খাদ্যমন্ত্রী আফরোজা খানম বলেছেন, লালন সাঁই শুধু একজন বাউল সাধক নন। তিনি মানবতার সাধক, অসাম্প্রদায়িক চেতনার পথপ্রদর্শক এবং সম্প্রীতির এক অনন্য কণ্ঠস্বর। তার দর্শনের কেন্দ্রে ছিল মানুষ, মানুষের মর্যাদা এবং মানুষের প্রতি ভালোবাসা।

শনিবার (১৭ অক্টোবর) বিকেলে মানিকগঞ্জে বাউল সম্রাট লালন সাঁইয়ের ১৩৬তম তিরোধান দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা উল্লেখ করেন। মানিকগঞ্জ জেলা শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনে জেলা প্রশাসন ও জেলা শিল্পকলা একাডেমি যৌথভাবে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।

অনুষ্ঠানে খাদ্যমন্ত্রী বলেন, “লালন সাঁই ধর্ম, বর্ণ ও পরিচয়ের বিভেদ পেরিয়ে মানুষের মিলনের কথা বলেছেন। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন, মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় তার মনুষ্যত্ব। আজকের পৃথিবীতে লালনের এই দর্শন আরও বেশি প্রাসঙ্গিক। আমরা এমন একটি সমাজ চাই, যেখানে পরিচয়ের কারণে কেউ অবহেলিত হবে না, ধর্মের কারণে কেউ বৈষম্যের শিকার হবে না। ঘৃণা নয়, ভালোবাসাই হবে মানুষের সম্পর্কের ভিত্তি। আমরা চাই সাম্যের সমাজ, সম্প্রীতির সমাজ, মানবিক মর্যাদার সমাজ।”

তিনি আরও বলেন, “মত ও পথ আলাদা হতে পারে, কিন্তু মানবতার প্রশ্নে আমরা সবাই এক। ভেদাভেদ নয়, সম্প্রীতি; ঘৃণা নয়, ভালোবাসা; বিভাজন নয়, মানুষের মিলন— লালন সাঁইয়ের দর্শন আমাদের সেই পথই দেখায়।”

লালনের গানের গুরুত্ব বর্ণনা করে আফরোজা খানম বলেন, “লালনের গান শুধু বিনোদন নয়। এটি আত্মজিজ্ঞাসার গান, আত্মপরিচয়ের গান, মানবমুক্তির গান। তার সুরে মিশে আছে বাংলার মাটির গন্ধ, তার কথায় ফুটে উঠেছে জীবনের গভীর দর্শন। তার সাধনায় প্রকাশ পেয়েছে অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও মানবতার শক্তি। লালনের এই অমূল্য ঐতিহ্য সংরক্ষণ করা আমাদের দায়িত্ব। নতুন প্রজন্মের কাছে তার দর্শন পৌঁছে দেওয়া আমাদের কর্তব্য। বাংলার বাউলসংগীত ও লোকজ সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করা আমাদের অঙ্গীকার।”

লালন সাঁইয়ের প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে মন্ত্রী বলেন, “লালন সাঁই আজ আমাদের মাঝে শারীরিকভাবে নেই। কিন্তু তার গান আছে, তার দর্শন আছে, তার মানবতার বাণী আছে। যত দিন মানুষ সত্যের সন্ধান করবে, মুক্তির পথ খুঁজবে, মানবতার চর্চা করবে, তত দিন লালন সাঁই বেঁচে থাকবেন মানুষের হৃদয়ে।”

সরকারের সাংস্কৃতিক উদ্যোগের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বর্তমান সরকার বাংলার লোকজ সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক পরিচয় সংরক্ষণে কাজ করে যাচ্ছে। আমাদের লক্ষ্য, বাংলার সমৃদ্ধ সংস্কৃতিকে দেশের প্রতিটি প্রান্তে ছড়িয়ে দেওয়া, নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং বিশ্বদরবারে বাংলার সংস্কৃতিকে আরও পরিচিত করে তোলা। কারণ, উন্নয়ন শুধু অবকাঠামোর নয়, উন্নয়ন আমাদের সংস্কৃতিরও। শেকড়কে ভুলে নয়, শেকড়কে ধারণ করেই আমাদের এগিয়ে যেতে হবে।”

বিএনপির রাজনৈতিক আদর্শের কথা তুলে ধরে আফরোজা খানম বলেন, “প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপির রাজনীতিতেও মানুষের কল্যাণ, মানুষের অধিকার এবং মানুষের জীবনমান উন্নয়নের অঙ্গীকার রয়েছে। আমরাও মানুষের জন্য কাজ করতে চাই। মানুষের আস্থা ও বিশ্বাসের মর্যাদা রাখতে চাই। মানুষের ভালোবাসা অর্জন করতে চাই আমাদের কাজের মাধ্যমে, আমাদের দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে।”

নিজের জন্মভূমির প্রতি আবেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, “আমি মানিকগঞ্জের সন্তান। এই মাটি, এই মানুষ, এই জনপদ আমার অস্তিত্বের অংশ। আমার বাবা আমৃত্যু মানিকগঞ্জের মানুষের পাশে থেকেছেন। মানুষের জন্য কাজ করেছেন, মানুষের ভালোবাসাকে মূল্য দিয়েছেন। তার সেই পথচলা আমার জীবনেও প্রেরণা।”

নিজের দায়বদ্ধতা ব্যক্ত করে খাদ্যমন্ত্রী বলেন, “আমি যত দিন বেঁচে থাকব, তত দিন এই অঞ্চলের মাটি ও মানুষকে ভালোবেসে যাব। মানুষের পাশে থাকব, মানুষের কল্যাণে কাজ করে যাব। কারণ, আমার কাছে মানিকগঞ্জ শুধু একটি জেলার নাম নয়। এই মাটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমার শেকড়, আমার স্মৃতি, আমার দায়বদ্ধতা, আমার ভালোবাসা। এই অঞ্চলের মানুষের সুখ-দুঃখ, আশা-আকাঙ্ক্ষা আমার কাছে অত্যন্ত আপন। মানিকগঞ্জের মাটি ও মানুষই আমার এক পৃথিবী। এই মানুষের ভালোবাসাই আমার সবচেয়ে বড় শক্তি।”

জেলা প্রশাসক নাজমুন আরা সুলতানার সভাপতিত্বে আয়োজিত এই সভায় পুলিশ সুপার মোহাম্মদ সারওয়ার আলম, মানিকগঞ্জ প্রেসক্লাবের সভাপতি জাহাঙ্গীর আলম বিশ্বাস এবং জাতীয়তাবাদী সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থা (জাসাস) জেলা কমিটির সদস্যসচিব শামীম বিশ্বাস বক্তব্য রাখেন।

জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের নির্বাহী উম্মে সুমাইয়ার সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে ‘লালন সাঁইয়ের জীবন ও দর্শন’ শীর্ষক একটি প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন জাতীয়তাবাদী সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থা (জাসাস) সিংগাইর উপজেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম।

অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে একটি মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক পরিবেশনা অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে জেলা শিল্পকলা একাডেমি ও জাসাসের শিল্পীরা নাচ ও গানের পরিবেশনা করেন। পুরো সাংস্কৃতিক পর্বটি পরিচালনা করেন জেলা শিল্পকলা একাডেমির সংগীত প্রশিক্ষক জুঁইরিরা ইসলাম নুপুর।