বাজারে বিভিন্ন ধরনের রঙিন সাবান পাওয়া যায়। বিভিন্ন রঙের এই সাবানগুলো দেখতে যেমন আকর্ষণীয়, সুবাসও তেমন আলাদা। সাবানের রং যাই হোক না কেন, ফেনা সবসময়ই ধবধবে সাদা হয়ে যায়। কখনো কি মনে প্রশ্ন জেগেছে, রঙিন সাবান থেকে এত সুন্দর সাদা ফেনা কীভাবে তৈরি হয়? এর পেছনে কি অন্য কোনো রহস্য আছে, নাকি পুরোটাই বিজ্ঞানের খেলা?

সাবানের ফেনা এই সাদা হওয়ার পেছনের রহস্যটা চলুন জেনে নেওয়া যাক-

সাবানের রং তাহলে কোথায় যায়?

আমরা যে রঙিন সাবান বা শ্যাম্পু ব্যবহার করি, তার মধ্যে কিন্তু রঙের পরিমাণ খুবই সামান্য থাকে। কারখানাগুলোতে সামান্য কিছু ডাই বা কালারিং এজেন্ট মিশিয়ে সাবানকে আকর্ষণীয় করা হয়।

যখন আপনি সাবান ও পানি একসঙ্গে মিশিয়ে ঘষে ফেনা তৈরি করছেন, তখন এই সামান্য পরিমাণ রং পানির সঙ্গে মিশে এতটাই পাতলা হয়ে যায় যে, খালি চোখে সেই রংকে আর দেখাই যায় না। অর্থাৎ, ফেনার সৃষ্টি হয় এমন এক তরল থেকে যার নিজস্ব কোনো জোরালো রং নেই বললেই চলে। এখন আপনি ভাবতে পারেন, রং না থাকলে তো ফেনা স্বচ্ছ বা জলরঙের হওয়ার কথা ছিল, তবে ফেনা ধবধবে সাদা দেখায় কেন?

রঙিন সাবানের ফেনা সাদা হওয়ার কারণ

সাবান পানির সঙ্গে মিশে ছোট ছোট অসংখ্য বুদবুদ তৈরি হয় এবং সেগুলো একসঙ্গে মিলে ফেনার আকার নেয়। এই বুদবুদগুলোর ভিতরে বাতাস আটকে থাকে আর বাইরে থাকে সাবান-পানির একটি পাতলা আবরণ। ফেনার রং কী হবে, তা মূলত এই পাতলা স্তরের গঠনের ওপরেই নির্ভর করে।

সাবানের ফেনা সাদা হওয়ার আসল কারণ হলো ‘আলোর বিচ্ছুরণ’। সূর্যের আলো বা আমাদের ঘরের সাধারণ আলো মূলত সাতটি রঙের মিশ্রণ। চারপাশের সাধারণ আলো যখন এই বুদবুদগুলোর উপর এসে পড়ে, তখন আলো আর সোজা যেতে পারে না। বুদবুদগুলোর গায়ে ধাক্কা খেয়ে আলো সব দিকে এলোমেলোভাবে ছড়িয়ে পড়ে। আলোর ভেতরে থাকা সাতটি রঙই সমানভাবে ছড়িয়ে যায়। আর বিজ্ঞান অনুযায়ী, সাতটি রং যখন একসাথে মিশে আমাদের চোখে আসে, তখন আমাদের চোখ সেটিকে আলাদা কোনো রং না দেখে ‘সাদা’ হিসেবে দেখে।

ঠিক একই কারণে আকাশে ভেসে থাকা মেঘ বা বরফকেও সাদা দেখায়। শুধু তাই নয়, বুদবুদের আকার এবং গঠনও ফেনার এই ধবধবে সাদা রঙের জন্য অনেকটাই দায়ী।

সাবান ফেনা তৈরি করে কেন?

সাধারণ পানি দিয়ে তো ফেনা হয় না। তাহলে সাবানে হাত দিলে কেন এত ফেনা হয়? এর পেছনে সাবানের রাসায়নিক গঠন দায়ী। সাবান হলো একধরনের ‘সারফেক্ট্যান্ট’ উপাদান। এটি সারফেস-অ্যাক্টিভ এজেন্ট হিসেবে কাজ করে। অর্থাৎ এটি তরলের পৃষ্ঠটান কমিয়ে দেয়।

সাবানের এই উপাদান পানির শক্ত বাঁধন বা টানকে ঢিলে করে দেয়। ফলে পানি সহজে ভেঙে না গিয়ে খুব পাতলা চাদরের মতো ছড়িয়ে পড়তে পারে। এবার আপনি যখন হাত দিয়ে ঘষাঘষি করেন, তখন সেই পাতলা পানির আস্তরণের ভেতর বাতাস ঢুকে পড়ে বুদবুদ তৈরি করে। আর এই বুদবুদগুলো যখন স্তূপাকারে জমে ওঠে তখনই তৈরি হয় ফেনা।

ফেনা, সাবান পানি আর সুডস- সব কি এক?

আমরা অনেকেই ফেনা, সুডস বা ফোম শব্দগুলোকে এক অর্থে ব্যবহার করি। তবে রসায়নের ভাষায় কিছুটা পার্থক্য আছে।

ফোম: এটি একটি সাধারণ শব্দ। যেকোনো তরলের ভেতরে গ্যাসের বুদবুদ আটকে থাকলেই তাকে ফোম বলা যায়। যেমন- কোল্ড ড্রিংকসের ফেনা বা শেভিং ক্রিমের ফোন।

ল্যাদার: বিশেষভাবে সাবান, শ্যাম্পু বা শেভিং ক্রিম যখন পানির সঙ্গে মিলে বুদবুদ তোলে, তাকেই ল্যাদার বলা হয়।

সুডস: এটি একটু ঘরোয়া শব্দ, যা সাধারণত থালাবাসন ধোয়ার সময় বা কাপড় কাচার সময় তৈরি হওয়া ফেনাকে বোঝাতে বলা হয়।

নাম যাই হোক না কেন, বিজ্ঞানের নিয়ম সব জায়গাতেই এক। আপনি যে সাবান দিয়েই ফেনা তুলুন না কেন- তার ফেনা সব সময় ওই একই কারণে সাদা দেখাবে। কারণ, আলো যখন অসংখ্য ক্ষুদ্র বুদবুদের মধ্য দিয়ে আসা-যাওয়া করে, তখন তা সব রঙকে সমানভাবে চারদিকে ছড়িয়ে দেয়। আর আমাদের চোখ সেই মিশ্রণকে ধবধবে সাদা হিসেবে দেখতে পায়।

সূত্র: টিভি ৯ বাংলা , সায়েন্স এবিসি