স্মৃতির পাতায় জমে থাকা কিছু মুহূর্ত মানুষকে বারবার অতীতে ফিরিয়ে নিয়ে যায়। ঠিক তেমনি এক বিষণ্ণ ও আবেগময় স্মৃতিচারিতার কথা উঠে এসেছে এক কাব্যিক বয়ানে, যেখানে একটি জবাগাছ আর একটি পুরনো ঘর হয়ে উঠেছে শৈশব ও কৈশোরের ভালোবাসার সাক্ষী। সেই স্মৃতিগুলো যেন পৃথিবীর কোনো এক অজানা প্রান্তে আজও অমলিন হয়ে রয়ে গেছে।

ঘটনাটি ছিল অনেক বছর আগের, যখন জীবন ছিল সহজ আর মন ছিল আবেগে ভরপুর। সেই সময়েই জবাগাছের নিচে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে গড়ে উঠেছিল এক গোপন দরবার। সেটি ছিল বাল্যবেলার সেই বিশেষ সময়, যখন হৃদয়ে প্রথম প্রেমানুভূতির স্পন্দন জাগে। সেই আবেগের আতিশয্যে সাদা কাগজে কালো কালির অক্ষরে লেখা হয়েছিল কিছু কথা, যার প্রতিটি চিহ্নের গভীরে মিশে ছিল লাল রক্তের মতো তীব্র আবেগ ও অনুভূতি। তবে সেই ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ সবসময় সুখকর ছিল না; বিনিময়ে এসেছিল প্রত্যাঘাতের বেদনা।

দীর্ঘ বছর ধরে সেই জবাগাছটি এবং তাদের ঘরটি একে অপরের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ছিল, যেন তারা নীরব সাক্ষী হয়ে দেখছিল দুটি হৃদয়ের টানাপোড়েন। প্রতি বছর নির্দিষ্ট সেই তারিখে লেখক জবাগাছটির ডাল ধরে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতেন। চারপাশের স্তব্ধ গ্রাম, যেখানে যেন সময় থমকে দাঁড়িয়ে থাকে। সেই নিস্তব্ধতার মাঝে যখনই পাতা ঝরার শব্দে মৌনতা ভেঙে যেত, তখনই তিনি ফিরে আসতেন। তবে ফেরার পথে বারবার দৃষ্টি যেত সেই জবাগাছটির দিকে। মনে হতো, জবা ফুলের সম্ভাবনা আর তার ঘ্রাণের টানে আবারও ফিরে যাওয়া সম্ভব।

কিন্তু সময়ের নিষ্ঠুর স্রোতে সব কিছু বদলে যায়। আজ অনেক বছর পার হয়ে গেছে। সেই স্মৃতিবিজড়িত জবাগাছ কিংবা সেই পুরনো ঘর—কোনোটিই আর অস্তিত্বে নেই। সব মিলিয়ে এটি একটি হারানো সময়ের গল্প, যেখানে জবাগাছটি ছিল কেবল একটি উদ্ভিদ নয়, বরং এক বুক দীর্ঘশ্বাস আর অপূর্ণ প্রেমের প্রতীক।

কবিতার ভাষায় এই স্মৃতিগুলো এভাবে ফুটে উঠেছে:

“জবাগাছের নিচে আমাদের মুখোমুখি দরবারের

একটা স্মৃতি পৃথিবীর কোথাও রয়ে গেছে

তখন আমাদের বাল্য বয়স

তখন আমাদের প্রেমানুভূতির সময়

আমি তোমাকে দিয়েছিলাম

সাদা কাগজে কালো কালির চিহ্নসকল

যার প্রতিটিতে মিশে ছিল লাল রক্তের দাগ

তুমি আমাকে দিয়েছিলে প্রত্যাঘাত

তারপরেও অনেক বছর সেই জবাগাছটি

আর আমাদের ঘরটি মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ছিল

আমি প্রতিবছর সেই তারিখে জবাগাছটি ধরে

খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতাম

পৃথিবীর থেমে থাকা গ্রামের স্তব্ধতা সামনে নিয়ে

পাতা ঝরার শব্দ শুনে মৌনতা ভেঙে গেলে ফিরে আসতাম

আর ফিরে ফিরে তাকাতাম জবাগাছের দিকে

যেন জবা ফুলের সম্ভাবনায়

ঘ্রাণের ডাকে ফিরতে চাইতাম ফের

সেও আজ অনেক বছর হলো

অনেক বছর হলো জবাগাছ, আমাদের ঘর

কোনোটিই আর নেই”