দাম্পত্য জীবন কেবল দুজন মানুষের পাশাপাশি বসবাস করার নাম নয়, বরং এটি দুটি ভিন্ন হৃদয়ের এক নিবিড় বন্ধন। ইসলামি জীবনদর্শনের আলোকে স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যকার ভালোবাসা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধকে মহান আল্লাহর বিশেষ নেয়ামত হিসেবে গণ্য করা হয়।
তবে বাস্তব জীবনের কঠিন পথচলায় প্রতিটি দাম্পত্য সম্পর্কই কখনো না কখনো নানা চড়াই-উতরাই, মানসিক দূরত্ব এবং ভুল-বোঝাবুঝির মুখোমুখি হয়। এমন পরিস্থিতিতে শুধু মানবিক যুক্তি এবং সামাজিক পরামর্শ সবসময় কার্যকর হয় না; বরং আল্লাহর কাছে একনিষ্ঠ প্রার্থনাই পারে ক্ষয়ে যাওয়া ভালোবাসাকে পুনরায় সঞ্জীবিত করতে। কারণ মানুষের হৃদয় পরিবর্তন করার ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহর হাতেই নিহিত।
স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার ভালোবাসা বৃদ্ধি, পারস্পরিক সদ্ভাব এবং একটি আদর্শ পরিবার গড়ে তোলার জন্য মহাগ্রন্থ কোরআনে আল্লাহ এক অনন্য দোয়া শিখিয়েছেন। দোয়াটির উচ্চারণ হলো: রব্বানা হাব লানা মিন আজওয়াজিনা ওয়া জুররিয়্যাতিনা কুররাতা আ’ইউনিও ওয়াজ’আলনা লিলমুত্তাকিনা ইমামা।
এর অর্থ হলো: “হে আমাদের প্রতিপালক, আমাদের জীবনসঙ্গী ও সন্তানদের আমাদের জন্য নয়নপ্রীতি বানিয়ে দাও এবং আমাদের সৎকর্মশীলদের জন্য অনুসরণীয় নেতা বানিয়ে দাও।” (সুরা ফুরকান, আয়াত: ৭৪)
পবিত্র কোরআনের এই আয়াতে ব্যবহৃত ‘কুররাতু আইয়ুন’ শব্দবন্ধটির আভিধানিক অর্থে অনুবাদ করা হয় ‘চোখের শীতলতা’ বা ‘নয়নপ্রীতি’। প্রাচীনকালে প্রচণ্ড উত্তাপের পর ঠাণ্ডা বাতাসের পরশ পেয়ে চোখে যে প্রশান্তির অনুভূতির সঞ্চার হতো, তাকেই ‘কুররাতু আইয়ুন’ বলা হতো। পারিবারিক ক্ষেত্রে ‘নয়নপ্রীতি’ বলতে এমন এক জীবনসঙ্গীকে বোঝানো হয়, যাঁর দিকে তাকালে অন্তরের সব ক্লান্তি, দুঃখ ও দুশ্চিন্তা নিমেষেই দূর হয়ে যায় এবং হৃদয় এক অনাবিল প্রশান্তিতে ভরে ওঠে।
ইসলামে ভালোবাসার সংজ্ঞা কেবল সাময়িক রোমাঞ্চ বা জৈবিক আকর্ষণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং ভালোবাসা হলো এক আত্মিক স্বস্তি ও নির্ভরতার স্থান। পবিত্র কোরআনে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের মূল দর্শন তুলে ধরে বলা হয়েছে, “আর তাঁর নিদর্শনগুলোর মধ্যে রয়েছে যে তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য হতেই সৃষ্টি করেছেন তোমাদের জোড়া, যাতে তোমরা তাদের কাছে প্রশান্তি পাও এবং তিনি তোমাদের মধ্যে সৃষ্টি করেছেন ভালোবাসা ও দয়া।” (সুরা রুম, আয়াত: ২১)
এই আয়াতের তাফসিরে উল্লেখ করা হয়েছে যে, একজন মুমিনের জন্য এর চেয়ে বড় নয়নপ্রীতি আর কিছুই হতে পারে না যে সে তার স্বামী বা স্ত্রীকে আল্লাহর অনুগত, চরিত্রবান ও সৎকর্মশীল হিসেবে দেখতে পায়। (ইবনে কাসির, তাফসিরুল কুরআনিল আজিম , ৬/১৬৫, দারুল ফিকর, বৈরুত, ১৯৯৪)
সুরা ফুরকানের এই আয়াতের সৌন্দর্য শুধু স্বামী-স্ত্রীর ভালোবাসার প্রার্থনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি পুরো পরিবারের ভবিষ্যৎ ও সামাজিক দায়িত্বকে ধারণ করে। দোয়ার শেষ অংশে বলা হয়েছে—‘ওয়াজ’আলনা লিলমুত্তাকিনা ইমামা’ অর্থাৎ ‘আমাদের সৎকর্মশীলদের জন্য অনুসরণীয় নেতা বানাও’।
এর অর্থ হলো, একটি সুন্দর দাম্পত্য সম্পর্ক শুধু দুজন মানুষের ব্যক্তিগত সুখের ঠিকানা নয়; বরং তা একটি আদর্শ পরিবারের মূল ভিত্তিপ্রস্তর। স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যকার ভালোবাসা ও শ্রদ্ধাবোধ সন্তানদের মানসিকভাবে সুস্থ করে গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। খোদাভীরুদের নেতা হওয়ার অর্থ ক্ষমতার লিপ্সা লালন করা নয়; বরং এর অর্থ হলো সততা, বিনয়, দয়া ও পারিবারিক ভালোবাসার এমন এক চমৎকার উদাহরণ তৈরি করা, যা দেখে সমাজের অন্য মানুষেরা অনুপ্রাণিত হয়। (আস-সাদি, তাইসিরুল কারিমির রহমান ফি তাফসিরি কালামিল মান্নান , ১/৫৮৭, মুয়াসসাসাতুর রিসালাহ, বৈরুত, ২০০০)
দাম্পত্যের সুন্দর মুহূর্তগুলোতে বা রাতের ঘুমের পূর্বে স্বামী-স্ত্রী দুজন মিলে হাত তুলে কিংবা অন্তরে এই দোয়ার অনুভূতি রেখে প্রার্থনা করা দম্পতির মধ্যে এক গভীর মানসিক মেলবন্ধন তৈরি করে। এই দোয়াকে দৈনন্দিন জীবনযাপনের নিয়মিত অংশে পরিণত করা সম্ভব।
প্রথমত, নামাজ-পরবর্তী মোনাজাতে প্রতিদিনের পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ নামাজের পর, বিশেষ করে ফজর ও ইশার নামাজ শেষে একনিষ্ঠ মনে প্রার্থনা করা যেতে পারে। দাম্পত্যের সুন্দর মুহূর্তগুলোতে বা রাতের ঘুমের পূর্বে স্বামী-স্ত্রী দুজন মিলে হাত তুলে কিংবা অন্তরে এই দোয়ার অনুভূতি রেখে প্রার্থনা করা দম্পতির মধ্যে এক গভীর মানসিক মেলবন্ধন তৈরি করে।
দ্বিতীয়ত, সংকট মুহূর্তে আত্মসংযম বজায় রাখা। সংসারে কোনো মতভেদের সূচনা হলে বা কঠিন পরিস্থিতি তৈরি হলে ক্ষুব্ধ না হয়ে অন্তরে শান্তভাবে এই দোয়া স্মরণ করা আল্লাহর দয়া আকর্ষণ করতে সাহায্য করে।
ইসলামি জীবনদর্শনের দৃষ্টিকোণ থেকে ভালোবাসার চর্চা করা একটি বিশেষ ইবাদত। রাসুল (সা.) বলেছেন যে একজন মুমিন যখন তার স্ত্রীর মুখে খাবারের লোকমা তুলে দেয়, তাতেও তার জন্য সওয়াব রয়েছে। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৬)