যেকোনো উৎসব কিংবা আনন্দঘন মুহূর্তে রাতের আকাশে যখন রঙিন আতশবাজির ঝলকানি দেখা যায়, তখন তা সবার নজর কাড়ে। কখনো গাঢ় লাল, কখনো উজ্জ্বল সবুজ, আবার কখনো নীল আলোর রোশনাই পুরো আকাশকে আলোকিত করে তোলে। তবে এই চোখধাঁধানো রঙিন আলোর উৎস আসলে কোথায়? এর পেছনে কাজ করে বিজ্ঞানের এক চমৎকার ও সুনিপুণ তত্ত্ব।

আতশবাজির এই বিচিত্র রঙের রহস্য মূলত লুকিয়ে আছে পরমাণুর অভ্যন্তরীণ গঠনে। আমরা জানি, একটি পরমাণু প্রধানত ইলেকট্রন, প্রোটন ও নিউট্রন নিয়ে গঠিত। এর প্রোটন ও নিউট্রনগুলো অবস্থান করে নিউক্লিয়াসের ভেতরে, আর ইলেকট্রনগুলো নিউক্লিয়াসের বাইরে নির্দিষ্ট শক্তির স্তরে বিন্যস্ত থাকে। যখন কোনো পরমাণুতে প্রচুর পরিমাণে শক্তি প্রয়োগ করা হয়, তখন এর ইলেকট্রনগুলো সেই শক্তি শোষণ করে উচ্চ শক্তির স্তরে উন্নীত হয়। তবে এই অবস্থা স্থায়ী হয় না; খুব অল্প সময়ের মধ্যেই ইলেকট্রনটি পুনরায় তার পূর্বের নিম্ন শক্তির স্তরে ফিরে আসে। এই প্রত্যাবর্তনের সময় ইলেকট্রনটি অতিরিক্ত শক্তিকে আলো বা আলোকশক্তি হিসেবে নির্গত করে। আতশবাজির বিস্ফোরণের ফলে যে তীব্র তাপ উৎপন্ন হয়, সেটিই এই প্রক্রিয়ার মূল চালিকাশক্তি।

বিস্ফোরণের পর তৈরি হওয়া আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য বা রং মূলত নির্ভর করে ইলেকট্রনের দুটি শক্তির স্তরের মধ্যকার পার্থক্যের ওপর। মানুষের চোখ সাধারণত ৩৫০ থেকে ৭৫০ ন্যানোমিটার তরঙ্গদৈর্ঘ্যের দৃশ্যমান আলো দেখতে পায়। এই দৃশ্যমান বর্ণালিতে তরঙ্গদৈর্ঘ্য লাল থেকে শুরু হয়ে বেগুনি রঙের মাধ্যমে শেষ হয়।

যেহেতু ইলেকট্রনগুলো নির্দিষ্ট শক্তির স্তরে অবস্থান করে, তাই এক স্তর থেকে অন্য স্তরে রূপান্তরের সময় একটি নির্দিষ্ট তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো তৈরি হয়। উদাহরণস্বরূপ, যদি শক্তির পার্থক্য ২.০৩ ইলেকট্রন ভোল্ট হয়, তবে তা ৬১০ ন্যানোমিটারের কমলা আলো নির্গত করবে। এখানে তরঙ্গদৈর্ঘ্য এবং শক্তির পরিমাণ একে অপরের ব্যস্তানুপাতিক। ফলে উচ্চ শক্তির (২.৩৩ ইলেকট্রন ভোল্ট) রূপান্তরের সময় কম তরঙ্গদৈর্ঘ্যের ৫৩২ ন্যানোমিটার আলো উৎপন্ন হয়, যা আমরা সবুজ রং হিসেবে দেখি।

প্রতিটি মৌলের ইলেকট্রন সংখ্যা এবং বিন্যাস সম্পূর্ণ আলাদা ও অনন্য। এর অর্থ হলো, সব মৌলের ইলেকট্রনিক রূপান্তরের শক্তি এক হয় না। প্রতিটি মৌলের নিজস্ব একটি স্পেকট্রাল ফুটপ্রিন্ট বা বর্ণালির ছাপ থাকে। ল্যাবরেটরিতে অজানা মৌলের উপাদান শনাক্ত করতে এই পদ্ধতি বহুল ব্যবহৃত হয়। এমনকি বর্তমানে বিজ্ঞানীরা মঙ্গল গ্রহের পাথরের উপাদান নির্ধারণের ক্ষেত্রেও এই স্পেকট্রাল ফুটপ্রিন্ট পদ্ধতি ব্যবহার করছেন।

বিজ্ঞানীরা ইলেকট্রন উত্তেজনার এই নীতিকে কাজে লাগিয়ে এমন সব উপাদান বা লবণ তৈরি করেছেন, যা নির্দিষ্ট রঙের আলো নির্গত করতে সক্ষম। আতশবাজি কিংবা নিয়ন সাইনে মূলত নির্দিষ্ট কিছু ধাতব লবণের সংমিশ্রণ ব্যবহার করা হয়। যেমন—স্ট্রনশিয়াম লবণ বা লিথিয়াম লবণের কারণে লাল, ক্যালসিয়াম লবণের কারণে কমলা, সোডিয়াম লবণের কারণে হলুদ, বেরিয়াম লবণের কারণে সবুজ এবং কপার বা তামার লবণের কারণে নীল রঙের আলোর সৃষ্টি হয়।

উৎসবের আমেজে পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানোর পাশাপাশি বিজ্ঞানের এই চমৎকার রসায়ন সবার সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া যেতে পারে। সবাইকে ছুটির দিনগুলোর আনন্দময় ও নিরাপদ উদ্‌যাপনের শুভেচ্ছা!

সূত্র: ইন্ডিয়ানা ইউনিভার্সিটি ব্লুমিংটন, যুক্তরাষ্ট্র