ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের দাবি, সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলীয় নাজরান এলাকার নিকটবর্তী স্থানে তারা দেশটির সামরিক বাহিনীর একটি অ্যাপাচি হেলিকপ্টার ভূপাতিত করেছে। সৌদি আরবের পক্ষ থেকেও এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে নাজরান অঞ্চলে তাদের একটি হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হওয়ার খবর নিশ্চিত করা হয়েছে। এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় হেলিকপ্টারটির দুই ক্রু নিহত হয়েছেন।

ইয়েমেনে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের মুখপাত্র মেজর জেনারেল তুর্কি আল-মালিকি আজ রোববার এক বিবৃতিতে জানান, ‘কারিগরি ত্রুটি’র কারণে একটি এএইচ-৬আই গোয়েন্দা হেলিকপ্টার নাজরান অঞ্চলে বিধ্বস্ত হয়েছে। এতে হেলিকপ্টারটির দুই ক্রু নিহত হয়েছেন। হেলিকপ্টারটি সৌদি ন্যাশনাল গার্ড মন্ত্রণালয়ের অধীন একটি এলাকায় বিধ্বস্ত হয়।

অন্যদিকে, হুতিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি সম্পূর্ণ ভিন্ন দাবি করেছেন। তিনি বলেছেন, সৌদি-ইয়েমেন সীমান্তে হুতিদের অবস্থান লক্ষ্য করে ‘শত্রুতামূলক অভিযান’ চালানোর সময় হুতি বাহিনী ওই হেলিকপ্টার ভূপাতিত করেছে। উল্লেখ্য, এর আগে গত মাসেও সৌদি আরবের একটি এফ-১৫ যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করার দাবি জানিয়েছিল হুতিরা।

সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে সৌদি আরবের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নাজরান এলাকায় ইরান-সমর্থিত হুতিদের হামলার প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে। গত জুলাই মাস থেকে সৌদি আরব ও হুতিদের মধ্যে নতুন করে লড়াই শুরু হয়। তারপর থেকেই হুতিরা দেশটির বিভিন্ন বিমানবন্দর এবং জ্বালানি অবকাঠামোসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা লক্ষ্য করে নিয়মিত হামলা চালিয়ে আসছে। উভয় পক্ষের মধ্যে এই পাল্টাপাল্টি সংঘাত তীব্র হওয়ার ফলে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার চলমান লড়াইয়ে ইয়েমেন এখন আরেকটি রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে।

হুতিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি গতকাল শনিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে বলেন, নাজরানের কাছে একটি সৌদি অ্যাপাচি হেলিকপ্টার ভূপাতিত করেছে হুতিরা। তাঁর দাবি, সীমান্ত এলাকায় হুতিদের অবস্থান লক্ষ্য করে ‘শত্রুতামূলক কর্মকাণ্ড’ চালানোর সময় হেলিকপ্টারটি ভূপাতিত করা হয়।

সারির এই পোস্টের জবাবে আজ ভোরে আল-মালিকি বেশ কয়েকটি অ্যাপাচি হেলিকপ্টার সারিবদ্ধ অবস্থায় থাকা একটি ছবি পোস্ট করেন। তিনি সেখানে লেখেন, ‘আপনারা দাবি করছেন, এটি ভূপাতিত করেছেন। কিন্তু এটি শিগগিরই যুদ্ধক্ষেত্রে ফিরবে।’

আল-মালিকি তাঁর পোস্টে আরও উল্লেখ করেন, ‘আপনারা দাবি করছেন, হেলিকপ্টারটি ভূপাতিত করেছেন। কিন্তু শিগগিরই যুদ্ধক্ষেত্রে ফিরবে এটি।’ এছাড়া তিনি দাবি করেন, হুতিদের ছোড়া দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তারা আকাশেই ধ্বংস করতে সক্ষম হয়েছে। ক্ষেপণাস্ত্র দুটি সৌদি আরবের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় খামিস মুশাইত শহর লক্ষ্য করে ছোড়া হয়েছিল বলে জানা গেছে।

এই ঘটনার কিছু আগে সৌদি আরবের সিভিল ডিফেন্স আগাম সতর্কতা ব্যবস্থার মাধ্যমে রাজধানী রিয়াদ এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় আবহা ও খামিস মুশাইত শহরে ‘সম্ভাব্য বিপদ’ সম্পর্কে সতর্কবার্তা জারি করেছিল। তবে পরবর্তীতে সংস্থাটি জানায়, বিপদের আশঙ্কা কেটে গেছে।

গতকাল আল-মালিকি জানিয়েছিলেন, জোট বাহিনী মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে রিয়াদ অঞ্চল, পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশ ও সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলে চারটি ড্রোন ধ্বংস করেছে। সৌদি জোটের পক্ষ থেকে একটি ভিডিও ফুটেজও প্রকাশ করা হয়েছে। ওই ভিডিওতে দাবি করা হয়েছে, উত্তর ইয়েমেনের সাদায় দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণকেন্দ্রে বিমান হামলা চালিয়ে সেগুলো ধ্বংস করা হয়েছে। ওই উৎক্ষেপণকেন্দ্রগুলো থেকেই সৌদি আরবের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হচ্ছিল।

হুতিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি পুনরায় উল্লেখ করেছেন যে, সৌদি-ইয়েমেন সীমান্তে হুতিদের অবস্থান লক্ষ্য করে ‘শত্রুতামূলক অভিযান’ চালানোর সময় ওই হেলিকপ্টার ভূপাতিত করা হয়েছে।

সাম্প্রতিক এই ঘটনাপ্রবাহ সংঘাত আরও তীব্র হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। ২০২২ সালে কার্যকর হওয়া একটি যুদ্ধবিরতি ভেঙে যাওয়ার পর গত জুলাই থেকে দুই পক্ষের লড়াই চরম আকার ধারণ করেছে। ২০১৪ সালে হুতিরা রাজধানী সানা ও আরও কয়েকটি প্রদেশ দখল করে নেওয়ার পর থেকে ইয়েমেনে সংঘাত চলছে। ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে সমর্থন দিতে ২০১৫ সালের মার্চে সৌদি আরবের নেতৃত্বে একটি সামরিক জোট দেশটিতে অভিযান শুরু করে।

বর্তমানে হুতিরা সানা ও ইয়েমেনের আরও কয়েকটি এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে। এদিকে, সৌদি ভূখণ্ডে হুতিদের এই হামলা আঞ্চলিক সংঘাত আরও ছড়িয়ে পড়ার নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। উল্লেখ্য, ১০ অক্টোবর রিয়াদের কিং খালেদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হুতিদের হামলায় ১৩ জন নিহত এবং ৩০০ জনের বেশি আহত হন। পরদিন ওই বিমানবন্দরে পুনরায় হামলা চালানো হয়, যাতে আরও ১ জন নিহত এবং ১২ জন আহত হন।

বিমানবন্দরে হামলার তিন দিন পর ১৩ অক্টোবর সৌদি আরবের রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানি আরামকোর প্রধান কার্যালয়ে হুতিরা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। এতে কোনো হতাহতের খবর না পাওয়া গেলেও পূর্বাঞ্চলীয় শহর ধাহরানে অবস্থিত কার্যালয়টির একটি ভবনে আগুন ধরে যায়। এতে ভবনটির কয়েকটি তলা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।