ইয়েমেনের বিভিন্ন প্রদেশে বর্তমানে যুদ্ধের তীব্রতা চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। রাজধানী সানা এবং এর পার্শ্ববর্তী এলাকাগুলোর সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলোতেও সংঘাতের বিস্তার ঘটেছে। এই উত্তপ্ত পরিস্থিতির মাঝে ইয়েমেনের যুদ্ধে ইরানের সক্রিয় অংশগ্রহণ ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। অনেক বিশ্লেষকের মতে, তেহরানই হুতিদের ইয়েমেনের বিস্তীর্ণ অঞ্চল এবং প্রতিবেশী সৌদি আরবের সীমান্তের ওপারে সংঘাত বাড়িয়ে তুলতে উৎসাহিত করছে। এর মূল উদ্দেশ্য হলো সৌদি আরব ও উপসাগরীয় অন্যান্য দেশগুলোকে একটি দীর্ঘমেয়াদী, বিস্তৃত এবং অত্যন্ত ব্যয়বহুল আঞ্চলিক যুদ্ধের জালে জড়ানো।

তবে দক্ষিণ লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দেব প্রণালির কয়েকটি ইয়েমেনি দ্বীপে হুতি যোদ্ধাদের সীমিত ও অনিশ্চিত উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেলেও, এখন পর্যন্ত বড় কোনো সামরিক সাফল্য অর্জন করতে পারেনি এই গোষ্ঠীটি। ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) ‘বিশেষজ্ঞদের’ সহায়তায় তারা কিছু পরিখা ও সুড়ঙ্গ খনন করেছে। সেই সঙ্গে দক্ষিণ লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দেব প্রণালির ওপর নজরদারি চালানোর জন্য উপযুক্ত উঁচু স্থানে রাডার সরঞ্জাম স্থাপন করেছে তারা।

হুতিদের ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলোও স্বীকার করেছে যে, যুদ্ধক্ষেত্রে গোষ্ঠীটি ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। বিশেষ করে ইয়েমেনের মারিব প্রদেশ দখলের চেষ্টা করতে গিয়ে তাদের বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে। গত দুই দিনে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, হুতি মিলিশিয়ার দুটি পূর্ণাঙ্গ ব্রিগেড দীর্ঘ সময় ধরে অবরোধ ও ক্ষয়ক্ষতির এক চক্রে আটকা পড়ে আছে। এই ব্রিগেডের একটি অংশ মারিবের উপকণ্ঠে পূর্ব জাবাল আল-বালাক ফ্রন্টে এবং অন্য অংশটি বাব আল-মান্দেব প্রণালির দিকে মুখ করে থাকা কাহবুব পাহাড়ে লড়াই করছে। উল্লেখ্য, এই এলাকাটি তাইজ ও লাহিজ প্রদেশের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত।

প্রাপ্ত খবর অনুযায়ী, নিহতদের মধ্যে হুতি মিলিশিয়ার বেশ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ কমান্ডার রয়েছেন। দীর্ঘ সময় ধরে যোদ্ধা নিয়োগ, সামরিক তৎপরতা সংগঠিত করা এবং বিভিন্ন যুদ্ধ পরিচালনায় তাঁরা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছিলেন। অন্যদিকে, ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীর দাবি, পুরো দেশের আকাশসীমায় তাদের নিরঙ্কুশ আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত। হুতিরা যেসব এলাকায় অবস্থান নিয়েছে, সেগুলো তারা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করছে বলে জানিয়েছে সরকারি বাহিনী।

বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে পৌঁছানোর পরপরই হুতিরা ঘোষণা দিয়েছিল যে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের এমনকি ইসরায়েলের জাহাজেও হামলা চালাবে না। বার্তা সংস্থা রয়টার্স একাধিক সূত্রের বরাতে এই তথ্য প্রকাশ করেছে। তবে হুতিদের এই আশ্বাস ওয়াশিংটনকে খুব একটা আস্থায় আনতে পারেনি। বরং সেখানে আকস্মিকভাবে বড় ধরনের সামরিক উত্তেজনা সৃষ্টির প্রস্তুতি চলছিল বলে জানা গেছে।

মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্যাম্প ডেভিডে অবস্থানের সময় কমিয়ে দ্রুত ওয়াশিংটনে ফিরে আসেন। সেখানে মার্কিন সামরিক গোয়েন্দারা তাঁকে ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূলে হুতিদের অবস্থান লক্ষ্য করে বিমান হামলার কয়েকটি বিকল্প পরিকল্পনা উপস্থাপন করেন। হুতিরা ওই উপকূলের বিস্তীর্ণ এলাকায় এবং বাব আল-মান্দেব প্রণালি পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল। তবে পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্র এই হামলার পরিকল্পনা থেকে সরে আসে।

এদিকে ইয়েমেনের রণক্ষেত্রে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বা আইআরজিসির উপস্থিতি নিয়ে বিভিন্ন খবর প্রকাশিত হয়েছে। এসব প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাহিনীটির বিশেষজ্ঞরা ইয়েমেনের তাইজ প্রদেশ ও দেশটির পশ্চিম উপকূলে সামরিক অভিযান পরিচালনায় সক্রিয় ভূমিকা রাখছেন। ক্ষেপণাস্ত্রব্যবস্থা, ড্রোন এবং প্রযুক্তিগত ও রসদ সহায়তার মাধ্যমে তারা হুতিদের সাহায্য করছেন। কিছু বিশ্লেষকের মতে, ইরানের এই প্রত্যক্ষ সহায়তা ছাড়া হুতিদের পক্ষে এতদূর অগ্রসর হওয়া সম্ভব হতো না।

তবে হুতি আন্দোলন নিয়ে গবেষণা করা অন্য বিশ্লেষকেরা ভিন্ন মত পোষণ করেন। তাঁদের মতে, “হুতিরা এখন এমন একটি শক্তিতে পরিণত হয়েছে, যাদের সামরিক কাঠামো ও সক্ষমতার সঙ্গে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর মিল রয়েছে।” কিছু ক্ষেত্রে তাদের সক্ষমতা ইরানি বাহিনীর সমপর্যায়েও পৌঁছেছে বলে মনে করেন এই গবেষকেরা।

বিশ্লেষকদের মতে, হুতিরা এখন একাধিক ফ্রন্টে যুদ্ধ পরিচালনা করছে। ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূলের কয়েকশ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে তাদের সামরিক তৎপরতা বিদ্যমান। পাশাপাশি মারিব, আল-জাওফ, আল-বাইদা, তাইজ, আল-দালিয়া এবং লাহিজসহ বিভিন্ন এলাকায় তারা লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।

তবে এই ব্যাপক বিস্তৃতি হুতিদের জন্য একই সঙ্গে সুযোগ এবং ঝুঁকি তৈরি করেছে। নতুন নতুন এলাকা দখলের প্রচেষ্টায় তাদের সামরিক শক্তি অনেক বেশি এলাকায় ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে, যার ফলে প্রতিটি ফ্রন্টে পর্যাপ্ত শক্তি ধরে রাখা কঠিন হয়ে উঠতে পারে। বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করেন, দক্ষিণ দিকে হুতিদের অগ্রযাত্রার ফলে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে তাদের প্রধান ঘাঁটিগুলোও ঝুঁকির মুখে পড়ছে।

হুতিদের এই সামরিক তৎপরতা আরও একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে এনেছে—তারা কি নিজেদের স্বার্থে যুদ্ধ করছে, নাকি ইরানের স্বার্থ রক্ষায় কাজ করছে? অনেকের ধারণা, তাদের কর্মকাণ্ড ইয়েমেনের সাধারণ জনগণের চেয়ে ইরানের স্বার্থের সঙ্গেই বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ।

বাস্তবে ইয়েমেনের অধিকাংশ মানুষ মনে করেন, চলমান এই যুদ্ধ তাঁদের নিজেদের যুদ্ধ নয়। ইরানের সমর্থনে কিংবা আঞ্চলিক অন্য কোনো শক্তির সঙ্গে জোট বেঁধে—যেভাবেই এই যুদ্ধ পরিচালিত হোক না কেন, এর সঙ্গে সাধারণ ইয়েমেনিদের স্বার্থের কোনো মিল নেই।

(আনোয়ার আল-আনসি ইয়েমেনের লেখক। সৌদিভিত্তিক মধ্যপ্রাচ্যের প্রভাবশালী ম্যাগাজিন আল মাজালা থেকে নেওয়া)