প্রতাপ শঙ্কর হাজরা নিজেকে পরিচয় করিয়ে দেন মোহামেডানের প্রতাপ হিসেবে। এই পরিচয়ের পেছনে এক গভীর আবেগীয় কারণ রয়েছে। তিনি নিজেই জানিয়েছেন, “আমার জীবনের প্রত্যেকটা কষ্টের সময়েই আমার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল মোহামেডান।”
১৯৬৩ সালে মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবে যোগ দিয়েছিলেন তিনি। সেই সম্পর্ক এখনো অটুট, ক্লাবে তাঁর নিয়মিত যাতায়াত রয়েছে। তবে প্রতাপ শঙ্কর হাজরার পরিচিতি কেবল একজন মোহামেডান খেলোয়াড় হিসেবেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং তিনি এ দেশের ক্রীড়াঙ্গনের এক উজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব। ফুটবল, হকি এবং ক্রিকেট—তিনটি খেলায়ই তিনি পারদর্শিতা দেখিয়েছেন। পাকিস্তান আমলের পূর্ব পাকিস্তান দলের হয়ে তিনি হকি ও ফুটবল খেলেছেন। পরবর্তীতে স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের সংগঠক ও সহ-অধিনায়কের দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া হকির কোচ হিসেবেও তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।
প্রতাপ শঙ্করের জীবন ছিল নানা উত্থান-পতনের। ১৯৫০ সালের দাঙ্গার সময় তাঁকে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কলকাতা, কাশী ও রাঁচিতে আশ্রয় নিতে হয়েছিল। পরবর্তীতে তিনি ঢাকায় ফিরে আসেন এবং ১৯৫২ সালে আরমানিটোলা গভর্নমেন্ট স্কুলে ভর্তি হন। এই প্রতিষ্ঠানটিই তাঁকে একজন দক্ষ খেলোয়াড় হিসেবে গড়ে তোলার ভিত্তি প্রদান করে।
‘ক্রাউন সিমেন্ট অভিজ্ঞতার আলো’ অনুষ্ঠানে তাঁর সঙ্গে আলাপকালে বোঝা যায়, এই মানুষটির জীবনকাহিনি আসলে বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনেরই এক জীবন্ত ইতিহাস। সেই ইতিহাসের পাতায় মিশে আছে আরমানিটোলা স্কুলের মাঠ, পুরান ঢাকার ক্লাবগুলোর স্মৃতি, পাকিস্তান জাতীয় ফুটবল দলে সুযোগ পাওয়ার সেই অনন্য আনন্দ, মুক্তিযুদ্ধের সময় নিজ বাড়ি পুড়ে যাওয়ার বেদনা এবং সব প্রতিকূলতার মাঝেও বাংলাদেশে থেকে যাওয়ার দৃঢ় সিদ্ধান্ত।
আরমানিটোলা স্কুলমাঠ থেকে শুরু
১৯৪২ সালের ৩ এপ্রিল (বাংলা ১৩ চৈত্র ১৩৫০) প্রতাপ শঙ্কর হাজরার জন্ম। তাঁর জন্মের সময় দেশে পঞ্চাশের মন্বন্তর এবং বিশ্বে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা বিদ্যমান ছিল। যদিও এগুলো তাঁর ব্যক্তিগত স্মৃতি নয়, তবে তিনি তাঁর স্মৃতিকথায় পরিবারের ইতিহাস ও শোনা কথাগুলো লিপিবদ্ধ করেছেন।
তাঁর আদি নিবাস ছিল মাদারীপুরের শিবচরে। তবে বর্ষায় নদীভাঙনের কবলে পড়ে সেই বাড়ি বারবার বিলীন হয়ে যায়। পরবর্তীতে মুন্সিগঞ্জের শ্রীনগরের দোগাছিতে তাঁদের পরিবারের বসতি গড়ে ওঠে। তাঁর বাবা প্রিয় শঙ্কর হাজরা ছিলেন ঢাকা বারের একজন আইনজীবী। মা অন্নপূর্ণা হাজরা বেনারসে পড়াশোনা করেছিলেন। তাঁর বাবাও শিবপুর ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন, কিন্তু ঠাকুরমার ইচ্ছায় ইঞ্জিনিয়ারিং ছেড়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন পড়তে শুরু করেন।
১৯৫০ সালের দাঙ্গার সময় পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কলকাতা, কাশী ও রাঁচিতে থাকতে হয়েছিল প্রতাপ শঙ্করকে। পরে ফিরে আসেন ঢাকায়। ১৯৫২ সালে ভর্তি হন আরমানিটোলা গভর্নমেন্ট স্কুলে। এই স্কুলই তাঁকে খেলোয়াড় হিসেবে গড়ে তুলেছিল।
স্কুলের ক্রীড়া পরিবেশের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, “এই স্কুল আশির দশক পর্যন্ত কোনো সময়ই রানার্সআপ হয়নি। প্রতিবার চ্যাম্পিয়ন হয়েছে।” তাঁর মতে, পূর্ব পাকিস্তান ও পরবর্তী বাংলাদেশের হকি খেলোয়াড় তৈরিতে আরমানিটোলা স্কুলের অবদান ছিল অসাধারণ। সেখানে ছোটদের জন্য আলাদা মাঠ, বয়সভিত্তিক দল এবং আন্তস্কুল ও আন্তহাউস প্রতিযোগিতার সুব্যবস্থা ছিল।
তৃতীয় শ্রেণি থেকেই শিক্ষার্থীরা খেলাধুলার সুযোগ পেত। পঞ্চম, ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণির জন্য একটি দল এবং অষ্টম, নবম ও দশম শ্রেণির জন্য আলাদা দল ছিল। ছোটদের মধ্যে প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের বড় দলে নেওয়া যেত, তবে বড় দলের খেলোয়াড়দের ছোট দলে নামানো নিষিদ্ধ ছিল। ফুটবল মৌসুমে ফুটবল, হকি মৌসুমে হকি এবং ক্রিকেটের সময়ে হকি ও ক্রিকেট—দুটোই চলত।
বর্তমান স্কুলগুলোর সাথে তুলনা করে প্রতাপ শঙ্কর আক্ষেপ করে বলেন, “আমি যখন ক্লাস থ্রিতে ভর্তি হয়েছি, তখন দাদাদের কাছেও শুনছি যে গেম টিচার আছে। এখন গেম টিচার নেই। তো খেলাধুলা শেখাবে কে? খেলাধুলা হবে কী করে?”
মাত্র ১৩ বছর বয়সে ওয়ারী ক্লাবের হয়ে প্রথম বিভাগ হকি খেলেছিলেন তিনি। ১৯৫৮ সালে প্রথম বিভাগ হকি এবং ১৯৬১ সালে ভিক্টোরিয়া ক্লাবের হয়ে প্রথম বিভাগ ফুটবল খেলেন। ১৯৬২ সালে পূর্ব পাকিস্তান হকি দলে এবং পরের বছর ফুটবল দলে ডাক পান। ক্রিকেটও খেলতেন তিনি। তবে ১৯৬৬ সালে ঢাকায় কমনওয়েলথ দলের খেলা দেখতে গিয়ে টম গ্রেভনির ব্যাটিং দেখে ক্রিকেট ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
গ্রেভনির ব্যাটিং দেখে তাঁর মনে হয়েছিল, ক্রিকেট খেলার মাধ্যমে তাঁরা যেন এক ধরণের অন্যায় করছেন। তাঁর ভাষায়, “ও যে ছয় মারছে, মনেই হয় না যে ছয় মারছে! আমরা তো গায়ের জোর দিয়ে মারি, ও শুধু ব্যাটটা উঠিয়ে দিল, ছয় হয়ে গেল।”
তবে ক্রিকেটের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক চিরতরে শেষ হয়নি। ১৯৭৩ সালে খেলোয়াড়ের সংকট দেখা দিলে তিনি পুনরায় মাঠে নামেন এবং কিছুদিন শান্তিনগরে খেলে পুনরায় অবসর নেন।
পাকিস্তান জাতীয় ফুটবল দলে
১৯৬৪ সালে পাকিস্তান জাতীয় ফুটবল দলের স্ট্যান্ডবাই খেলোয়াড় হয়েছিলেন তিনি। তবে তাতে মন ভরেনি তাঁর। ১৯৬৫ সালে পেশোয়ারে ট্রায়াল দিয়ে মূল দলে সুযোগ পান। সেই দলে বাঙালি খেলোয়াড় ছিলেন মাত্র দুজন—তিনি এবং জহির ভাই (জহিরুল হক)। এরপর শ্রীলঙ্কায় গিয়ে কয়েকটি ম্যাচ খেলেন। ঢাকায় ফিরে বাড়িতে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে মা তাঁকে জড়িয়ে ধরেছিলেন, সেই স্মৃতি তিনি আজও মনে রেখেছেন।
সেই মুহূর্তটি সম্পর্কে তিনি বলেন, “সেটাই ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে আনন্দ যে দেশের যে কাজই আমি করি, সেই কাজের টপ লেভেলে পৌঁছাতে পেরেছিলাম।”
স্বাধীনতার পরও খেলাধুলার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি। ১৯৭৮ সালে পাতিয়ালায় প্রশিক্ষণ নিয়ে হকির কোচ হন এবং ১৯৮৬ সালে দলের দায়িত্ব পান। দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থেকে বাংলাদেশের বর্তমান ক্রীড়া পরিস্থিতি নিয়ে তাঁর গভীর উদ্বেগ রয়েছে। হকি কেন পিছিয়ে পড়েছে, তার একটি বাস্তব ব্যাখ্যা দিয়েছেন তিনি। তাঁর মতে, ফুটবল খেলতে একটি বল লাগে, ক্রিকেটে ব্যাট ও বল দিয়ে খেলা যায়। কিন্তু হকি খেলতে ২২ জনেরই স্টিক দরকার। খরচ বেশি হওয়ায় এই খেলাটি সবার নাগালে থাকে না।
মুক্তিযুদ্ধ ও পরবর্তী জীবন
জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়টি আসে ১৯৭১ সালে। ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী তাঁদের আরমানিটোলার বাড়িতে আগুন দেয়। পরিবারের সদস্যদের নিয়ে তিনি কোনোমতে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হন। পাশের বাড়ির মুসলিম প্রতিবেশীদের পরিবারের সদস্যরাও তাঁদের সঙ্গে ছিলেন। সব মিলিয়ে ২৪ জন দেয়াল টপকে আর্মেনিয়ান চার্চে আশ্রয় নেন। সৌভাগ্যবশত কেউ মারা যাননি বা আহত হননি।
পরবর্তীতে তিনি মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন এবং স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের সংগঠক ও সহ-অধিনায়কের দায়িত্ব পালন করেন।
স্বাধীনতার পরও খেলাধুলার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ১৯৭৮ সালে পাতিয়ালায় প্রশিক্ষণ নিয়ে হকির কোচ হন। ১৯৮৬ সালে দলের দায়িত্ব পান। দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থেকে বাংলাদেশের খেলাধুলার বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে তাঁর উদ্বেগ আছে। হকি কেন পিছিয়ে পড়েছে, তার একটি বাস্তব ব্যাখ্যাও দিয়েছেন তিনি। ফুটবল খেলতে একটি বল লাগে, ক্রিকেটে ব্যাট ও বল দিয়ে খেলা যায়। কিন্তু হকি খেলতে ২২ জনেরই স্টিক দরকার। খরচ বেশি, তাই খেলাটি সবার নাগালে থাকে না।
দীর্ঘ জীবনে দেশভাগ, দাঙ্গা এবং মুক্তিযুদ্ধ—সবই প্রত্যক্ষ করেছেন প্রতাপ শঙ্কর হাজরা। ১৯৬৪ সালের দাঙ্গার পর মা তাঁকে ভারত চলে যাওয়ার কথা বলেছিলেন। কিন্তু তিনি রাজি হননি। নতুন দেশে গিয়ে বসতি গড়তে যে দীর্ঘ সংগ্রাম ও সময়ের প্রয়োজন, তা ভেবে তিনি বাংলাদেশেই থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
তাঁর উদ্বেগ কেবল সরঞ্জাম বা অর্থের অভাব নিয়ে নয়, বরং স্কুলের মাঠের অভাব, গেম টিচারের অনুপস্থিতি এবং খেলাধুলার চর্চার অভাব নিয়ে। ছোটবেলায় খেলাধুলার গুরুত্ব সম্পর্কে তিনি বলেন, “ছোট বয়সে খেলাধুলায় জড়ালেই ড্রাগসও খাবে না, গুন্ডামিতেও যাবে না। প্লেয়ারদের নিজস্ব একটা স্বকীয়তা কিন্তু থাকে। নিজের ভেতর কিন্তু একটা ফিলিং থাকে, “আই অ্যাম আ স্পোর্টসম্যান।””
দেশভাগ, দাঙ্গা ও মুক্তিযুদ্ধের সাক্ষী প্রতাপ শঙ্কর হাজরা ১৯৬৪ সালের দাঙ্গার পর মায়ের অনুরোধ সত্ত্বেও ভারত যাননি। নতুন দেশে বসতি গড়ার লড়াইয়ের কথা ভেবে তিনি জন্মভূমিতেই থাকার সিদ্ধান্ত নেন।
দৃঢ় কণ্ঠে তিনি বলেন, “মাতৃভূমি ছেড়ে আমি যাব না, আমার এটা জন্মভূমি।”
মা ও জন্মভূমির প্রতি তাঁর এই টান প্রকাশ করতে গিয়ে তিনি বলেন, “আমি জন্ম মাকেও ছাড়ব না, জন্মভূমিও ছাড়ব না।”
শ্রীনগরের দোগাছির পুরোনো বাড়িতে গেলে এখনো তাঁর মনে শিহরণ জাগে। বাড়িটি এখন জীর্ণ, রক্ষণাবেক্ষণের অভাব রয়েছে। তবু সেই বাড়ি তাঁর কাছে কেবল একটি স্থাপনা নয়, বরং নিজের শিকড়ের স্মৃতি।
পুনরায় তাঁর সেই আবেগঘন কথাগুলো মনে পড়ে, “আমি জন্ম মাকেও ছাড়ব না, জন্মভূমিও ছাড়ব না।”
প্রতাপ শঙ্কর হাজরার জীবনকাহিনিতে খেলাধুলা, ইতিহাস এবং ব্যক্তিগত সুখ-দুঃখের এক সংমিশ্রণ রয়েছে। আর তার সাথে মিশে আছে একটি সরল কিন্তু দৃঢ় সিদ্ধান্ত—তিনি তাঁর জন্মভূমিতেই থাকবেন।