নির্ধারিত মূল চালক তখন মোড়ের আড্ডায় ব্যস্ত। অনুসন্ধানে জানা গেছে, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের অন্তত ৫৬টি গাড়ি নিয়মিতভাবে এই ধরনের বহিরাগত প্রক্সি চালকদের মাধ্যমে চালানো হচ্ছে।
মৃত্যুর এই মিছিলের পাশাপাশি নীরবে বিস্তার লাভ করেছে বর্জ্য পরিবহনের জ্বালানি চুরির এক সুসংগঠিত সিন্ডিকেট। প্রতিটি ট্রিপের জন্য প্রয়োজনের চেয়ে তিন থেকে চার লিটার অতিরিক্ত ডিজেল বরাদ্দ করিয়ে নেওয়া হয় এবং সেই তেল পাম্পে রেখেই কম দামে কালোবাজারে বিক্রি করে দেওয়া হয়। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, এই অবৈধ প্রক্রিয়ায় প্রতি মাসে প্রায় সাড়ে ১৭ হাজার লিটার তেল চুরি হচ্ছে, যার বাজারমূল্য প্রায় ২৪ লাখ টাকা। হিসাব করলে দেখা যায়, বছরে প্রায় পৌনে তিন কোটি টাকার সরকারি অর্থ অসাধু চালক, পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের প্রভাবশালী নেতা এবং সংশ্লিষ্ট তদারকি কর্মকর্তাদের পকেটে যাচ্ছে।
যেকোনো দুর্ঘটনার পর কেবল চুক্তিভিত্তিক প্রক্সি চালককে বলির পাঁঠা বানিয়ে সিটি করপোরেশনের দায় এড়ানোর কোনো সুযোগ থাকা উচিত নয়। জনবলসংকট কিংবা দীর্ঘ ডিউটির অজুহাতে এই অপরাধকে কোনোভাবেই আড়াল করা যাবে না। বরাদ্দপ্রাপ্ত স্থায়ী চালকদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে অবিলম্বে স্মার্ট ট্র্যাকিং এবং ডিজিটাল বায়োমেট্রিক ব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে অনুমোদনহীন চালকদের হাতে গাড়ি তুলে দেওয়া মূল চালক, তেল চুরির এই সিন্ডিকেট এবং এতে মদদদাতা শ্রমিকনেতা ও অসাধু কর্মকর্তাদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। রাজপথকে রক্তে রঞ্জিত করার এই প্রাতিষ্ঠানিক নৈরাজ্য আর এক মুহূর্তও মেনে নেওয়া সম্ভব নয়।