সাধারণত আমরা যখন কারিকুলাম ভিটা বা সিভি তৈরি করি, তখন কেবল নিজেদের অর্জন, প্রাপ্ত পুরস্কার এবং সনদগুলোর একটি তালিকা সাজিয়ে লিখি। যেসব চাকরির আবেদন বাতিল হয়েছে, যে বৃত্তিগুলো পাওয়া যায়নি কিংবা যে প্রতিযোগিতায় আমরা পরাজিত হয়েছি—সেই ব্যর্থতার কথাগুলো আমরা খুব যত্ন করে লুকিয়ে রাখি। আমাদের মূল লক্ষ্য থাকে যেন নিয়োগকর্তা কোনোভাবেই এই ব্যর্থতাগুলো জানতে না পারেন। এর ফলে অন্যের সিভিতে আমরা কেবল সাফল্যের পাহাড় দেখি, আর নিজের সিভিতে (যদিও উল্লেখ থাকে না) অনুভব করি ব্যর্থতার বোঝা। আমাদের মনে হয়, অন্যরা হয়তো একের পর এক সুযোগ পেয়েই দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে, আর কেবল আমরাই বারবার প্রত্যাখ্যাত হচ্ছি। অথচ বাস্তব সত্য হলো, অন্যের সিভিতেও এমন অনেক ‘না’ লুকিয়ে থাকতে পারে, যা আমরা দেখতে পাই না।

এই প্রচলিত ধারণাকে বদলে দিতেই জন্ম নিয়েছে ‘সিভি অব ফেইলিওরস’ বা ব্যর্থতার জীবনবৃত্তান্তের ধারণা। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস থেকে শুরু করে সিলিকন ভ্যালির স্টার্টআপ সংস্কৃতিতেও ব্যর্থতা নিয়ে খোলামেলা আলোচনার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। তবে এই ধারণার সূত্রপাত কোথায় এবং কেন ব্যর্থতার কথা আলাদা করে লিখে রাখার প্রয়োজন হলো, তা জানা প্রয়োজন।

২০১০ সালের নভেম্বরে বিজ্ঞানবিষয়ক বিশ্ববিখ্যাত সাময়িকী নেচার-এ ‘আ সিভি অব ফেইলিওরস’ শিরোনামে একটি লেখা প্রকাশ করেন মেলানি স্টেফান। সেই সময়ে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির একজন পোস্টডক গবেষক ছিলেন। তাঁর সেই লেখায় তিনি প্রত্যাখ্যাত আবেদনগুলোর একটি দৃশ্যমান রেকর্ড বা নথি রাখার কথা বলেন। তাঁর যুক্তি ছিল, গবেষণার দীর্ঘ জীবনে সাফল্যের পাশাপাশি প্রত্যাখ্যানও একটি নিয়মিত ঘটনা, কিন্তু সেগুলো সাধারণত কোথাও লিপিবদ্ধ করা হয় না।

এর প্রায় সাড়ে পাঁচ বছর পর, ২০১৬ সালে প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন সহকারী অধ্যাপক ইয়োহানেস হাউসোফার টুইটারে তাঁর নিজস্ব ‘সিভি অব ফেইলিওরস’ প্রকাশ করেন। তিনি সেই সব ডিগ্রি প্রোগ্রামের কথা উল্লেখ করেন যেখানে তিনি সুযোগ পাননি এবং যেসব একাডেমিক পদ, ফেলোশিপ, বৃত্তি ও অনুদানের তালিকা থেকে তিনি বাদ পড়েছেন বা প্রত্যাখ্যাত হয়েছেন, তার বিস্তারিত তুলে ধরেন।

হাউসোফার লিখেছিলেন, “তিনি যা চেষ্টা করেন, তাঁর বেশির ভাগই ব্যর্থ হয়।” তবে তিনি লক্ষ্য করেন যে, ব্যর্থতাগুলো সাধারণত অদৃশ্য থাকে এবং কেবল সাফল্যগুলোই দৃশ্যমান হয়। এই বৈষম্য দূর করে হিসাবটিকে কিছুটা ভারসাম্যপূর্ণ করতেই তিনি এই উদ্যোগ নেন। আশ্চর্যের বিষয় হলো, তাঁর সামগ্রিক একাডেমিক অর্জনের তালিকার চেয়ে এই ব্যর্থতার সিভিটিই মানুষের বেশি মনোযোগ আকর্ষণ করেছিল।

ব্যর্থতাকে দেখার এই দৃষ্টিভঙ্গি কেবল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। ২০০৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সান ফ্রান্সিসকোতে ক্যাস ফিলিপস ও ডায়ান লভিগলিও ‘ফেইলকন’ নামে একটি আয়োজনের সূচনা করেন। প্রযুক্তি ও স্টার্টআপ জগতের উদ্যোক্তাদের জন্য এটি ছিল এমন এক মঞ্চ, যেখানে কেবল সফলতার কথা নয়, বরং কী কাজ করেনি, কেন করেনি এবং কোথায় ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, তা নিয়ে আলোচনা হতো। এই আয়োজনের প্রথম সংস্করণেই চার শতাধিক মানুষ অংশ নেন।

পরবর্তীতে এই সম্মেলনটির ক্ষেত্রে একটি অদ্ভুত পরিবর্তন ঘটে। ২০১৪ সালে সান ফ্রান্সিসকোর ফেইলকন বাতিল করা হয়। কর্তৃপক্ষ জানায়, সিলিকন ভ্যালিতে ব্যর্থতা নিয়ে আলোচনা এতটাই ছড়িয়ে পড়েছে যে, এখন আর আলাদা করে কোনো সম্মেলনের প্রয়োজন নেই। যে বিষয়টি নিয়ে কথা বলার জন্য একটি বিশেষ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছিল, কয়েক বছরের মধ্যেই তা স্টার্টআপ সংস্কৃতির দৈনন্দিন আলোচনার অংশ হয়ে দাঁড়ায়।

ব্যর্থতা এখন আর কেবল অতীতের গল্প নয়, বরং নতুন কিছু উদ্ভাবনের প্রক্রিয়ার সাথেও যুক্ত হয়েছে। প্রযুক্তি ও স্টার্টআপ বিশ্বে ‘ফেল ফাস্ট’ ধারণাটি অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এর মূল কথা হলো—কোনো আইডিয়া বা পরিকল্পনা কাজ করছে না বুঝতে পারলে দীর্ঘ সময় ও সম্পদ নষ্ট না করে দ্রুত পরীক্ষা করা, ফলাফল বিশ্লেষণ করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পথ পরিবর্তন করা।

তবে এই ধারণার বীজ অনেক আগেই বপন করা হয়েছিল। পেনসিলভানিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটির পরিবেশ প্রকৌশলের অধ্যাপক জ্যাক ভি ম্যাটসন ১৯৮৯ সালেই ‘ইন্টেলিজেন্ট ফাস্ট ফেইলিওর’ নামক একটি ধারণা উপস্থাপন করেন এবং ১৯৯১ সালে এ বিষয়ে একটি বই লেখেন। তাঁর মতে, ছোট পরিসরে পরীক্ষা চালানো, ঝুঁকি সীমিত রাখা এবং ফলাফল দেখে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়াই সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি।

তবে প্রশ্ন থেকে যায়, আমাদের কি সত্যিই সিভিতে ব্যর্থতার কথা লেখা উচিত? নাকি আমরা কেবল সেই ব্যর্থতাগুলোকেই পছন্দ করি, যার শেষে একটি সাফল্যের গল্প থাকে? দ্য গার্ডিয়ান-এর কলাম লেখক সোনিয়া সোধা এই প্রশ্নটি উত্থাপন করেছেন। তাঁর যুক্তি হলো, ব্যর্থতার সিভি প্রকাশ করার সুযোগ সাধারণত তারাই পান, যারা ইতিমধ্যে সফল হয়ে গেছেন। কারণ, তাঁদের সেই ব্যর্থতাগুলো শেষ পর্যন্ত সাফল্যেরই একটি অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু যাঁদের ব্যর্থতার পর আর সাফল্য আসেনি, তাঁদের গল্পগুলো কোথায় হারিয়ে যায়?

ঠিক এই জায়গাতেই ‘সিভি অব ফেইলিওরস’ ধারণাটি কিছুটা অস্বস্তিকর হয়ে ওঠে। যখন সামনে সাফল্যের প্রমাণ থাকে, তখন ব্যর্থতাকে মূল্য দেওয়ার কথা বলা সহজ। কিন্তু বাস্তব জীবনে সব প্রত্যাখ্যানের পর নতুন সুযোগ আসে না এবং সব বন্ধ দরজা পুনরায় খোলে না। চেষ্টা, কঠোর পরিশ্রম এবং ভাগ্য সব সময় এক সূত্রে গাঁথা থাকে না।

তা সত্ত্বেও, ‘সিভি অব ফেইলিওরস’ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সত্যকে সামনে নিয়ে আসে। একজন মানুষের পরিচয় কি কেবল তাঁর অর্জন দিয়ে নির্ধারিত হয়? নাকি যে সুযোগগুলো তিনি পাননি এবং যে দরজাগুলো তাঁর জন্য বন্ধ ছিল, সেগুলোও তাঁর জীবনের গল্পের অবিচ্ছেদ্য অংশ? কারণ, সাফল্য বলে দেয় আপনি কোথায় পৌঁছেছেন, আর ব্যর্থতা দেখায় সেখানে পৌঁছানোর লড়াইয়ে আপনি কতবার দরজায় কড়া নেড়েছিলেন।