দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বর্তমানে তিনটি বড় ধরনের কাঠামোগত ফাঁদে আটকা পড়েছে বলে দাবি করেছে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি)। সংস্থাটির মতে, এই তিনটি পরস্পর সম্পর্কযুক্ত সংকটের কারণে অর্থনীতি এক গভীর মন্দার মুখে দাঁড়িয়েছে। প্রথম ফাঁদটি হলো সাধারণ পরিবারের ক্রমবর্ধমান আর্থিক দুর্দশা, যার ফলে একটি বড় অংশ সঞ্চয় ভেঙে বা ঋণ নিয়ে জীবনধারণ করছে। দ্বিতীয়ত, বিনিয়োগের চরম স্থবিরতার কারণে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি হ্রাস পেয়েছে। আর তৃতীয়টি হলো রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক শাসনব্যবস্থার ত্রুটিজনিত ফাঁদ।

পিপিআরসি তাদের পর্যবেক্ষণে জানিয়েছে, বর্তমান অর্থনীতি মূলত ‘উচ্চ দারিদ্র্য-নিম্ন বিনিয়োগ-নিম্ন প্রবৃদ্ধি’র একটি চক্রে আটকা পড়ে আছে। এর ফলে দারিদ্র্যের হার বাড়ছে, কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে, মূল্যস্ফীতি আকাশচুম্বী হচ্ছে এবং ঋণের চাপ ও প্রাতিষ্ঠানিক হয়রানি সাধারণ মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলছে। সংস্থাটি মনে করে, টেকসই অর্থনৈতিক উত্তরণের জন্য এই কাঠামোগত বাধাগুলো অতিক্রম করাই এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ।

জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক দারিদ্র্য বিমোচন দিবস (১৭ অক্টোবর) উপলক্ষে গত শনিবার ঢাকার সিরডাপ মিলনায়তনে বই আকারে প্রকাশ করা হয় পিপিআরসির ‘বাংলাদেশের প্রকৃত অর্থনীতির অবস্থা: দারিদ্র্যের পুনরাবির্ভাব ও টিকে থাকার সক্ষমতার গতিশীলতা’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনটি। গত বছরের মে মাসে দেশের ৮টি বিভাগের গ্রাম ও শহরের ৮ হাজার ৬৭টি পরিবারের ওপর পরিচালিত বিস্তারিত জরিপের তথ্যের ভিত্তিতে এই প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে। অনুষ্ঠানে প্রতিবেদনের মূল দিকগুলো তুলে ধরেন পিপিআরসি নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান এবং সংস্থার জ্যেষ্ঠ গবেষণা সহযোগী নামিরা শামীম।

অনুষ্ঠানে হোসেন জিল্লুর রহমান বিনিয়োগের স্থবিরতা এবং সংস্কারহীন প্রতিষ্ঠানের কাঠামোগত সংকটের কথা স্বীকার করে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান। তিনি বলেন, “একদিকে মানুষের ঋণের বোঝা বাড়ছে। অন্যদিকে বিনিয়োগ হচ্ছে না। এর জন্য অর্থের সংকট নয়; বরং আস্থার সংকটই প্রধানত দায়ী।”

অর্থের অপচয়কে অর্থনীতির জন্য এক মারাত্মক সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করে তিনি আরও বলেন, “গরিব দেশ, অথচ ভবন তৈরি হচ্ছে; কিন্তু ব্যবহার করা হচ্ছে না। দেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তৈরি হচ্ছে; কিন্তু পড়াশোনা নেই। এ কারণে বাইরে থেকে লোক এনে কারখানা চালাতে হচ্ছে। তাই দেশের জন্য দরকার এখন গুণগত মানের শিক্ষায় জোর দেওয়া।”

পিপিআরসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের ১৭ দশমিক ৯৭ শতাংশ পরিবার বর্তমানে ‘ভঙ্গুর মধ্যবিত্ত’ হিসেবে চিহ্নিত। এই শ্রেণির মানুষের সংখ্যা প্রায় ৩ কোটি ১০ লাখ। তারা দারিদ্র্যসীমার ওপরে থাকলেও তাদের ব্যয় করার সক্ষমতা অত্যন্ত সীমিত এবং অর্ধেকের বেশি পরিবারের ঋণ তাদের সঞ্চয়ের চেয়ে বেশি।

অর্থনীতির প্রথম ফাঁদের ব্যাখ্যায় সংস্থাটি জানিয়েছে, অনেক মানুষ কাজ করেও প্রয়োজনীয় আয় করতে পারছেন না। আয় ও ব্যয়ের ব্যবধান এতই কম যে, সামান্য কোনো আর্থিক ধাক্কা সামলানোর মতো সঞ্চয় তাদের নেই। প্রতিবেদনের তথ্যমতে, ২০২৫ সালে দেশের ২৭ দশমিক ৯৩ শতাংশ মানুষ উচ্চ দারিদ্র্যসীমার নিচে অবস্থান করছিল, যা ২০২২ সালের খানা আয় ও ব্যয় জরিপে ছিল ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ। একই সময়ে চরম দারিদ্র্যের হার ৫ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৩৫ শতাংশে।

জরিপে দেখা গেছে, একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের গড় মাসিক আয় ৩২ হাজার ৬৮৫ টাকা, বিপরীতে ব্যয় ৩২ হাজার ৬১৫ টাকা; ফলে মাস শেষে হাতে থাকে মাত্র ৭০ টাকা। সবচেয়ে দরিদ্র ১০ শতাংশ পরিবারের গড় মাসিক আয় ৮ হাজার ৪৭৭ টাকা হলেও ব্যয় ১২ হাজার ২৯৪ টাকা। এই ঘাটতি মেটাতে তাদের ঋণ নিতে হচ্ছে অথবা সঞ্চয় ভাঙতে হচ্ছে। এছাড়া সর্বনিম্ন আয়ের ৪০ শতাংশ পরিবারের মাসিক আয় ১৫ হাজার টাকার কম, যার ৫৪ দশমিক ৯ শতাংশই ব্যয় হয় খাবারের পেছনে। ফলে শিক্ষা, চিকিৎসা ও যাতায়াতের জন্য তাদের হাতে কোনো অর্থ থাকে না। জরিপে অংশ নেওয়া ৬৭ দশমিক ৪ শতাংশ পরিবার জানিয়েছে, চিকিৎসার ব্যয় তাদের আর্থিক সংকটের অন্যতম প্রধান কারণ।

শিক্ষিত তরুণদের দক্ষতার সাথে চাকরির চাহিদার অমিলকেও একটি বড় ফাঁদ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর ফলে মানুষ কর্মসংস্থানে যুক্ত থাকলেও উন্নত জীবন ও আর্থিক নিরাপত্তা পাচ্ছেন না।

বিনিয়োগ পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে পিপিআরসি জানিয়েছে, বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ-এর প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস অনুযায়ী বিনিয়োগে ব্যাপক দুর্বলতা দেখা যাচ্ছে। গত অর্থবছরে সরকারি ও বেসরকারি উভয় বিনিয়োগই কমেছে। নিট প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ ১৫ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে, যার মধ্যে নতুন মূলধন বিনিয়োগ কমেছে ৭০ দশমিক ৩ শতাংশ। এই স্থবিরতা দীর্ঘস্থায়ী হলে নতুন শিল্প স্থাপন ও মানসম্মত কর্মসংস্থান তৈরি বাধাগ্রস্ত হবে। ফলে বিনিয়োগের আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং উৎপাদনশীল খাতে পুঁজিপ্রবাহ বাড়ানো এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

সংস্থাটি আরও জানায়, ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্পের উদ্যোগ থাকলেও সেগুলোকে বড় ও স্থিতিশীল প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের সুযোগ সীমিত। ফলে নতুন ব্যবসাগুলো পর্যাপ্ত আয় বা কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারছে না।

রাজনৈতিক ও শাসনব্যবস্থার দুর্বলতাকে দারিদ্র্য থেকে উত্তরণের পথে বড় বাধা হিসেবে দেখিয়েছে পিপিআরসি। ২০১৪ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত রাজস্ব আহরণে ব্যর্থতা, ঋণনির্ভর প্রবৃদ্ধি, রাজনৈতিক প্রভাবাধীন অর্থায়ন এবং সরকারি ব্যয়ে অদক্ষতার একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ তৈরি হয়েছিল, যার বড় অংশ গণ-অভ্যুত্থানের পরও টিকে আছে। কর-জিডিপি অনুপাত ৭ শতাংশের নিচে নেমে আসায় শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষায় সরকারের ব্যয় করার ক্ষমতা কমেছে। ঋণনির্ভর কৌশলের কারণে বাজেটের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, খামখেয়ালি ও তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ফলে রাজস্ব ফাঁকি, ব্যবসায়িক হয়রানি এবং অন্যায্য সুবিধা আদায়ের সুযোগ বেড়েছে। প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা থাকলেও রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পর্যায়ে আগ্রহ কম। রাজনৈতিক প্রভাবে ঋণ প্রদান ও নিয়মকানুনের শিথিলতার কারণে খেলাপি ঋণ বেড়েছে। ২০২৬ সালের জুনে ব্যাংক খাতে খেলাপি হার বেড়ে ৩৩ দশমিক ২ শতাংশ হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হয়েছে।

এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য পিপিআরসি পাঁচটি অগ্রাধিকারমূলক পদক্ষেপের কথা বলেছে। প্রথমত, অর্থনৈতিক গণতন্ত্র ও সবার জন্য ন্যায্য প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা, যাতে বিশেষ সুবিধা বা বিবেচনানির্ভর সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করতে না হয়। দ্বিতীয়ত, প্রবৃদ্ধির নতুন চালক হিসেবে কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, ওষুধশিল্প, হালকা প্রকৌশল, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, তথ্যপ্রযুক্তি, পরিবহন ও পরিচর্যাসেবাকে গুরুত্ব দেওয়া। তৃতীয়ত, মানসম্মত শিক্ষায় জোর দেওয়া, যেখানে শুধু ভর্তি নয় বরং কারিগরি দক্ষতা ও ডিজিটাল জ্ঞানের সাথে নিয়োগদাতাদের সংযোগ বাড়ানো হবে। চতুর্থত, ক্ষুদ্র উদ্যোগকে রপ্তানিমুখী বড় প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের পথ প্রশস্ত করা এবং পঞ্চমত, স্বচ্ছ, সময়সীমাবদ্ধ ও ডিজিটাল সমন্বিত জবাবদিহিমূলক প্রশাসন গড়ে তোলা।

অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন পিপিআরসির ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য সৈয়দ এম হাশেমী। নির্ধারিত আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সিপিডির সম্মানীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান, এফবিসিসিআই প্রশাসক মো. ফজলুল হক, একশনএইডের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ কবির এবং বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটানের ডিভিশন ডিরেক্টর জ্যঁ পেম।

একশনএইডের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ কবির বলেন, “দুর্নীতি ও হয়রানির স্বাভাবিকীকরণ বহাল রেখে দেশে কোনো পরিবর্তন আসবে কি না, সন্দেহ হয়।”

সিপিডির সম্মানীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “দেশে আয় বৈষম্য দ্বিগুণের বেশি বেড়েছে এবং প্রবৃদ্ধি আগের মতো মানুষকে দ্রুত দারিদ্র্যমুক্ত করতে পারছে না। এ ছাড়া নানা ক্ষেত্রে হয়রানির কারণে অনেক রপ্তানিকারক রপ্তানি করাই ছেড়ে দেন।”

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুল মজিদ বলেন, “যে বৈষম্য দূর করার জন্য জুলাইয়ে আন্দোলন হয়েছিল, নীতিনির্ধারকদের কাছে তা অর্থবহ হচ্ছে না।”

এফবিসিসিআই প্রশাসক মো. ফজলুল হক বলেন, “২০ বছর ধরে পোশাক খাত ছাড়া অন্য কোনো খাত দাঁড়াতে পারেনি। অন্যদিকে ডিগ্রি এখন চাকরির নিশ্চয়তা দিচ্ছে না।”

বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটানের পরিচালক জ্যঁ পেম বলেন, “অর্থনীতির প্রধান চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় বাণিজ্য, সরকারি অর্থায়ন ও জ্বালানি–দক্ষতা বাড়াতে কাঠামোগত পরিবর্তন প্রয়োজন।”