সকাল ৭টা থেকে দুপুর সোয়া ২টা—মাত্র ছয় ঘণ্টার ব্যবধান। এরই মধ্যে দেশের দুই প্রান্তে দুটি মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় ঝরে গেল ১৫ তাজা প্রাণ। কারও প্রিয়জন পুড়লেন আগুনের লেলিহান শিখায়, কেউ বাড়ি ফিরলেন না সড়ক-যাত্রা শেষে।
শনিবার (১৭ অক্টোবর) সকাল ৭টায় কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীতে পাটোয়ারটেক সমুদ্রসৈকত এলাকায় অবস্থিত টুপটুপ রেস্টো অ্যান্ড রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ধোঁয়ায় দমবন্ধ হয়ে ও পুড়ে প্রাণ হারিয়েছেন ১০ পর্যটক।
অন্যদিকে দুপুর সোয়া দুইটায় উত্তরের জেলা কুড়িগ্রামের রৌমারীতে ধানবোঝাই ট্রাক ও ব্যাটারিচালিত ইজিবাইকের মুখোমুখি সংঘর্ষে সড়কেই ৫ জন নিহত হন।
আরও হৃদয়বিদারক বিষয় হলো, কক্সবাজারের রিসোর্টের অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ গেল একই পরিবারের ৬ জনের, অন্যদিকে কুড়িগ্রামের ঘটনায় একই পরিবারের ৪ জন নিহত হয়েছেন।
একলহমায় আনন্দভ্রমণ ও দৈনন্দিন যাত্রা রূপান্তরিত হয়েছে শোকের মাতমে, যা পুরো দেশকে ভাসিয়ে দিয়েছে বিষাদের ছায়ায়।
কী ঘটেছিল টুপটুপ রিসোর্টে
এদিন সকাল ৭টার দিকে ইনানীর মেরিন ড্রাইভ সড়কসংলগ্ন টুপটুপ রেস্টো অ্যান্ড রিসোর্টে আগুন লাগে। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের তিনটি ইউনিটের কর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছান। পরে স্থানীয় বাসিন্দারা পুলিশের সহায়তায় আগুন নিয়ন্ত্রণ ও উদ্ধার তৎপরতা শুরু করেন। পরে সকাল ১০টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।
প্রথমে ফায়ার সার্ভিসের সিনিয়র কর্মকর্তা দোলন আচার্য নিশ্চিত করে জানান, ঘটনাস্থল থেকে পাঁচটি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। পরে আরও একজনের মৃত্যু হয়।
এরপর দুপুর ১টা ৫০ মিনিটের দিকে আরও ৪টি মরদেহ উদ্ধারের তথ্য নিশ্চিত করেন কক্সবাজার ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের উপসহকারী পরিচালক সৈয়দ মোরশেদ হোসেন। এর ফলে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১০ জনে।
নিহত ১০ জনের মধ্যে ৬ জনের পরিচয় পাওয়া গেছে। নিহত ব্যক্তিরা হলেন ঢাকার বনশ্রীর ইসরাত জাহান মালিহা (৩০) ও মিলিতা মেহেজাবিন আলভী (২৩), খিলগাঁওয়ের লায়লা জাহান নাবিলা (২৭) ও নাফিসতা মীম (২৭), চুয়াডাঙ্গার ফারিহা কবির (৩৩) এবং পাঁচ বছর বয়সী ফায়িজান আহম্মেদ।
কক্সবাজার সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) সুবক্তগীন মাহমুদ সোহেল তাদের পরিচয় নিশ্চিত করেছেন।
পুলিশ সূত্র মুক্তকণ্ঠকে জানিয়েছে, টুপটুপ রেস্টো অ্যান্ড রিসোর্টটি কাঠের তৈরি। এতে মোট রুম ছিল ৯টি। গতকাল শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) রাতে তিন রুমের পর্যটক চেকআউট হয়ে চলে যান। বাকি ৬ রুমে ১৬ জন পর্যটক অবস্থান করছিলেন। তাদের মধ্য থেকে ৫ থেকে ৬ জনের মতো সকালে বেরিয়ে বিভিন্ন কাজে বাইরে ছিলেন। অগ্নিকাণ্ডে তাদের মধ্য থেকে ছয়জন মারা যান। বাকিদের আহত অবস্থায় উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
রিসোর্টের ছিল না লাইসেন্স, করা হয় সতর্ক
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের চট্টগ্রাম বিভাগের উপপরিচালক মো. তৌফিকুল ইসলাম ভূঁইয়া জানান, আজ সকাল ৭টা ২৩ মিনিটে কক্সবাজার ফায়ার সার্ভিসে আগুনের খবর দেওয়া হয়। সকাল ৮টার দিকে ফায়ার সার্ভিসের দল ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। ৮টা ১৫ মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। চারজন ব্যক্তি মারা গেছেন তিনতলার দুটি শৌচাগারে।
তিনি বলেন, সমুদ্রের তীব্র বাতাসে কাঠের রিসোর্টে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এ ধরনের স্থাপনায় বহনযোগ্য অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র, অগ্নিসংকেত, হোস পাইপ ও অগ্নিনিরাপত্তা পরিকল্পনা থাকা দরকার। কিন্তু রিসোর্টটিতে এগুলোর কিছুই ছিল না। ফায়ার লাইসেন্সও ছিল না। মাত্র সাত-আট মাস আগে রিসোর্টটি তৈরি হয়েছিল। জায়গাটির মালিকানা নিয়েও দ্বন্দ্ব ছিল বলে জানান তিনি।
একই পরিবারের গেল ৬ প্রাণ, জানাল দিয়ে বাঁচলেন আশিক
পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে ছুটি কাটাতে কক্সবাজার গিয়েছেন মো. আশিকুল ইসলাম। সঙ্গে ছিলেন তার স্ত্রী ইসরাত জাহান মালিহা ও স্ত্রীর ছোট বোন লায়লা জাহান নাবিলাসহ পরিবারের অন্য সদস্যরা।
আশিকুল ইসলামের এক স্বজন গণমাধ্যমকে জানান, আগুন লাগার পর আশিকুল ইসলাম দোতলা থেকে লাফ দিয়ে বেঁচে আছেন। তবে আশিকুলের স্ত্রী, স্ত্রীর বোনসহ পরিবারের ছয়জন মারা গেছেন।
কুড়িগ্রামে সড়কে নিভে গেল ৫ জনের প্রাণ
কুড়িগ্রামের রৌমারীতে ধানবোঝাই ট্রাকের ধাক্কায় অটোরিকশার চালকসহ পাঁচজন নিহত হয়েছেন। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে একই পরিবারের চারজন রয়েছেন।
শনিবার (১৭ অক্টোবর) দুপুরে উপজেলার যাদুরচর ইউনিয়নের সায়েদাবাদ বাজারের কাছে এ দুর্ঘটনা ঘটে।
নিহতদের মধ্যে একই পরিবারের চারজন হলেন শরিফা বেগম, লিপি বেগম, তুবা খাতুন (৭) ও রিশাদ মিয়া (১২)। এ ছাড়া নিহত অটোরিকশাচালকের পরিচয় জানা যায়নি। এ ঘটনায় বৃষ্টি খাতুন (২৫) নামে একজন গুরুতর আহত হয়েছেন।
ঘটনার বর্ণনা দিয়ে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সদস্য জিয়াউর রহমান বলেন, কাউনিয়ারচর থেকে পাঁচ যাত্রী নিয়ে একটি অটোরিকশা কর্তীমারীর দিকে যাচ্ছিল। পথে শিবেরডাঙ্গি বাজারের কাছে বিপরীত দিক থেকে আসা ধান বোঝাই একটি ট্রাক অটোরিকশাটিকে ধাক্কা দেয়। এতে ঘটনাস্থলেই চালকসহ তিনজনের মৃত্যু হয়। হাসপাতালে নেওয়ার পথে মারা যান আরও দুজন।
রৌমারী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কাউসার আলী বলেন, নিহতদের চারজন একই পরিবারের সদস্য। অটোরিকশা চালকের পরিচয় এখনও জানা যায়নি। ট্রাকটি পুলিশ হেফাজতে রয়েছে। এ ঘটনায় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।