ব্যাটসম্যানের কানের পাশ দিয়ে শিসের মতো শব্দ তুলে বল ছুটে যাওয়া এবং গতির ঝড়ে কেঁপে ওঠা—ফাস্ট বোলিংয়ের আসল রোমাঞ্চ তো এখানেই। আর এই কারণেই ঘণ্টায় ১৫০ কিলোমিটার বা তার বেশি গতিতে বল ছুড়তে সক্ষম বোলারদের আলাদা মূল্যায়ন করা হয়। তবে আধুনিক ক্রিকেটে সেই গতির ঝড় কি ধীরে ধীরে বিলীন হয়ে যাচ্ছে?

অস্ট্রেলিয়ার সাবেক ফাস্ট বোলার ব্রেট লির মনে করছেন ঠিক তাই। তাঁর ধারণা, ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটের বিপুল অর্থের আকর্ষণ এবং দীর্ঘ ক্যারিয়ার গড়ার হিসাব কষতে গিয়ে বর্তমান সময়ের পেসাররা হয়তো নিজেদের গতির লাগাম টেনে ধরছেন।

উইজডেনের ‘স্কুপ এক্সটেন্ডেড’ অনুষ্ঠানে কথা বলার সময় লি উল্লেখ করেন যে, বর্তমানে নিয়মিতভাবে ১৫০ কিলোমিটার বা তার বেশি গতিতে বল করতে পারেন এমন বোলারের সংখ্যা বেশ কমে এসেছে। তিনি তরুণ পেসারদের মধ্যে ঘণ্টায় ১৬০ কিলোমিটার গতির সীমানা স্পর্শ করার চেষ্টা দেখতে চান। লির কথায়, “আমি চাই বোলাররা ঘণ্টায় ১৬০ কিলোমিটার গতির সীমাকে চ্যালেঞ্জ করুক। কিন্তু এখন তেমনটা দেখছি না। তরুণ ফাস্ট বোলারদের দৌড়ে এসে প্রচণ্ড গতিতে আগুনে সব বল করতে দেখতে চাই আমি।”

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের ইতিহাসে অন্যতম দ্রুতগতির বোলার হিসেবে পরিচিত ব্রেট লি। ২০০৫ সালে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে তিনি ঘণ্টায় ১৬০.৮ কিলোমিটার গতিতে বল করেছিলেন। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তাঁর চেয়ে বেশি গতিতে বল করার রেকর্ড রয়েছে কেবল পাকিস্তানের শোয়েব আখতারের, যিনি ২০০৩ বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ঘণ্টায় ১৬১.৩ কিলোমিটার গতি স্পর্শ করেছিলেন। এরপর থেকে খুব কম বোলারই ১৬০ কিলোমিটারের এই মাইলফলক ছুঁতে পেরেছেন। এমনকি আধুনিক ক্রিকেটে নিয়মিত ১৫০ কিলোমিটারের বেশি গতিতে বল করতে পারেন এমন বোলারের সংখ্যাও এখন হাতে গোনা।

লির মতে, এই পরিস্থিতির পেছনে ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটের ব্যাপক বিস্তার এবং আর্থিক লাভের বিষয়টি বড় ভূমিকা পালন করছে। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা বিভিন্ন টি-টুয়েন্টি লিগে খেলে পেসারদের জন্য বড় অঙ্কের অর্থ উপার্জনের সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে একাধিক লিগে নিয়মিত খেলতে হলে শারীরিক সক্ষমতা ও ফিটনেস ধরে রাখা অত্যন্ত জরুরি। তাই বোলাররা শরীরের ওপর অতিরিক্ত চাপ কমাতে গতির চেয়ে দীর্ঘ ক্যারিয়ারের স্থায়িত্বকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন কি না, সেই প্রশ্ন তুলেছেন সাবেক এই পেসার।

এই প্রসঙ্গে লি প্রশ্ন করেন, “বোলাররা কি এখন দীর্ঘ মেয়াদে খেলার কথা ভাবছেন, ক্যারিয়ার কত দিন টিকবে, সেটা নিয়ে চিন্তা করছেন? তাঁরা কি ভাবছেন, বিশ্বের সাত-আটটি আলাদা ফ্র্যাঞ্চাইজিতে খেলার সুযোগ পাবেন, সেখান থেকে মোটা অঙ্কের অর্থও আয় করবেন? এভাবে হয়তো ১৫-২০ বছর, কিংবা অন্তত ১০ বছর খেলতে পারবেন এবং বাকি জীবনের জন্য আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারবেন?”

নিজের উদ্বেগের কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি আরও বলেন, “এভাবে খেলতে হলে আপনাকে ক্রিকেট মাঠে টিকে থাকতে হবে। আর মাঠে টিকে থাকতে গেলে হয়তো ঘণ্টায় ১৫০ কিলোমিটার গতিতে বল করার বিষয়টি তাদের আর রোমাঞ্চিত করে না। হয়তো তারা ঘণ্টায় ১৩৫ থেকে ১৪০ কিলোমিটার গতির মাঝামাঝি একটা নিরাপদ জায়গায় থাকতে চায়। এতে শরীরের ওপর চাপও কম পড়ে।”

পরিশেষে লি বলেন, “আমার কাছে এটা উদ্বেগের বিষয়। কারণ, আপনি তো দেখতে চান বোলাররা দৌড়ে এসে দ্রুতগতিতে বল করছে।”